বিশেষ প্রতিনিধি: হয়রানী দুর্ভোগ কম হওয়ার পাশাপাশি ফাইল চালাচালির দিন শেষ হয়েছে কিশোরগঞ্জ উপজেলা ভুমি অফিসে। কাজের খোঁজ নেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন অফিসে আসা যাওয়া, অতিরিক্ত ব্যয় হ্রাস এবং সময়ও সাশ্রয় হচ্ছে সেবা গ্রহিতাদের।
দ্রুত সেবা প্রদানসহ সঠিক সময়ে নির্দিষ্ট তথ্য জানতে পারছেন উপজেলার মানুষ। ঠিকঠাক থাকলে নির্ধারীত দিনে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করে দেওয়া হচ্ছে সেবাগ্রহীতাদের।
অফিসে এসে সরাসরি এসিল্যান্ড’র (সহকারী কমিশনার/ভুমি) সাথে কথা বলতে পেরে বেজায় খুশি কাজে আসা মানুষরা। জানতে পারছেন কাজ সম্পর্কিত নানান তথ্যও।
আর সেটা করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে ভুমি বিষয়ক গণশুনানী কেন্দ্র “ভুমির টানে”। খোলাঘরে সেবা নিতে আসা গ্রহীতারা উপস্থিত থেকে নিজেরাই জমা দিয়ে যাচ্ছেন আবেদন ফরম আর কেউবা নিয়ে যাচ্ছেন কাগজপত্র আর স্ব-চোখে দেখতে পাচ্ছেন সেবা নিতে আসা অন্যগ্রাহকদের কাজের চিত্রও।
উপজেলা ভুমি অফিস সুত্র জানায়, গেল বছরের ১৯ জানুয়ারী ভুমি অফিস প্রাঙ্গণে “ভুমির টানে” উদ্বোধন করা হয়। জেলা প্রশাসক জাকীর হোসেন সেটির উদ্বোধন করেন। খোলাঘরটির স্থাপন কাজ বাস্তবায়ন করেন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বর্তমানের নড়াইল জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সিদ্দিকুর রহমান।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, খোলা ঘরে বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে আগত সেবাগ্রহীতাদের। সেখানে কাজ সম্পাদনে সহকারী কমিশনার(ভুমি) উত্তম চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে উপস্থিত থাকেন ভুমি অফিসের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা।
রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত গণশুনানী অনুষ্ঠিত হয় এই ঘরে। উপজেলা ভুমি অফিসে নিয়মিত কর্মকর্তা না থাকায় ঘরটি স্থাপনের পর সচল না হলেও বর্তমানে দায়িত্বরত কর্মকর্তা গেল বছরের ২৩আগষ্ট যোগদানের পর থেকে প্রাণ ফিরে পায় সেটি।
উপজেলার চাঁদখানা ইউনিয়নের কাঠগাড়ি গ্রামের জমসের আলীর ছেলে বাবুল হোসেন (৪৫) জানান, আমি এক মাস আগে নামজারির (খারিজ) জন্য আবেদন করি। গত রবিবার (৭ মে) আমাকে ডিসিআর দেয়া হয়েছে। এরআগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, টাকা জমা এবং শুনানী করা হয় প্রকাশ্যে।
সেবা নিতে আসা বাহাগিলি ইউনিয়নের উত্তর বাহাগিলি গ্রামের জসিম উদ্দিনের ছেলে বদরুল আলম(৫৫) বলেন, স্যারের সাথে সরাসরি দেখা হইল। জমি খারিজের জন্য আবেদন করিছুনু। আজ শুনানী হইল। সব ঠিকঠাক আছে।
একই ইউনিয়নের আব্দুল মজিদ জানান, আগোত এই অফিসোত জমি জমা নিয়ে কাজোত আসিলে, বহুত কষ্ট হয়ছিলো। স্যারের দেখা হয়ছিলো না, অফিসের লোকজন কইছিলো, আজ যাও, আরেক দিন আইসো, সেদিন যেয়াও দেখা পাওয়া যাইছিলো না। দিনের পর দিন ঘুরিন নাগিছিলো।
অফিসের কর্মকর্তা বলছেন, নামজারীর জন্য ১১৭০টাকা ছাড়া আর একটি টাকাও কারো কাছে বেশি নেওয়া হয় না। নামজারীর জন্য আবেদনের সর্বোচ্চ ৪৫কার্যদিবসের মধ্যে ডিসিআর তুলে দেয়া হচ্ছে আগতদের। কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকলে ১৬কার্যদিবসের মধ্যেও দেয়া হয়।
উন্মুক্ত স্থানে ভুমি বিষয়ক গণশুনানী হওয়ায় দালাল আর টাউট বাটপারদের আনাগোনা নেই বললেই চলে। একসময় তাদের খপ্পরে পড়ে দিনের পর দিন পার করা, অযথা টাকা তুলে দেয়া হতো দালালদের হাতে। সেই পরিবেশ নেই এখন উপজেলা ভুমি অফিসে।
ভুভি অফিসের নাজির সিরাজুল ইসলাম বলেন, এখনটার চিত্রটা একেবারে আলাদা। খোলামেলা পরিবেশ। নামজারী, খতিয়ান, সম্পত্তির যেকোন বিষয় সমন্ধে সরাসরি ভাবে জানতে পারেন এখানে। তিনি বলেন, আমার চাকুরী জীবনে দেখেছি খারিজ করার জন্য তহশিল অফিস থেকে এসিল্যান্ড অফিস পর্যন্ত ফাইল চালাচালির দুর্ভোগ। দিনের পর দিন গেছে। এখন সে সময় ফুরিয়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসিল্যান্ড উত্তম কুমার রায় যোগদানের পর থেকে খোলা ঘরে শুণানী শেষে ৯৫০জনের নামজারী করে দিয়েছেন। দখলে থাকা ১১৮শতক খাস জমি উদ্ধার করেছেন। আরো ৩০শতক জমি উদ্ধারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন তিনি।
এদিকে ভুমি অফিসের রেকর্ড রুমটি দীর্ঘদিনের হওয়ায় ভুমি সংক্রান্ত কাগজপত্র সংরক্ষণ করা দুঃসহ হয়ে দাড়িয়েছে কর্তৃপক্ষের। অতিদ্রুত সেটি মেরামত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
জানতে চাইলে সহকারী কমিশনার(ভুমি) উত্তম কুমার রায় বলেন, সেবা সহজী করার জন্য আমি ৭২জন দালালকে চিহিৃত করে তাদের প্রতারণা বন্ধ করেছি। দালালদের সিন্ডিকেটে জিম্মি হয়েছিলো সেবাগ্রহীতারা। এখন তাদের অফিসে ঘোরাফেরা লক্ষ করা যায় না।
তিনি বলেন, ভুমির টানে ঘরটিতে আমরা অফিসের সবাইকে নিয়ে টিম ওয়ার্ক করছি। প্রতিদিন আবেদন গ্রহণ করে শুনানীর জন্য দিন ধার্য করে দেয়া হচ্ছে। ধার্য দিনে শুণানী শেষে প্রয়োজনীয় কাজের সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
ঘরটি সবার জন্য ওপেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, কারো কথায় ভর না করে ভুমি সংক্রান্ত সহযোগীতা সরাসরি এসে গ্রহণ করতে পারেন ভুমি অফিসে।
সুত্র জানায়, দালাল চক্রের একটি সিন্ডিকেট কিশোরগঞ্জ উপজেলা ভুমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আগত সহজ সরল মানুষদের ভুল বুঝিয়ে অর্থ কৌশলে হাতিয়ে নিতো। কোন কোন ক্ষেত্রে নকল তৈরি করে দিয়ে বিপাকে ফেলতো তাদের।