• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৭ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
“ভালো থেকো আমার না হওয়া মহারানী” চলন্ত ট্রাকে আড়াই ঘন্টা ঝুলে ৩২ লাখ টাকার ইয়াবা জব্দ করলেন সিপাহি জয়পুরহাট রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুই দিনব্যাপী কর্মশালা শুরু দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে বাসের ধাক্কা, নিহত বেড়ে ৪ ড্রাম ট্রাকের পেছনে যাত্রীবাহি বাসের ধাক্কা, নিহত ৩ সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার

জামানত ছাড়াই ঋণ দিল সোনালী ব্যাংক!

সিসি ডেস্ক: জামানত ছাড়াই ঋণ দিয়ে বিপাকে পড়েছে সোনালী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখা। ১৯৯৭ সালে মাত্র ৮২ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখায় গ্রাহক হয় ফেয়ার ট্রেড ফেব্রিকস লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি। ১৫ বছর ধরে ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা করে ২০১১ সালে সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা বকেয়া রেখে আর যোগাযোগ করছেন না প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জসিম আহমেদ। জসিম আহমেদ যেমন বছরের পর বছর ব্যাংক থেকে ঋণের নামে অর্থ নিয়েছেন, ব্যাংকের টাকায় নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান করেছেন; তেমনি ব্যাংকাররাও দিয়েছেন দু’হাত খুলে। কত টাকা ঋণ দেওয়া হচ্ছে, কত পরিশোধ হচ্ছে, ঋণের বিপরীতে জামানত আছে কি-না কোনোদিকেই খেয়াল করেননি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। ২০ বছর পরে এসে বর্তমানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এ অর্থ আদায়ের উদ্যোগ নিয়ে কোনো কূলকিনারা করতে পারছেন না। গতকাল জাতীয় সংসদে শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেখানে ফেয়ার ট্রেডের অবস্থান ১৫তম।

সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব তদন্তে ফেয়ার ফেব্রিকসের ঋণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু অনিয়ম পাওয়া যায়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে প্রতিষ্ঠানটিকে অর্থ সরবরাহ করেছে সোনালী ব্যাংক। কখনও নগদ, কখনও ব্যাক টু ব্যাক এলসি বা কখনও বিল পারসেজের নামে দেওয়া হয়েছে শত শত কোটি টাকা। তদন্ত প্রতিবেদনে এ ঘটনাকে অর্থ আত্মসাৎ হিসেবে উল্লেখ করেছে তদন্তকারী দল।

ব্যাংকের কর্মকর্তারা এ ঘটনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। এসব অর্থ দেওয়ার অনেক নথিও এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। কে বা কারা কীভাবে এসব অর্থ দিয়েছেন তা-ও বের করা যাচ্ছে না। আর যেসব নথি পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে কোন কোন কর্মকর্তা স্বাক্ষর করেছেন তাও স্পষ্ট নয়। নামের সিল ব্যবহার করা হয়নি অনেক নথিতে। ১০ বছর আগে ২০০৭ সালে এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত হিসেবে ৩৩ কর্মকর্তাকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হলেও ফলাফল কিছুই হয়নি। ব্যাংক টাকা ফেরত পায়নি। কয়েকজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অবশেষে তাদের অনেকে কোনো ধরনের দায়-দায়িত্ব ছাড়াই নিয়মিত অবসরে গেছেন।

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে ফেয়ার ট্রেডকে তৈরি পোশাক আমদানি-রফতানি ব্যবসার প্রয়োজনে ব্যাক টু ব্যাক এলসির জন্য মাত্র ৮২ লাখ টাকা ঋণসীমা মঞ্জুর করে ব্যাংক। এর পর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা না বাড়লেও ধাপে ধাপে এই ঋণসীমা বাড়ানো হয়েছে। সবশেষে তা ৩৩ কোটি টাকায় ঠেকে। ব্যাক টু ব্যাক এলসির বিপরীতে বারবার অর্থায়ন করা হলেও গ্রহীতা তা পরিশোধ করেনি। ব্যাংক অর্থ আদায় না করে ফোর্সড লোন সৃষ্টি করে নতুন করে ঋণ দিয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কাছে পাওনা সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে ৪৯৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ফোর্স লোন। অভ্যন্তরীণ বিল কেনা বাবদ নতুন করে ঋণ সৃষ্টি করা হয়েছে ৩৫ কোটি ৪৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। আর পিএডি, লিম ও ব্যাংক গ্যারান্টি বাবদ পাওনা রয়েছে আরও ১০ কোটি টাকা। এসব ঋণের বিপরীতে জামানত আছে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩১৮ শতাংশ জমি। ব্যাংকের হিসাবে এই জমির মূল্য মাত্র ৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা। যদিও এই জমি জসিম আহমেদের নিজের নয়। বন্ধকী সম্পত্তি জামানত দিয়েছেন তিনি। সীমা অতিরিক্ত ঋণ দেওয়া হলেও শাখার কর্মকর্তারা জামানত বাড়ানোর চেষ্টা করেননি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের বিভিন্ন সময়ের পরিচালনা পর্ষদও এই ঋণ পুনঃতফসিল করার অনুমোদন দিয়েছে। ২০০৭ সালের ২৯ জুন অনুষ্ঠিত ব্যাংকের ৯৫৪তম সভায় ১৩৬ কোটি টাকার ডিমান্ড লোনকে বাণিজ্যিক ঋণে রূপান্তর করে ১৫ বছর মেয়াদে পুনঃতফসিলের অনুমোদন দেওয়া হয়।

ব্যাংক টাকা আদায়ে অর্থ ঋণ আদালতের দ্বারস্থ হলে জসিম আহমেদ উচ্চ আদালতে রিট করে অর্থ ঋণ আদালতের মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেন। এমনকি তাকে ঋণখেলাপি দেখানোর ওপরও স্থগিত আদেশ পান। দীর্ঘদিন ধরে ওই স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে লড়েছে সোনালী ব্যাংক। সবশেষে স্থগিতাদেশ বাতিলের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এখন অর্থ ঋণ আদালতে মামলাটি বিচারাধীন। এদিকে স্থগিত আদেশ পাওয়ার পর জসিম আহমেদের পুরো ঋণকে মন্দ ও ক্ষতিকর খেলাপি হিসেবে উল্লেখ করেছে সোনালী ব্যাংক। এতে এই বিপুল খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়েছে সোনালী ব্যাংককে। এতে ব্যাংক মুনাফার অর্থ মূলধনে যোগ করতে পারেনি। ফলে মূলধন ঘাটতি আরও বেড়েছে। সবশেষে সরকার জনগণের করের অর্থ থেকে ব্যাংকটিকে এক হাজার কোটি টাকা মূলধন জোগান দিয়েছে।

ফেয়ার ট্রেড ফেব্রিকস লিমিটেড তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সদস্য তালিকায় নেই। তবে জসিম আহমেদের মালিকানাধীন আরেক প্রতিষ্ঠান ফেয়ার ওয়াশিং লিমিটেড বিজিএমইএর সদস্য। জসিম আহমেদের মালিকানাধীন আরেক প্রতিষ্ঠান ফেয়ার জিপার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডাইং মিলস এই ব্যাংকের গ্রাহক। সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখার কয়েক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গাজীপুরের কালিয়াকৈরের শফিপুরে অবস্থিত ফেয়ার ট্রেড ফেব্রিকস লিমিটেড বর্তমানে সরাসরি রফতানি কার্যক্রমে নেই। প্রতিষ্ঠানটি সাব-কন্ট্রাক্টে কিছু কাজ করে। ফেয়ার ওয়াশিং লিমিটেড এবং ফেয়ার জিপার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডাইং মিলসের অবস্থাও একই।

জসিম আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে ফোন, এসএমএস করলেও তিনি সাড়া দেননি। রাজধানীর মহাখালী ডিওএইচএসের ৩২ নম্বর সড়কে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানের করপোরেট অফিসে কয়েকবার গিয়ে যোগাযোগ করা হলেও কেউ কথা বলতে রাজি হননি।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ফেয়ার ফেব্রিকস থেকে ঋণ আদায়ে আগে থেকেই অর্থ ঋণ আদালতে মামলা আছে। এখন নতুন কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে জন্য একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

আর যে শাখা থেকে এই টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন জসিম আহমেদ সেই রমনা করপোরেট শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক ব্যাংকের জিএম বেলায়েত হোসেন বলেন, এক বছরের বেশি সময় ধরে ফেয়ার ট্রেড ফেব্রিকস ব্যাংকের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করছে না। ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেও ফেয়ার ফেব্রিকসের লোকজনকে পাওয়া যাচ্ছে না।

তদন্তকারী দলের একজন বলেন, এই ঋণে যা ঘটেছে তা পরিকল্পিত জালিয়াতি। বারবার পুনঃতফসিল, কিস্তি পুনর্বিন্যাস, লিমিট বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ঋণ সুবিধা দেওয়া হলেও জসিম আহমেদ কখনও ঋণ পরিশোধে আন্তরিক ছিলেন না। শাখা কর্তৃপক্ষও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এবং ব্যাংকের স্বার্থে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এ ছাড়া ব্যাংকের ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করা হলেও প্রধান কার্যালয় বিভিন্ন সময় শাখার সুপারিশে যাচাই-বাছাই ছাড়া মঞ্জুরিপত্র দিয়েছে।

ফেয়ার ট্রেড গ্রুপের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী এর ৭৫ শতাংশ মালিকানা জসিম আহমেদের আর তার স্ত্রী ইয়াসমিন আহমেদের রয়েছে ২৫ শতাংশ মালিকানা।

উৎস: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ