সিসি ডেস্ক: বন্যার তীব্রতাকে পরাজিত করে মানবতার জয় হল এবার। সেখানে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়াও বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ভারতে প্রবল বন্যার কারণে দিশেহারা বহু মানুষ যখন জীবন বাঁচানো লক্ষে শনিবার মধ্যরাত থেকে আসতে থাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে, তখন রাত জেগে প্রতিবেশী দেশের অসহায় মানুষগুলোকে নদীর বুক থেকে উদ্ধার করে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন সীমান্তে বসবাসকারী বাংলাদেশের নাগরিকরা। আর এভাবেই প্রতিবেশী দেশের বিপদাপন্ন মানুষদের উদ্ধার করে আশ্রয় দিয়ে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে লালমনিরহাটের মোঘলহাট সীমান্তের মানুষ। এতে ভারতের মানুষ বাংলাদেশের মানুষের এমন মহানুভবতায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
বাংলাদেশের মোগলহাট সীমান্তে আশ্রয় নেওয়া ভারতীয় নাগরিক এক সন্তানের জননী মেহের বানী (২৩) বলেন, “ভারতের জারি ধরলা থেকে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছি। সেখানকার ধরলানদীর চর বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় জীবন নিয়ে বাংলাদেশে এসেছি। অনেকেই সেখান থেকে ভারতে যেতে পেরেছে। কিন্তু আমরা প্রায় ১ হাজার লোক ওই চরে আটকা পড়েছিলাম। পরে আমরা কয়েকশ মানুষ বাংলাদেশের মোগলহাট ও দুর্গাপুরের দিকে চলে আসি। বিজিবির সদস্যরা যদি আমাদের বাংলাদেশে ঢুকতে এবং বাংলাদেশীরা আশ্রয় না দিতো তাহলে ধরলার প্রচন্ড পানির স্রোতে নিশ্চিত ডুবে মারা যেতাম।” এসময় তিনি স্থানীয় বাংলাদেশি লোকজন ও বিজিবি’র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, ধরলার ভয়াবহ পানি বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট বন্যা থেকে জীবন বাঁচাতে ভারতের জারি ধরলার দুইটি গ্রামের প্রায় ৭/৮ শত ভারতীয় নারী-পরুষ ও শিশু বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার মোগলহাট ও দুর্গাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন।
শনিবার সন্ধ্যা থেকে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব ভারতীয় লোকজন লালমনিরহাটের মোগলহাট ইউনিয়ন ও আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের একাধিক গ্রামের লোকজনের বাড়ি, ফাঁকা জায়গা ও পাকা রাস্তার ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। ভারতীয়দের মধ্যে অনেকের সাথে বাংলাদেশিদের আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকার সুবাধে অনেকে বাড়িতেও আশ্রয় পেয়েছেন।
সোমবার বিকেলে মোগলহাট ও দুর্গাপুরের বিভিন্ন এলাকায় গেলে দেখা যায়, বন্যা কবলিত ভারতীয় এসব দুর্গতরা স্থানীয় অনেক লোকজনের বাড়িতে উঠেছেন। কেউ কেউ পাকা রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন আর্জিনা খাতুন (৩৫) সাড়ে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তিনি ভারতীয় জারি ধরলার মুল চরে বসবাস করেন। স্বামী ইকরুল হকসহ (৪৪) তিনি ৩ মেয়ে ও ১ ছেলেকে সাথে নিয়ে দুর্গাপুরের কুমারপাড়ায় অবস্থান নিয়েছেন। তার প্রতিবেশী এক সন্তানের জননী মেহের বানীও (২৩) এসেছেন। মেহের বানীর স্বামী দিল্লিতে একটি সেলাই কারখানার শ্রমিক। বাংলাদেশে তাদের কোনও অসুবিধা হচ্ছে না বলে জানান তারা।
বাংলাদেশি ফজলুল হকের বাড়িতে চার শিশু সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নেওয়া ছামিদুল হক বলেন, বিজিবি ও স্থানীয় লোকজনকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবে না তারা। যদি তাদের বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া না হতো তাহলে এসব বন্যা কবলিত লোকজন ধরলার ভয়ঙ্কর বন্যার পানির স্রোতে ডুবে মারা যেত।
একই ইউনিয়নের কর্ণপুর এলাকার অপর আশ্রয়দাতা ফজলুল হক ও তার স্ত্রী গোলে খাতুন বলেন, ভারতের জারি ধরলা চরের বাসিন্দা বছির উদ্দিন (৭২) ও তার স্ত্রী আম্বিয়া খাতুন (৬৩) নিরুপায় হয়ে জীবন বাঁচাতে একটু আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশে ঢুকেছেন। তাদের উচিৎ বন্যা কবলিতদের থাকার একটু জায়গা করে দেয়া। যদিও তারাও বন্যা কবলিত, তাদের বাড়িতেও হাঁটু পানি বলে জানান তারা।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের চওড়াটারী এলাকার বাসিন্দা রিয়াজুল হক (৪৪) বলেন, মানুষ মানুষের জন্য। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় কারও দেশ বা জাতি থাকতে নেই। একটু আশ্রয়ের জন্য বন্যা কবলিত ভারতীয় এসব লোকজন জীবন নিয়ে এসেছে, তাই তার চাতালের ফাঁকা জায়গায় কিছু ভারত থেকে আসা লোকজনকে আশ্রয় দিয়েছেন। তাদের সঙ্গে গরু-ছাগলও আছে।
লালমনিরহাট উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন মোগলহাট বিজিবি কোম্পানির সদস্যরা আশ্রয়ের সন্ধানে আসা ভারতীয়দের প্রবেশে বাধা প্রদান করে। পরে লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের পরিচালক গোলাম মোর্শেদকে অনুরোধ করলে মানবিক দিক বিবেচনা করে বন্যা কবলিত ভারতীয়দের প্রবেশের অনুমতি দেন তিনি। তাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেই ভারতীয়রা আবার নিজ দেশে ফিরে যাবেন।
লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের পরিচালক লে. কর্নেল গোলাম মোর্শেদ বলেন, প্রায় ৭/৮ শতাধিক ভারতীয় নারী-শিশু ও পুরুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার জন্য এসেছে। তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদেরকে বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বিজিবির সদস্যরা তাদের খোঁজখবরও রাখছে।
বিবার্তা