সিসি নিউজ: কয়েকদিনের টানা ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ইতোমধ্যে নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও লালমনিরহাটের বেশ কয়েকটি এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে সহস্রাধিক পুকুরের মাছ। ডুবে গেছে রাস্তা-ঘাট ও ফসলের ক্ষেত। এ অঞ্চলের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
নীলফামারী: তিনদিনের ভারী বর্ষন ও উজানের ঢলে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তা বেষ্টিত আশেপাশের মানুষজনের মধ্যে আতংক দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকেই বাড়তে থাকে তিস্তার পানি। শনিবার সকাল থেকে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বর্তমানে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সাথে রয়েছে মুষুল ধারে বৃষ্টি। পরিস্থিতি মোকাবেলায় তিস্তার সবকটি জলকপাট খুলে রেখেছে পাউবো কৃতপক্ষ। আমাদের জলঢাকা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ভারী বর্ষন আর পানি চাপে তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের দিনাজপুর প্রধান সেচ ক্যানেলের ডানতীর বাধের ১০০ ফুট বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। শনিবার সকালে জলঢাকা উপজেলার দুন্দিবাড়ী কাঠালী নামকস্থানে এই ঘটনাটি ঘটে। এতে ওই এলাকার হাজার হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন পানিতে তলিয়ে যায়।
গত ২৪ ঘন্টার বৃষ্টি জেলার কয়েক বছরের রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। নীলফামারী সদরে ১৯৫, ডোমারে ২২৩, ডিমলায় ১৫০, জলঢাকায় ২০৭, সৈয়দপুর ২৫০ ও কিশোরগঞ্জে ২৪৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অপরদিকে গত ২৪ ঘন্টায় ডালিয়া পয়েন্টে ১৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে পাউবো সূত্রে জানা গেছে।
সৈয়দপুরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় পৌর এলাকার ৪নং ও ১১ নং ওয়ার্ডের কিছু এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সৈয়দপুর পৌর পরিষদ আজ শনিবার বিকেলে এক জরুরী সভা করেছে। সভায় কাউন্সিলরদের সংশ্লিষ্ট এলাকায় সার্বক্ষনিক খোঁজখবর নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সৈয়দপুর পৌরসভার মেয়র অধ্যক্ষ মো: আমজাদ হোসেন সরকার এক প্রশ্নের জবাবে তিনি সিসি নিউজকে জানান, শহর রক্ষা বাঁধে টহল দেয়ার জন্য তিনি উপজেলা ও থানা প্রশাসনকে অনুরোধ জানিয়েছেন। পরিষদের একটি সূত্র জানান, পৌর মেয়র পরিষদে অবস্থান করে বন্যা কবলিত পৌরবাসীর খোঁজখবর রাখছেন। ওই সূত্রটি জানান, বিকেলে পৌরসভার ১১নং ওয়ার্ডে বন্যা কবলিত মানুষদের মাছে তিনি রান্না করা খাবার বিতরণ করেছেন।
কুড়িগ্রাম: টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে কুড়িগ্রামের ধরলা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রসহ সবকটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সেতু পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ৪১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্লাবিত হয়ে পড়েছে নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী, কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী, চিলমারী, রৌমারী, রাজিবপুর ও উলিপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৫০ ইউনিয়নের প্রায় দুই শতাধিক গ্রাম। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এসব এলাকার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ।
সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের কুমরপুর এলাকায় কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী সড়ক তলিয়ে যাওয়া যেকোন মুহুর্তে জেলা শহরের সাথে নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। এছাড়াও গ্রামীণ কাঁচা-পাকা সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় এসব এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। তলিয়ে গেছে এসব এলাকার গ্রামীণ হাট-বাজারগুলো। তলিয়ে গেছে জেলার ৫০ ইউনিয়নের রোপা আমনসহ মৌসুমি ফসল। বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় মানুষজন ঘর-বাড়ি ছেড়ে বাধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পাকা সড়কে আশ্রয় নিচ্ছে।
জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোহম্মদ ফেরদৌস খান জানান, শক্রবার থেকে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বন্যা মোকাবেলায় মাঠ পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইউপি চেয়ারম্যানগণকে পানিবন্দি মানুষজনের পাশে দাড়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলার সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত ত্রান রয়েছে। যেখানে যা প্রয়োজন তা দেয়া হবে।
জেলা শিক্ষা অফিসার খন্দকার আলাউদ্দিন আল আজাদ জানান, জেলায় ২৫টি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্যার পানিতে তুলিয়ে যাওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার রায় চৌধুরী জানান, জেলায় ৪৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি উঠায় বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে।
পঞ্চগড়: পঞ্চগড়-ঠাকুরগাঁওয়ের নব নির্মিত ব্রডগেজ রেল লাইনের উপর দিয়ে প্রবল স্রোতে পানি প্রবাহের কারণে নয়নিবুরুজ স্টেশন থেকে কিসমত স্টেশন পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার রেলপথের বিভিন্ন জায়গায় স্লিপারের মাঝের পাথর ও মাটি সরে গেছে। এতে সাময়িক ভাবে রেল চলাচল বন্ধ রেখেছেন রেল কর্তৃপক্ষ। এ কারণে পঞ্চগড় থেকে ঠাকুরগাঁও রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তবে বালির বস্তা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ স্থান গুলো সংস্কারের চেষ্টা করছে রেল বিভাগ।
পঞ্চগড় রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার বজলুর রহমান বলেন, অতি বর্ষণ এবং পানির প্রবল স্রোতে কিছু জায়গায় রেলপথ (ওয়াস আউট) ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এজন্য পঞ্চগড় থেকে ঢাকা রেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। ঢাকার যাত্রীদের ঠাকুরগাও থেকে যাতায়াতের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
এদিকে রেলপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পেয়ে শনিবার বিকেলে রাজশাহী থেকে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু জাফর মিয়ার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধ দল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ পরিদর্শন করেছেন।
রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের লালমনিরহাট ডিভিশনের ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার কারনে রেল লাইনের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। অনেক জায়গায় পাথর ও মাটি সরে গেছে। এখানে পাশেই মহারানী নামের একটি স্লুইচগেট আছে সেটি খোলা না থাকার কারণেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এখন মোটমুটি ভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত লাইনের সংস্কারের চেষ্টা করছি। তবে পানি নেমে গেলেই পুরোপুরি ভাবে সংস্কার করা হবে এবং রেল চলাচল স্বাভাবিক হবে।’