সিসি ডেস্ক: নৌ-পরিবহনমন্ত্রীর ঘোষণার ছয় বছর এবং গেজেট প্রকাশের পাঁচ বছর অতিবাহিত হলেও শুধুমাত্র ভারত সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অপেক্ষায় আজও চালু হয়নি নীলফামারীর চিলাহাটি স্থলবন্দর।
তাই দ্রুত ভারত সরকারের সাথে আলোচনা করে স্থলবন্দরটি চালুসহ চিলাহাটি দিয়ে ফের বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপন করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতি দাবি নীলফামারী জেলাসহ এ অঞ্চলের মানুষের।
বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের সূত্র মতে, ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সরকার নীলফামারীর ডোমারে চিলাহাটিতে ‘চিলাহাটি আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট’ স্থাপন করে। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে সেটিকে স্থলবন্দরে উন্নীত করলে সেখানে স্থলবন্দর কার্যক্রম শুরু হয়। এই স্থলবন্দরটি চালু থাকে পাক-ভারত যুদ্ধের আগ পর্যন্ত। সেই সময় এই স্থলবন্দরটি দিয়ে দু’দেশের রেল যোগাযোগ ছিল।
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হলে স্থালবন্দরটি বন্ধ করে শুধু চেকপোস্ট চালু রাখা হয়। এ সময় ভারত সরকার তাদের অংশের রেলপথ তুলে নিয়ে রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এরপর আবার বাংলাদেশ সরকার ২০০২ সালের ২৬ জুন অজ্ঞাত কারণে চিলাহাটি চেকপোস্টটি বন্ধ করে দেয়।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ব্রিটিশ সরকারের আমলে ১৮৭০ সালে অসম বেঙ্গল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নীলফামারীর সৈয়দপুরে বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা স্থাপন করে।
সেই সুবাদে চিলাহাটি ও হলদিবাড়িতে রেলওয়ে স্টেশন স্থাপন করে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি-সৈয়দপুর রেল যোগাযোগ শুরু হয়। ওই সময় এই পথ দিয়ে ভারতের শিলিগুড়ি থেকে ছেড়ে হলদিবাড়ি হয়ে চিলাহাটি, সৈয়দপুর এবং দর্শনা দিয়ে কলকাতা পর্র্যন্ত চলাচল করতো ‘দার্জিলিং মেইল ট্রেন’। এছাড়াও চিলাহাটি-হলদিবাড়ি এবং জলপাইগুড়ি পর্যন্ত চলাচল করতো একটি পাসপোর্ট ট্রেন। দু’দেশের মধ্যে স্থাপিত রেলপথটি পাক-ভারত যুদ্ধের সময় উপড়ে ফেলা হয়।
নীলফামারীর চিলাহাটি স্থলবন্দর বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও প্রবীণ সাংবাদিক আবু মুসা মাহমুদুল হক বলেন, ২০১১ সালের জুন মাসে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান চিলাহাটি পরিদর্শন করে দ্রুত স্থলবন্দরটি চালুর আশ্বাস দিয়ে জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু করান। সে অনুযায়ী চিলাহাটি স্থলবন্দরের স্থান নির্ধারণ করে জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়।
এরপর ২০১৩ সালের ২৮ জুলাই মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে চিলাহাটিকে স্থলবন্দর ঘোষণা করে ১ আগস্ট সরকারিভাবে গেজেট প্রকাশ করা হয়। তবে শুধুমাত্র ভারত সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অপেক্ষায় বন্দরটি আজও চালুর অপেক্ষায় রয়েছে।
চিলাহাটি স্থলবন্দর বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি আরও বলেন, বাংলাদেশ-ভারত আবারও সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু করতে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি ১১ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার রেলপথ পুনঃস্থাপনের জন্য ২০১৬ সালের মার্চ মাসে দু’দেশের রেলওয়ে কর্মকতাদের একটি দল জরিপ পরিচালনা করে।
এর মধ্যে বাংলাদেশের চিলাহাটি অংশে ৭ কিলোমিটার এবং ভারতের হলদিবাড়ি অংশে চার দশমিক ৩৪ কিলোমিটার জরিপ করে নিজ নিজ দেশের মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়।
ধারণা করা হচ্ছে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলপথ স্থাপন হয়ে গেলে এক সাথে স্থলবন্দর ও রেল যোগাযোগ শুরু হবে।
চিলাহাটি স্থলবন্দরটি দ্রুত চালু করার দাবি জানিয়ে নীলফামারী চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’র সভাপতি মারুফ জামান কোয়েল বলেন, স্থলবন্দরটি চালু হলে ভারত, নেপাল, ভুটানসহ পাশের কয়েকটি দেশের সাথে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়বে। এতে যেমন ওই সব দেশে আমদানি-রফতানি বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশ-ভারত সরকারের প্রচুর রাজস্ব বাড়বে। একই সাথে নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অঞ্চলের বাণিজ্যের উন্নয়ন ঘটবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন হবে। সর্বোপরি চিলাহাটি স্থলবন্দর চালু হলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ব্যাপক পরিবর্তন হবে।
এছাড়াও স্থলবন্দরটি দিয়ে অতিসহজে নীলফামারীসহ আশপাশের জেলার মানুষ যারা চিকিৎসার জন্য ভারতে গমন করেন তাদের জন্য অনেকটাই সহায়ক হবে বলে জানান তিনি।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কমল কৃষ্ণ ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের চিলাহাটি ও ভারতের হলদিবাড়ি ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্ট বহু পুরাতন। এ দুটি স্টেশনে নতুন করে সংযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। এজন্য চিলাহাটি-হলদিবাড়ি মোট ১১ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার রেলপথ পুনরায় নির্মাণের জন্য জরিপ পরিচালনাসহ চিলাহাটি – হলদিবাড়ি হয়ে শিলিগুড়ি পর্যন্ত যেভাবে রেলপথ স্থাপন এবং চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলস্টেশনকে আন্তর্জাতিকমানের তৈরি করা হবে তার নক্সা দুই দেশের মধ্যে আদান প্রদান করা হয়েছে।
বাংলাদেশ চিলাহাটি অংশে ৭ কিলোমিটার রেলপথ স্থাপন এবং চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনকে আন্তর্জাতিকমানে উন্নীত করতে ৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ২০১৯ সালের জুনের মধ্যেই রেলপথটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলপথ মন্ত্রণালয়। বরাদ্দ আসলে দরপত্র আহবান করে কাজ শুরু করা হবে।
অপরদিকে ভারতের হলদিবাড়ি অংশে ৪ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার পুনঃস্থাপনসহ শিলিগুড়ি পর্যন্ত মোট ৫৬ কিলোমিটার রেলপথ নতুন রূপে তৈরি এবং হলদিবাড়ি রেলওয়ে স্টেশনকে আন্তর্জাতিকমানে উন্নীত করতে ভারতের রেলবিভাগ ইতোমধ্যে চারশ’ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে তাদের অংশে কাজ শুরু করে দিয়েছে।
এটা চালু করতে পারলে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি দিয়ে ঢাকা-শিলিগুড়ি-দার্জিলিং পর্যন্ত রেল সংযোগ স্থাপিত হবে। পাশাপাশি আমরা আর্থিকভাবেও উপকৃত হবে।
করতোয়া