• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৬ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সংসদে প্রস্তাব গৃহীত

সিসি ডেস্ক: রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরতসহ তাদের নাগরিকত্বের অধিকার দিয়ে নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা গ্রহণে মিয়ানমার সরকারের ওপর জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানাতে সংসদে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। সরকার দলের সংসদ সদস্য সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির এ সংক্রান্ত প্রস্তাব সর্বসন্মতক্রমে গৃহীত হয়।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সাধারণ প্রস্তাবের ওপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, পররাষ্ট্র আবুল হাসান মাহমুদ আলী, সরকার দলের শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবদুল মতিন খসরু, মহিউদ্দিন খান আলমগীর, এটিএম আবদুল ওয়াহহাব, সাইমুম সরওয়ার কমল, জাসদের মইনউদ্দিন খান বাদল ও শিরীন আখতার বক্তব্য রাখেন। প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টা আলোচনার পর প্রস্তাবটি সর্বসন্মতক্রমে গৃহীত হয়। আলোচনাকালে রোহিঙ্গাদের জন্য একটি সেফ জোন স্থাপনসহ আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের কথা বলা হয়।
দীপু মনির প্রস্তাবটি হচ্ছে, ‘সংসদের অভিমত এই যে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অব্যাহত নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধ, তাদেরকে তাদের বাসভূমি থেকে বিতাড়ন করে বাংলাদেশে পুশইন করা থেকে বিরত থাকা এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্বের অধিকার দিয়ে নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা গ্রহণে মিয়ানমার সরকারের ওপর জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানানো হোক ।’
দীপু মনি তার প্রস্তাবে বলেন, ‘মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যলঘু সম্প্রদায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অব্যহত নির্যাতন-নিপীড়ন চরম আকার ধারণ করায় সেখানকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর লাখ লাখ লোক ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আশ্রয় নিয়েছে। সীমান্তের প্রতিটি পয়েন্টে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নিষ্ঠুর নির্মমতার শিকার- কেউ অর্ধমৃত, কেউ গুলিবিদ্ধ, কেউবা আবার ক্ষত-বিক্ষত হাত-পা নিয়ে কোনও মতে জীবন নিয়ে ঢলের মতো প্রতিদিন বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। রোহিঙ্গাকে আখ্যায়িত করা হচ্ছে বাঙালি সন্ত্রাসী হিসেবে। নাফ নদীতে ভাসছে সারি সারি রোহিঙ্গা লাশ। নিজ ভূমি থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে জাতিগতভাবে নির্মূলের লক্ষ্যে চালানো অব্যাহত নৃশংসতায় গর্ভবতী মা-বোন, কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ, এমনটি দুগ্ধপোষ্য শিশুকে রেহাই দিচ্ছে না। রোহিঙ্গারা যাতে নিজভূমিতে ফিরে যেতে না পারে, তার জন্য তাদের প্রতিটি বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।’
দীপু মনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার মানবিক কারণে দুর্দশাগ্রস্ত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আশ্রয় দিয়েছে। তাদের খাদ্য ও চিকিৎসাসহ অন্যান্য মানবিক সহায়তা অব্যহত রেখেছে।’
মিয়ানমারের ইতিহাস তুলে ধরে সাবেক মন্ত্রী বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবেই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের অধিবাসী। ৫০০ বছরের বেশি সময় ধরে আরাকান রাজ্যে বসবাস করছে। চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে আরাকান ছিল স্বাধীন রাজ্য। রাজা বোধাপোয়া ১৭৮৪ সালে আরাকান দখল করে তৎকালীন বার্মার সঙ্গে যুক্ত করেন।’
প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় তিনি বলেন, ‘১৯৮২ সালে বার্মার নাগরিকত্ব আইন জারির পর রোহিঙ্গাদের সকল অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। বর্তমানে তাদের কোনও ভোটাধিকার নেই। তাদের কোনও প্রতিনিধি সংসদে নেই।’
দীপু মনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে নোবেল বিজয়ী অং সাং সু চির যে নীতি তা আমাদের হতাশ করে, ক্ষুব্ধ করে। আমরা এই ‘গণতান্ত্রিক‘ নেত্রীর কাছে এটা আশা করি না। কিছুদিন আগে ভূমধ্যসাগরের এক আয়লানের লাশ বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। আজ শত শত আয়লানের লাশ নাফ নদীতে ভাসছে। আমরা চাই বিশ্ব বিবেক এগিয়ে আসুক, রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াক।’
গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমার সরকারের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হওয়া উচিত বলে সরকার দলের সাইমুম সরওয়ার কমল মন্তব্য করেন।
তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী সব রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মধ্যে আনার প্রস্তাব করে বলেন, ‘আগে যারা এসেছে তাদের যদি আমরা নিবন্ধনের মধ্যে না আনতে পারি, তাহলে আমরা সমস্যায় পড়বো। রোহিঙ্গাদের নিয়ে যেন কোনও খেলা না হয়, তার জন্য সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব নেত্রী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তিনি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। আগামীতে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দিতে হলে শেখ হাসিনা পেতে পারেন ‘

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মির নেতা আতাউল্লাহর জন্ম পাকিস্তানে। তিনি এসে এখানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে অং সাং সু চ ‘র ‍তুলনা করে জাসদের মইন উদ্দিন খান বাদল বলেন, ‘সারা বিশ্ব দুই নারীর পরস্পর বিরোধী অবস্থান দেখছে। একজন শান্তিতে নোবেল জয়ী, যিনি শান্তি ও গণতন্ত্রের বারোটা বাজিয়েছেন। আরেকজন বুক পেতে দিয়েছেন। আমরা তাদের খাদ্য ও আশ্রয় দিচ্ছি। তবে এই আশ্রয় ও খাদ্য দিতে গিয়ে নিজেদের অবস্থান ক্ষুণ্নকরা যাবে না। বাংলাদেশকে বিপদমুক্ত রাখতে হবে।’
কসোভোর উদাহরণ দিয়ে বাদল বলেন, ‘এ ধরনের ইস্যুতে বিশ্ব সমাধান দিয়েছে। আমরা রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধান চাই। ’ বাদল মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ‘সেইফ জোন’ তৈরি করার দাবি জানান।
রোহিঙ্গাদের ঢালাওভাবে সন্ত্রাসী না বলার দাবি জানিয়ে বাদল প্রশ্ন রাখেন, ‘চোখের সামনে মা–বোনকে ধর্ষণ করা হলে, হত্যা করা হলে অস্ত্র তুলে নেওয়ার অধিকার কি নেই?’
সরকার দলের ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর যে নৃশংসতা হচ্ছে তা সমস্ত নৃশংসতাকে হার মানিয়েছে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী সমস্যা সমাধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জাতীয় সংসদকে অবহিত করেন। তিনি বলেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শান্তিপূর্ণ সমাধানে তৎপর রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের বিষয়টি নিয়ে দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ‘ তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারকে বিভিন্ন প্রস্তাব দেওয়া হলেও এখনও তারা কোনও প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি।’
রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতা নয় গণহত্যা চলছে। রোহিঙ্গাদের ধর্ষণ করা হচ্ছে। আগুন দিয়ে মারা হচ্ছে। হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হচ্ছে। আশ্রয় হতে হবে সাময়িক। এত জনসংখ্যার দায় দায়িত্ব আমরা নেবো না। সমস্যা সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে। সেজন্য তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে। আঞ্চলিক ষড়যন্ত্রের শিকার যাতে বাংলাদেশ না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে অস্ত্র ও মাদক আসতে পারে।’
শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ‘বিএনপি জামাত রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছিল। তারা রোহিঙ্গাদের ভুয়া ভোটার বানিয়েছিল। রোহিঙ্গা ইস্যুতে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস এখন নীরব। কোনও অপশক্তি যেন জাতিগত এই দ্বন্দ্বকে ইসলামি কায়দায় ব্যবহার করতে না পারে, সেই বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। ’প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টি জাতিসংঘে সুন্দরভাবে উত্থাপন করবেন বলে সেলিম আশা প্রকাশ করেন।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে আমরা রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছি। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।’
অং সাং সু চি’র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘শান্তি নোবেল জয়ী সুচি বলেছেন, তারা গণহত্যা করেননি, দুষ্কৃতকারীরা করেছেন। তিনি কী করে এ কথা বলতে পারলেন।’
রোহিঙ্গাদের জন্য সেফ জোন সৃষ্টির প্রস্তাব বরে বাণিজ্য মন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিশ্বের চাপ সৃষ্টি করা উচিত, যাতে কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়িত হয়। আরাকানে একটি সেফ জোন স্থাপন করতে হবে।’ জাতিসংঘ শান্তি রক্ষী বাহিনীকে দায়িত্ব দিয়ে এই মানুষগুলো যাতে নিজেদের জন্মস্থানে ফিরে যেতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।’
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, ‘এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র আশিয়ান অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সমস্যা। মায়ানমারের সেনাবাহিনী পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্যতম ঘটনার জন্ম দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের শুধু তাড়িয়ে ক্ষান্ত থাকছে না তারা। রোহিঙ্গারা যাতে অক্ষত অবস্থায় বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য সীমান্তে মাইন পেতে রাখা হচ্ছে। এটা শুধু ধর্মীয় বা জাতিগত নির্মূলের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না । এর পেছনে রয়েছে বিদেশি শক্তির নানা চক্রান্ত। আরাকান রাজ্য নানা ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীকে উস্কে দেওয়ার চক্রান্ত হচ্ছে কিনা সেটাও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ