সিসি নিউজ ডেস্ক ।। দেশজুড়ে ধান ও চালের অবৈধ মজুদ খুঁজে বের করতে খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন তদারক সংস্থা মাঠে নেমেছে। অভিযানের খবর পেয়ে রাজধানীর দুটি বড় বাজারের চাল ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ করে পালিয়েছেন।
রাজধানীর সবচেয়ে বড় পাইকারি চালের বাজার বাবুবাজারে মঙ্গলবার দুপুরে অভিযানের খবর পেয়ে দোকান বন্ধ করে পালিয়ে যান সেখানকার চাল ব্যবসায়ীরা।
চালের অবৈধ মজুতদারির বিরুদ্ধে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হারুন-অর-রশিদের নেতৃত্বে অভিযানে আসা দলটি ঘটনাস্থলে এসে দেখতে পান বেশিরভাগ দোকান বন্ধ।
উপসচিব হারুন-অর-রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখানে (বাবুবাজার) আসার পর বেশিরভাগ দোকান পেয়েছি বন্ধ। কয়েকটি দোকান খোলা থাকলেও সেখানে মালিকদের পাইনি। তাই তাদের লাইসেন্সটাও হাতে পাইনি। তাদের কিছুটা সময় দিয়েছি। আমরা সেগুলো সংগ্রহ করব।’
হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘অভিযান এখানেই শেষ নয়, এটা চলবে। অবৈধ মজুতদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াই এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। অবৈধভাবে কেউ মজুদ করতে পারবে না।’
এদিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটে অভিযান চালিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একটি টিম। অভিযানের খবরে সেখানকার চাল ব্যবসায়ীরাও পালিয়ে যান। এসময় মূল্য তালিকায় অসংগতি থাকায় দুটি চালের দোকানকে চার হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ফাহমিনা আক্তার বলেন, ‘চালের দাম কেন বেড়েছে সেটার খোঁজ নিতে আমরা এসেছি। আমাদের আসার খবরে অনেক চাল ব্যবসায়ী পালিয়ে যান। তাদের অনেক অনুরোধ করা হলেও তারা দোকানে ফিরে আসেননি।’
ভোক্তা অধিকারের এই সহকারী পরিচালক বলেন, ‘দোকানিরা অভিযোগ করেন, তারা টাকা দিয়েও চাল পাচ্ছেন না। মিল মালিকরা তাদের বলছেন, ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে চালে। তাছাড়া অনেক ব্যবসায়ী অগ্রিম টাকা দিয়েও চাল পাচ্ছেন না।’
কৃষি মার্কেটের পাইকারি চাল বাজার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মনিরুল ইসলাম মন্টু বলেন, ‘আমাদের মধ্যে হয়ত কেউ একটু বেশি দামে চাল বিক্রি করে। তবে তাদের সংখ্যা অনেক কম।’
দোকানিদের পালানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তারা মনে করেছে তাদের জরিমানা করা হবে, এ ভয়েই তারা দোকান থেকে পালিয়ে যান। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আমাদের কাছে চালের দাম বাড়ার কারণ জানতে চেয়েছেন, আমরা তাকে বিষয়টি অবগত করেছি।’
এর আগে সকালে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে এক জরুরি সভায় চাল নিয়ে অস্থিরতা বন্ধে ধান ও চালের অবৈধ মজুদ খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এর পর পরই মাঠে নামে প্রশাসন।
অবৈধ মজুদ প্রতিরোধে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এনএসআই, র্যাব ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকেও চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় সভায়।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মজিবুর রহমান বলেন, ‘ঢাকার বাবুবাজার এলাকায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একটি দল অভিযানে যাবে। পাশাপাশি কারওয়ান বাজার ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের চালের পাইকারি ও খুচরা দোকানগুলোতে যাবে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তিনটি টিম। খাদ্য অধিদপ্তরের পাঁচটি টিমও পাশাপাশি কাজ করবে। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও অভিযান চলবে।’
অবৈধ মজুদের উৎস জেনেই অভিযান হবে জানিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মজিবুর রহমান বলেন, ‘বিপণন পর্যায়ে কোন দোকানে কতটুকু মজুদ রাখা যাবে সেটা আইনে বলা আছে। যদি অবৈধ মজুদ পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অতিরিক্ত সচিব জানান, ১৯৫৬ সালের অ্যাসেনশিয়াল কমোডিটি অ্যাক্টে বলা আছে কোন পর্যায়ে কতটুকু মজুদ রাখা যাবে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে এবং ২০২১ সালে দুটি আদেশ জারি করা হয়। সেই আলোকেই অভিযান চলবে।
এদিকে অভিযানের সার্বিক দিক দেখভাল করার জন্য মন্ত্রণালয়ে একটি কনট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। অবৈধ মজুদের বিষয়ে সেখানে তথ্য জানাতে +৮৮০২২২৩৩৮০২১১৩, ০১৭৯০৪৯৯৯৪২ এবং ০১৭১৩০০৩৫০৬ নম্বরে যোগাযোগের অনুরোধ করা হয়েছে।
গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে ধান-চালের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে দেশের কোথাও অবৈধ মজুদ হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
চলতি বোরো মওসুমে ধানের কাক্সিক্ষত ফলন হলেও বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও ধান চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েই চলছে। প্রতিবছর বোরো মৌসুমের ধান বাজারে আসার পর চালের দাম কমতে শুরু করলেও এবার ঘটছে উল্টোটা। নতুন ধান বাজারে আসার পর থেকে চালের দামও বাড়তে শুরু করেছে বলে খুচরা বিক্রেতারা দাবি করছেন। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিল থেকে দাম বাড়ানো হয়েছে।
আর মিল মালিকরা বলছেন, বাজারে নতুন ধান আসলেও দাম চড়া। গত বছরের তুলনায় প্রতিমণ ধানে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুণতে হচ্ছে।
বড় বড় মিল ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ভালো মুনাফার আশায় ধানের মজুদ শুরু করায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার।
ব্যবসায়ীদের ‘মজুদের অসুস্থ প্রতিযোগিতা’ চলছে মন্তব্য করে তিনি বলেছেন, অধিকাংশ মিল মালিক বাজার থেকে ধান কিনলেও উৎপাদনে যাচ্ছে না। প্রয়োজনে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে বিদেশে থেকে চাল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হবে।
উৎস: ঢাকা টাইমস