সিসি নিউজ: হত দরিদ্র কৃষক সিরাজুল। ঋনের টাকায় ২ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে লাগিয়েছিলেন পপকর্ন জাতীয় ভুট্টা বীজ। তিন মাস পরেই তা চোখের পানিতে পরিণত হয়েছে। গাছে মোচাঁ আছে, ভিতরে দানা নেই। এ ফলন দেখে কাউকে কিছু বলতে পারছেন না। শুধু নিরবে কাদঁছেন। শুধু এ কৃষক নয়। তার মতো অবস্থা গোটা উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই হাজার ভুট্টা চাষির। এতে কান্নার মিছিল বাড়লেও দেখার যেন কেহ নেই। বীজ ডিলারের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট উর্ধতনদের কাছে বিচার চাইলেও পাননি। এমন কি ক্ষেত পরিদর্শনের পর কৃষি কর্মকর্তারা কোন পদক্ষেপ নেননি এ সকল কৃষকদের ক্ষতি পুরনে।
রংপুর বিভাগীয় কৃষি অফিস সুত্রে জানা যায়, দেশের বৃহৎ একটি ভুট্টার চালান এ বিভাগ থেকে সরবরাহ করা হয়। বিশেষ করে নিলফামারী ও কুড়িগ্রামের তিস্তা পারের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁ, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও রংপুরের নদী বিধৌত এলাকায় এ ফসলের চাষাবাদ বেশি হয়। তাই বরাবরের মতো চলতি মৌসুমেও এর লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। এসব জমিতে হাইব্রিড মোটা দানা ও পপকর্ণ হাইব্রিড মিলে ১৫টি প্রজাতী চাষাবাদ করে জমির উর্বরতানুযায়ী। দিনাজপুরের অঞ্চলে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও ইতিমধ্যে খানসামা, চিরিরবন্দর,পার্বতীপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউপির কৃষকরা ভুট্টার ফলন নিয়ে কাদঁছে। তাদের জমিতে ভুট্টার মোচা আছে ভিতরে দানা নেই। খানসামার গোয়ালডিহি ইউপির হাজিরহাট এলাকার কৃষক আঃ রহিম জানান, আমি ১০ বিঘা জমিতে ভুট্টা লাগিয়েছি। এর মধ্যে হাইব্রীড বেলী পপকর্ণ গাছের মোচাতে দানা নেই। একই কথা বলেন কৃষক সাফিয়ার রহমান, আইয়ুব আলী, ওসমান গনি, গজেন্দ্র নাথ রায়। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্থানীয় ভুল্লার হাটের ভুট্টার বীজ বিক্রেতা ডিলার রাফিয়া ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকারি গোলাম রব্বানীর কাছে বীজ (সিদ্দিকীয়া সীডস্) কিনেছিলাম। তিনি আমেরিকান বলে সকলের কাছে বিক্রি করেছেন। একই অভিযোগ করেন প্রায় শতাধিক কৃষক। কৃষকরা আরো বলেন, এ বীজ বিক্রেতা প্রতিবছর ভুট্টা সংগ্রহ করে নিজেই বীজ প্যাকেটিং করে। তাই তার ভেজাল বীজের কারনে এ অবস্থা হয়েছে। এ নিয়ে ওই কৃষকরা সমাবেশ করে বিচার চেয়ে গত ১৮ মার্চ খানসামা উপজেলার টিএনও বরাবর গন স্বাক্ষর দিয়ে আবেদন করেন বিচারের জন্য। বিচার না পেলেও ওই উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মোঃ এজামুল হক জানান, রংপুর কৃষি গবেষনা হতে ২২ মার্চ মোঃ বদরুদ্দোজাহ, ওবায়দুর রহমান মিলে তিন সদস্যর একটি গবেষক দল পরিদর্শন করেনে। তাদের রিপোট আসলেই বুঝা যাবে বীজ না অন্য সমস্যা। তবে ভেজাল বীজ সরবরাহের কথা অস্বীকার করেন সিদ্দিকীয়া সীডস্ এর বাংলাদেশের একমাত্র পরিবেশক রাফিয়া ট্রেডার্স এর স্বত্তাধিকারী গোলাম রব্বানী। তিনি বলেন, আমাকে ফাঁসাতে একটি মহল এমন অপপ্রচার করছেন। তবে ভুট্টায় দানা নেই কথাটি সত্য নয়, কিন্তু পরিমানে কম। যা অন্য সমস্যার কারনেও হতে পারে।
এদিকে, তিস্তা নদীর অববাহিকায় উত্তরের নীলফামারী ও লালমনিরহাট এলাকার কৃষকরা দানা না হওয়ায় চরম ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। প্রতি বছরই এ ফসলের চাষ বাড়ায় দিনদিন আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়েছিল তাদের।
তবে ধারাবাহিকতায় ছন্দপতন ঘটানোর অভিযোগ এখানেও নিম্নমানের বীজ। বীজ লাগানোর পর হতে শুরু করে গাছ বেড়ে ওঠা পর্যন্ত ঠিক ছিল। যখন গাছে মোচা ধরে, তখনই দেখা যায় বিপত্তি। প্রতিটি গাছেই মোচা আছে তবে ভুট্টায় দানা নেই। এতে ধার-দেনা করে চাষীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কাবেরী-৫০, সিপি-৯৮১, বন্ধন-৯০৯১ বীজের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে চাষিরা অভিযোগ করেন।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খালিশা চাঁপানী ইউনিয়নের বাইশপুকুর মৌজার কৃষক একরামুল জানান, নানা সমস্যার মধ্যেও প্রায় ১২ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছি। তবে তার অর্ধেক জমিতে ভুট্টার মোচায় দানা আসেনি। এই ছয় বিঘাতে তিনি দিয়েছিলেন ন্যাশনাল এগ্রি-কেয়ার হাইব্রিড সিড লিমিটেডের সিপি-৯৮৮ জাতের ভুট্টা। ওই এলাকার কৃষক জব্বার জানান, জমি মালিকের কাছে বিঘায় ৩ হাজার টাকায় বর্গা নিয়ে মোট ৬ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছি। তবে আড়াই বিঘা জমির ভুট্টার মোচায় কোনো দানা আসেনি। এই আড়াই বিঘাতে কাবেরী-৫০ সিড লিমিটেডের কাবেরী-৫০ জাতের ভুট্টা বীজ রোপণ করেছিলাম। ভুট্টা চাষে যা খরচ করেছি তা ঋণের টাকায়। এখন কি হবে? এই ভাবনা তাড়া করছে সারাক্ষন। এমন এলাকার ভুট্টা চাষী হামিদুল, এছলাম, মোহাম্মদ আলী সহ অনেকের। তারা সকলে বলেন, গত বছর কাবেরী-৫০ জাতের ফলন ভালো হওয়ায় চলতি মৌসুমেও ওই জাতের ভুট্টার বীজ রোপণ করেছিলাম। এবার এতে মোচা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাতে কোন দানা হয়নি।
এ বিষয়ে ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার হাইব্রিড সিড লিমিটেডের মার্কেটিং অফিসার মাসুদ রানা ও কাবেরী সিড লিমিটেডের সিনিয়র মার্কেটিং অফিসার শাহিনুর কিবরিয়া ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, বিভিন্ন কারণে ভুট্টার মোচায় দানা নাও হতে পারে। তবে পরির্দশনের পর সমাধানের চেষ্টা করা করা হবে। আর কাবেরি সিড কতৃপক্ষ জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে এটা হতে পারে। তাছাড়া শুধু কারেরী-৫০ নয় এবার বিভিন্ন কো¤পানির ভুট্টার মোচায় দানা হয়নি।
এ নিয়ে ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ হুমায়ুন কবীর ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা তপন চন্দ্র রায় সরজমিনে পরিদর্শন করেন। বীজ বিক্রেতা, ডিলার ও কোম্পানীর প্রতিনিধিদের ডেকে কারন জানতে চান। তবে কারও গাফিলতি কিংবা ভেজাল বীজে হল কিনা তা তদন্তের পর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান এ প্রতিনিধিকে। তবে কৃষি কর্মকর্তা সান্তনার বানী যাহাই শোনান না কেন? সকল ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক দাবি করছেন এর আর্থিক ক্ষতিপুরন ও ভেজাল বীজ বিক্রেতাকে আইনের আওতায় এনে যথাযথ বিচারের। যাতে ভবিষ্যতে কৃষি ও হতদরিদ্র কৃষকদের পুঁজি করে এমন অপকর্ম কেউ করতে না পারে।