• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪০ অপরাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

অন্তত দু’মাস সহায়তা চান তিস্তা পাড়ের মানুষ

নীলফামারী প্রতিনিধি: অন্তত দু’মাস কাজের ব্যবস্থা চান নীলফামারীর তিস্তা পাড়ের মানুষ। কারণ হিসেবে তারা বলছেন বর্ষা শুরু হলে পানিতে বাড়ি ঘর তলিয়ে যায়, জমিতে আবাদ হয় না এমনকি উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যায় নদী বেষ্টিত এলাকার মানুষদের।
জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় রান্না ঘরে উনুনে(চুলো) পর্যন্ত জ্বলে না। দেখা দেয় খাদ্যভাব। কোন রকমে খেয়ে না খেয়ে দিনযাপন করতে হয় হাজার হাজার মানুষকে।
বাড়ি ফেলে ক্ষতিগ্রস্থরা অবস্থান নেন উঁচু কোন স্থান কিংবা গাঁইডম বাঁধ, স্পারে। কেউ কেউ আবার স্থান পরিবর্তন করে যান দুর দুরান্তের আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে।
সরেজমিনে গিয়ে এসব এসব কষ্টের কথা জানা যায় তাদের কাছ থেকে। তিস্তার প্রবেশ পথ নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পুর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের চারটি ওয়ার্ড নদীর অভ্যন্তরে। ওই চার এলাকায় বাস করেন অন্তত দশ হাজার মানুষ।
তাদের সংগ্রাম নদীর সাথে। তিস্তা নদী জমি গ্রাস করে ফেলায় শত শত মানুষ হয়ে পড়েছেন নিঃস্ব। বাধ্য হয়ে তারা অন্যের বাড়িতে কাজ করে, রিকসা চালিয়ে, কিংবা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে শ্রমবিক্রি করে সংসার চালান তারা।
পুর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের ছাতনাই কলোনী গ্রামের আব্দুল কাদের(৫০) বলেন, আমাদের সাড়ে ৫একর জমি গিলে খেয়ে প্রমত্তা তিস্তা। এখন আমাদের কিছুই নেই। রিকসা চালিয়ে কোন রকমে সংসার চালাতে হচ্ছে।
তিস্তার আকার বড় হচ্ছে আক্ষেপ করে কাদের বলেন, আশপাশের জমি রক্ষা করতে হলে দ্রুত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে সরকারকে। নাহলে নিঃস্ব হয়ে পড়বে হাজার হাজার এই অঞ্চলের মানুষ।
আরেক কৃষক শামসুল হক বলেন, আমরা আতংকে থাকি ঝাড়সিংহেশ্বর গ্রামে। কারণ তিস্তার প্রবেশ পথ এটি। উজানে(ভারতে) পানি বাড়লে তিস্তার প্রবাহ বেড়ে যায়। দ্রুত গতিতে প্রবেশ করে। নিমিষেই তলিয়ে যায় শত শত গ্রাম। রক্ষা করা যায় না, বাস্তা ভিটা, গরু ছাগল কিংবা ফসল।
তিনি উল্লেখ করেন, এবারে চলতি মৌসুমে ৫বিঘা জমিতে আমন লাগিয়েছি কিন্তু নষ্ট হয়ে গেছে। পানিতে তলিয়ে থাকায় ফসল হবে না। এ পর্যন্ত তিস্তা নদীতে তিন দফায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শত শত বিঘা আমন ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। মৌসুমে ব্যাপক ক্সতি হলো কৃষকদের। খাওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে পড়লো।
পুর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের শাহজালাল হোসেন বলেন, বর্ষা মৌসুমে উপার্জন বন্ধ হয়ে পড়ে তিস্তা পাড়ের মানুষদের। অর্থাভাবে ঠিকমত খেতেও পারেন না। সরকারী ভাবে যেটুকু সহযোগীতা করা হয় সেটি দিয়ে দিন চলে না।
তিনি বলেন, অন্তত দু’মাস খাদ্য সহায়তা করা দরকার এখানকার মানুষদের। তাছাড়া কর্মহীন এসব মানুষদের জন্য কলকারখানা কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিলে এতটা কষ্টে পড়বে না।
কলোনী গ্রামের আব্দুর রহিম আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপনের দাবী জানিয়ে বলেন, নদীতে পানি বাড়লে দিকবিদিক ছোটছুটি করেন নদী পাড়ের মানুষরা। থাকার কোন স্থান থাকে না। বাধ্য হয়ে স্পার, গাইড বাঁধ কিংবা স্কুলে গিয়ে আশ্রয় নেন। এজন্য সরকারী ভাবে এই এলাকায় একটি আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরী।
বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দুর্ভোগ কমেনি ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার দশ ইউনিয়নের প্রায় দশ হাজার মানুষের। এখোনো পানিতে তলিয়ে রয়েছে তাদের বাড়ি ঘর। রান্না ঘর ডুবে যাওয়ায় খেতেও পারছেন ঠিকমত।
ঝাড়সিংহেশ্বর গ্রামের আমেনা বেগম বলেন, চকির উপরে চুলো বানিয়ে রান্না করে কোন রকমে দু’বেলা খাওয়া করতে হচ্ছে। এভাবে চলা যাচ্ছে না। তাছাড়া বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দেয়ায় পানিও খাওয়া যাচ্ছে না।
এভাবে চরম কষ্টে দিনাতিপাত করছেন তিস্তা নদী বেষ্টিত পুর্ব ছাতনাই, টেপাখড়িবাড়ি, খড়িবাড়ি, গয়াবাড়ি, খালিশা চাপানি, ঝুনাগাছ চাপানি ও জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ি, শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের অন্তত দশ হাজার মানুষ।
পানিবন্দি হয়ে থাকায় পরিবারগুলোতে দেখা দিয়েছে বিভিন্ন রোগ। শিশুরা পড়েছে চুলকানিসহ নানা রোগে। তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে জনস্বাস্থ্য বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে খোলা হয়েছে নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র।
সিভিল সার্জন ডাঃ রনজিৎ কুমার বর্মণ জানান, বন্যা কবলিত ইউনিয়নগুলোতে সার্বক্ষনিক ভাবে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা কাজ করছেন। স্পটে স্পটে গিয়ে পরামর্শ দিয়ে আসছেন বাসিন্দাদের।
যেসব এলাকায় পরিস্থিতি নাজুক ওইসব এলাকায় স্বাস্থ্য ক্যাম্পের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং সবাইকে বিশুদ্ধ পানি খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসা হচ্ছে।
এদিকে জেলা প্রশাসন সুত্র জানিয়েছে বন্যা কবলিত এলাকার ৩ হাজার মানুষকে সহায়তা দেয়া হয়েছে। সহায়তার মধ্যে নগদ ১লাখ টাকা এবং ৮০মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খালেদ রহীম জানান, ১৮০ মেট্রিক টন চাল এবং সাড়ে ৭লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। যখন যেখানে প্রয়োজন তখন সেখানে দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে আমরা ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা প্রণয়ন করছি। যারাই আক্রান্ত হোক না কেন তাদের আমরা সাপোর্ট দেব।
এদিকে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষনে নীলফামারী জেলার দায়িত্বে থাকা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রনালয়ের উপ-সচিব আমিনুল ইসলাম ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার বন্যায় ক্সতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শন করে সরকারের কাছে প্রতিনিয়ত রিপোর্ট প্রদান করছেন।
তিনি বলেন, সরকারের তরফ থেকে কোন সমস্যা নেই ত্রাণ দেওয়ার ক্ষেত্রে। যেখানেই বান সেখানেই ত্রাণ দেয়া হবে। শুধু ত্রাণই নয় বন্যা কাটিয়ে উঠার পর সরকার ক্ষতিগ্রস্থদের পুর্নবাসন করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন কর্মকর্তা আবু তাহের মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি, ঝুনাগাছ চাপানি, খালিশা চাপানী, পুর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি ও গয়াবাড়ি এবং জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা, শৌলমারী, কৈমারী এবং ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে তিস্তার পানি প্রবেশ করায় বন্যা দেখা দিয়েছে।
এদিকে গত কয়েক দিনের তুলনায় পানি কমেছে তিস্তা নদীতে। বৃহস্পতিবার বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে তিনস্তার পানি নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে।
পাউবো ডালিয়া ডিভিশনের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হাফিজুল হক জানান, আমরা ব্যারেজের সবকটি(৪৪টি) জলকপাট খুলে রেখেছি। পানি বাড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
তবে আপাতত কয়েকদিন পানি বাড়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত তৃতীয় দফায় বিপদসীমার ৩২সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিতস হওয়ায় বন্যায় আক্রান্ত হন অন্তত ২০হাজার পরিবার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ