সিসি ডেস্ক, ২৫ মে ।। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ। তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানি তাগিদ’–দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার পর বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর আসে খুশি নিয়ে। ঈদের চাঁদ দেখা দেওয়ার পর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই গান রেডিও, টেলিভিশনে সম্প্রচার শুরু হওয়া মানে চাঁদ রাতেই ঈদের খুশি, আনন্দ শুরু হওয়া। পরস্পরর সঙ্গে সাক্ষাৎ, ফোনে ঈদের শুভেচ্ছা বিতরণ শুরু।
হাল আমলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক হারে শুভেচ্ছা বিনিময় হয়ে থাকে। এবারও চাঁদ দেখা যাওয়ার পর রেডিও টেলিভিশনে গানটি বেজেছে। কিন্তু, প্রসন্ন প্রফুল্ল চিত্তে এবার ঘরে ঘরে কণ্ঠে বাজছে না অন্তরে ধারণ করা সেই গান। অদৃশ্য করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী মহামারি দেখা দেওয়ায় ঘরবন্দি জীবনে উৎসবে যেন সেই প্রাণটাই আজ বড় শুকনো, বিবর্ণ। তারপরও আজ মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসবের দিন।
চিরায়ত উদযাপনের যে ধারা দেড় হাজার বছর ধরে প্রচলিত, তা এ বছরে পুরোপুরি বিপরীত। বিশ্ব মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে এই ঈদে উদযাপন হবে সীমিত, ঈদের জামাত হবে মসজিদে। সরকারের পক্ষ থেকে জোর দিয়েই বলা হয়েছে, মহামারিকালের এই ঈদে কোলাকুলি থেকে বিরত থাকতে হবে। বাইরে না গিয়ে ঘরে থেকে পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে কাটাতে হবে পবিত্র ঈদুল ফিতর।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশে সব ধর্ম এবং বর্ণের মানুষ বারাবরে এ উৎসবে সমানভাবে শামিল হন। ঈদের আনন্দ সবাই ভাগাভাগি করে উপভোগ করেন। কিন্তু, ঘরবন্দি জীববনে এবার না যাওয়া যাবে প্রতিবেশী বা আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে, না হবে তাদের আমন্ত্রণ করা।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মুসল্লিদের জীবনের ঝুঁকি বিবেচনা করে এবছর ঈদগাহ বা খোলা জায়গার পরিবর্তে ঈদের নামাজের জামাত নিকটস্থ মসজিদে আদায় করার জন্য অনুরোধ করা হলো। প্রয়োজনে একই মসজিদে একাধিক জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ঈদের নামাজের জামাতের সময় মসজিদে কার্পেট বিছানো যাবে না। নামাজের আগে সম্পূর্ণ মসজিদ জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। মুসল্লিরা প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বে জায়নামাজ নিয়ে আসবেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধ নিশ্চিত করতে মসজিদে ওজুর স্থানে সাবান ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখতে হবে। মসজিদের প্রবেশ পথে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ সাবান ও পানি রাখতে হবে। প্রত্যেককে নিজ নিজ বাসা থেকে ওজু করে মসজিদে আসতে হবে এবং ওজু করার সময় কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। ঈদের নামাজের জামাতে আগত মুসল্লিকে অবশ্যই মাস্ক পরে মসজিদে আসতে হবে। মসজিদে সংরক্ষিত জায়নামাজ ও টুপি ব্যবহার করা যাবে না। ঈদের নামাজ আদায়ের সময় কাতারে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে দাঁড়াতে হবে। এক কাতার অন্তর অন্তর কাতার করতে হবে। শিশু, বয়োবৃদ্ধ, যেকোনও অসুস্থ ব্যক্তি এবং অসুস্থদের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তি ঈদের নামাজের জামাতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।
ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রবিবার (২৪ মে) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বাংলাদেশের জনগণসহ বিশ্ববাসীকে ঈদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। করোনাভাইরাসের এই মহামারিতে গণজমায়েত এড়িয়ে ঘরে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার আহ্বান জানান তারা। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রোববার (২৪ মে) এক বাণীতে এই আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী।
বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ঈদুল ফিতর মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা ও সংযম পালনের পর অপার খুশি আর আনন্দের বার্তা নিয়ে আমাদের মাঝে সমাগত হয় পবিত্র ঈদুল ফিতর। এদিন সব শ্রেণিপেশার মানুষ এক কাতারে শামিল হন এবং ঈদের আনন্দকে ভাগাভাগি করে নেন। ঈদ সবার মধ্যে গড়ে তোলে সৌহার্দ, সম্প্রীতি ও ঐক্যের বন্ধন।
তিনি আরও বলেন, ইসলাম শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম। এখানে হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানির কোনও স্থান নেই। মানবিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক সহাবস্থান, পরমতসহিষ্ণুতা ও সাম্যসহ বিশ্বজনীন কল্যাণকে ইসলাম ধারণ করে। বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে এ বছর ঈদুল ফিতর ভিন্ন প্রেক্ষাপটে পালিত হবে। এ কঠিন সময়ে আমি সমাজের স্বচ্ছল ব্যক্তিবর্গের প্রতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি। একইসঙ্গে আমি দেশবাসীর প্রতি যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে ঈদুল ফিতর উদযাপনের আহ্বান জানাচ্ছি।
ঈদ উপলক্ষে এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মুসলিম জাহানের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আমি দেশবাসী ও বিশ্বের সকল মুসলমানদের জানাচ্ছি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ঈদ মোবারক। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে মুসলমানদের আত্মশুদ্ধি, সংযম, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন পরিব্যক্তি লাভ করুক—এটাই হোক ঈদ উৎসবের ঐকান্তিক কামনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অস্বাভাবিক পরিবেশে এবার ঈদুল ফিতর উদযাপন করছি। করোনাভাইরাস সমগ্র বিশ্বকে স্থবির করে দিয়েছে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এক অদৃশ্য ভাইরাস মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই বিপদের সময় আমাদের স্বাস্থ্যকর্মী, ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ যারা জীবন বাজি রেখে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের এই মহামারিতে অনুরোধ করবো, যথাসম্ভব গণজমায়েত এড়িয়ে আমরা যেন ঘরে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করি এবং আল্লাহর দরবারে বিশেষ দোয়া করি যে এই সংক্রমণ থেকে আমরা সবাই দ্রুত মুক্তি পাই।
মাতৃভূমি বাংলাদেশ ও মুসলিম উম্মাহর উত্তরোত্তর উন্নতি, সমৃদ্ধি ও অব্যাহত শান্তি কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।