সিসি নিউজ।। রাজিয়ার ইচ্ছা ঘরসংসার সামলানোর পাশাপাশি উপার্জনক্ষম কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। কিন্তু কীভাবে এটা সম্ভব তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। ২০০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ফেসবুকের এক বন্ধু তাকে উই (উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স) গ্রুপের যুক্ত করেন। অনলাইনে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, পণ্য বিক্রির কৌশল শেখানোসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার দেশীয় পণ্যের প্ল্যাটফর্ম এটি। উই এর সদস্য হিসেবে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ক্রেতাও আছেন। এই গ্রুপে সফল নারী উদ্যোক্তাদের পোস্টে রাজিয়া অনুপ্রেরণা খুঁজে পান৷ অন্যদের দেখে তার নিজের মধ্যেও উদ্যোক্তা হওয়ার তাগিদ জন্মায়।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে রাজিয়া শুরু করেন পাটের পণ্য উৎপাদনের কাজ। এসময় তিনি বেচাকেনার সুবিধার্থে ‘নান্দনিক ক্রাফট’ নামে ফেসবুকে একটি পেজ খুলেন। প্রথম দিকে রাজিয়া শুধু পাটের ব্যাগ ও শিকা তৈরি করতেন। নিজের ফেসবুক পেজ ও উইয়ের অফিসিয়াল গ্রুপে পণ্যের প্রচারণা চালাতেন। ধীরে ধীরে এভাবেই রাজিয়ার নান্দনিক ক্রাফট গ্রাহক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে।
সময়ের সঙ্গে রাজিয়া জোর দেন নান্দনিক ক্রাফটে। যুক্ত করতে থাকেন নিত্যনতুন পণ্যসামগ্রী। বৈচিত্র্য আনেন কাজে। বর্তমানে নান্দনিক ক্রাফটের পাটপণ্যের মধ্যে রয়েছে ব্যাগ, পার্স, শোপিস, শিকা, টেবিল ম্যাট, মানিব্যাগ ও দোলনা। ঘরের সৌন্দর্য বর্ধনে আরও আছে পাটের তৈরি রুম ডেকোরেট মিরর, ওয়ালমেট, ড্রিমক্যাচার, ম্যাগাজিন হোল্ডার, ফোন চার্জিং হোল্ডারসহ বিভিন্ন ব্যবহার্য দ্রব্য। এসবের পাশাপাশি রাজিয়ার উল সুতার কারুকাজেরও প্রচুর চাহিদা অনলাইন মার্কেটে।
নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের নিয়ামতপুর মুন্সিপাড়ার গৃহবধূ রাজিয়া সুলতানা। স্বামী মালেকুজ্জামান পেশায় ব্যবসায়ী। তাদের দুই ছেলে-মেয়ে। রাজিয়া একজন নারী কর্মচারী নিয়ে পাটজাত পণ্যের উৎপাদন শুরু করেন। কখনো ইউটিউব দেখে, কখনো বা অভিজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে বিভিন্ন পাটজাত পণ্য তৈরির চেষ্টা করেন। পরে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ নিয়ে পাটজাত পণ্য উৎপাদনের কাজ পুরোপুরি আয়ত্ব করে ফেলেন। এরপরই শুরু হয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবে রাজিয়া সুলতানার পথচলা।
প্রথম দিকে নান্দনিক ক্রাফটের সব কাজ রাজিয়া এক হাতে সামলাতেন। ধীরে ধীরে কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে ১০ জন নারীকে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। তাদের তিনি নিজ হাতে কাজ শেখাচ্ছেন। সেইসঙ্গে তাদের আয়ের পথও সুগম করেছেন। স্বামীর উপার্জনের পাশাপাশি রাজিয়ার এই বাড়তি আয় তার পারিবারিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
নান্দনিক ক্রাফটের নারী কর্মচারী স্মৃতি রুপা জানান, নিজের সংসার ঝামেলা মিটিয়ে সকাল-সন্ধ্যা এখানে কাজ করি। এতে মাস শেষে স্বামীর হাতে কিছু টাকা তুলে দিতে পেয়ে নিজেকে গর্বিত মনে করি। তিনি জানান, কর্মস্থলে কাজের পাশাপাশি শিশু সন্তানদের লেখাপড়া ও খেলাধুলার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন রাজিয়া ম্যাডাম। বাড়তি এ সুবিধার জন্য সঠিকভাবে কাজে মনোনিবেশ করতে পারি।
রাজিয়া সুলতানা জানান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী (উদ্যোক্তা) হিসেবে আমার পথচলার শুরুটা উইয়ের মাধ্যমে। ব্যবসার সূচনালগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত যত অর্ডার পেয়েছি, তার বেশিরভাগই উইয়ের কল্যাণে। দেশের বাইরে থেকেও পণ্যের চাহিদা আসছে। কিন্তু বর্তমানে কাঁচামালের দাম বেশি হওয়ায় পণ্যের দর-দামের কারণে রপ্তানী সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরো জানান, পাটজাত পণ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পাটের উপর অন্যরকম একটা ভালো লাগা জন্মেছে। ভবিষ্যতে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের উৎপাদিত পাটপণ্য বিদেশের বাজারে রপ্তানি করতে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) এর উপ-মহাব্যবস্থাপক হুসনে আরা বেগম জানান, নারীরা এখন আর শুধু গৃহকর্মী হিসেবে থাকতে চায় না। বিগত ৩/৪ বছরের মধ্যে এ অঞ্চলে শহরের বিভিন্ন বাসায় এবং গ্রামের বাড়িতে এমন শতাধিক ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীদের অংশগ্রহনে মজবুত হচ্ছে অর্থনীতির চাকা। নারী উদ্যোক্তার মাধ্যমে নারীদের কর্মক্ষেত্র যেমন তৈরী হচ্ছে, তেমনি সংসারে নারীদের সমৃদ্ধি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।