• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫০ অপরাহ্ন |

এসময়ের ভোটের প্রতিশ্রুতি ও জবাবদিহিতা

মো: আলাউদ্দিন আলী।। সামনে ১২ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নির্বাচন। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন দল, জোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থিরা। সিভিল সোসাইটির নানা সংগঠন জনসচেতনা বা ভোটার সচেতনতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন কর্মকান্ড করছে, স্লোগান প্রস্তুত করে ছড়িয়ে দেওয়া চেষ্টা করছে, একটি সংসদীয় এলাকার সকল প্রতিদ্বন্দ্বীকে এক মঞ্চে উপস্থিত করে তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা, প্রতিশ্রুতি বলার সুযোগ করে দিচ্ছে ও পাশাপাশি অনুষ্ঠানে উপস্থিত অডিয়েন্সকে প্রশ্ন উত্থাপন ও মতামত বলার সুযোগ করে দিচ্ছে। এরকম অনুষ্ঠান এদেশে নতুন নয়, অন্তত: ১৯৯০ সালের পরবর্তী বিভিন্ন জাতীয় নির্বাচনে এরকম অনুষ্ঠান আমরা দেখেছি। আগে যেমন স্লোগান ছিল, আমার ভোট আমি দেব-যাকে খুশী তাকে দেব। তার স্থলে স্লোগান হয়েছে, আমার ভোট আমি দেব-জেনে বুঝে তাকে দেব।

প্রার্থিরা ভোট চাওয়ার সময় কী বলছেন? সকল প্রার্থীর কথা ও প্রতিশ্রুতি প্রায় একই রকম এবং চমৎকার। কীরকম? তারা বলছেন, এলাকার যত সমস্যা যেমন, রাস্তা, ব্রিজ, বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ^বিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, জলবদ্ধতা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, বেকারত্ব, চিকিৎসা, ভাতা, দুর্নীতি বন্ধ ইত্যাদি সকল সমস্যা সমাধান করে দেবেন যদি তাকে নির্বাচিত করেন। এসবসহ বহুবিদও সমস্যা সমাধানের কথা রাতদিন বলে চলেছেন দেশব্যাপী সকল সংসদীয় এলাকায়। প্রশ্ন হচ্ছে- সারা দেশে যখন সব প্রার্থী একই রকম সমাধানে কাজ করতে চাচ্ছেন তা আদৌ কি বাস্তব সম্মত? রাষ্ট্র এত টাকা কোথায় পাবে, কীভাবে খরচ যোগাবে তা কী ভাবার কথা নয়? তার মানে এসব কথা কী সময়োপযোগী বা যৌক্তিক? এসব ভাবার সময় কোথায়। কিন্তু না ভাবলে যা হবার তাই তো হবে, যা হয়ে আসছে। এ যেন একই কাজ বারে বারে করা আর ভিন্ন ভিন্ন ফল আশা করার চক্রের মধ্যে ঘোরার মতই কী নয়?
তাহলে উপায় খোঁজার জন্য অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে একটু চিন্তা করা দরকার। এর আগে যারা নির্বাচিত হয়েছেন তাদের কর্মকান্ডের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। এখন যে চিত্র চারিদিকে দেখা যাচ্ছে একই চিত্র আগেও ছিল, তার চেয়ে মাত্রাগত কিছু হেরফের থাকতে পারে। ফলে এটা ধারনা করা সমীচিন নয় যে পরবর্তী চিত্রগুলো পূর্বের ন্যায় কাছাকাছিই হবে। নির্বাচন শেষ। নির্বাচিত জনের আলোচনায় আসা যাক। জয়ের পর স্বস্তিতে কিছুটা বিশ্রামের পরই বেশ ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। তখনকার ব্যস্ততার প্রথম বিষয়টি থাকে কৃতজ্ঞতা জানানো ও নানা পর্যায়ে দেখা সাক্ষাত করা। এসময় লক্ষনীয় বিষয়ের মধ্যে আছে কে কত বেশি পরিশ্রম করে তাকে জয়ী করেছে তা জানানোর একটা প্রতিযোগিতা চলে তার চার পাশে। এ প্রতিযোগিতায় সবাই জয়ী হতে পারবেন না। যারা হারবেন তারা খুব দ্রুতই ভাবতে থাকবেন এত অকৃতজ্ঞ। কিন্ত দ্রুতই তারা মুখ খুলবেন না। এটার সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকবে। দেখা যাবে কখন কী চাচ্ছেন তা বোঝার মত দক্ষ মানুষ আছে, তারা সবকিছু সরবরাহে ব্যস্ত। কোথায় যাবেন, কোথায় দাওয়াত খাবেন, কাদের সাথে কী ধরনের ব্যবহার করবেন তাও ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতার বহু বিষয় আচমকা নেতার নাগালে এসে গেল। সরকারী প্রশাসন অনেক কদর করছে, যা তার জন্য গাইড হিসেবে কাজ করছে। নেতার সামনে এমন কিছু পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যে, তিনি ইচ্ছা করলেই অনেককিছু হয়ে যাচ্ছে। তখন তো এটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, পুরো নির্বাচনে কেমন খরচ করা হয়েছে তার একটা হিসাব থাকা দরকার, আছেও নিশ্চয়। অনেক ক্ষেত্রে ধার-দেনাও হয়ে গেছে তাও তো পরিশোধ করা দরকার। যদিও কোন প্রাপকই পরিশোধের ব্যাপারে কোন কথায় বলছেন না। সে কথা সোজন্যবশত: নেতা তুললেও পাওনাদার বরং উল্টো বলছেন এসব নিয়ে এখন ভাবার দরকার নেই, সময় আছে না ভাবার। এত ভাল কথার পর নেতার গুড বুকে তার নামটি তালিকাভুক্ত হয়ে গেল দ্রুতই। নেতার কাছে পৌঁছানোর লড়ায়ে তারা বেশি সফল হবেন যারা ব্যবসায়ী, নানা ধরনের লাইসেন্সধারী, নীরব ক্ষমতাধর টাকাওয়ালা, যারা দেশবিদেশের অনেক তথ্য জানেন এবং ক্ষমতার সাথে থাকার অভিজ্ঞতা আছে। দ্রুতই নেতার কাছ থেকে ছিটকে যাবেন তারা যাদের আর্থিক সামর্থ্য কম, তেমন কোন ব্যবসায়িক লাইসেন্সও নেই যা সুপারিশ করে নেতা তার কোন আর্থিক সুবিধা দিতে পারেন। তাই সরাসরি নগদ কিছু পাওয়া সেজন্য তাদের ভরসা অন্যের কাজ সফল করার জন্য সুপারিশ করে কিছু আয় করা। তাতে দ্রুতই নেতা যেমন বদনামের ভাগী হবেন তেমনি তারা নেতার অনাস্থাভাজন হয়ে উঠবেন। এগুলো আগে চলেছে যখন সবার কাছে ফোন ছিল না, ফেসবুক ছিল না। দিন যত যাবে ততই পুরানো পদ্ধতি অচল। নেতার চারিপাশে নিরাপত্তাজনিত কারণসহ এক শ্রেণীর মানুষ বলয় তৈরী করে ফেলবেন। এই বলয় ভেঙ্গে সাধারণ আর কাছে আসতে পারে না। এই বলয় সৃষ্টিকারীদের দ্বারা নেতার আর্থিক সাফল্য আসলেও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়তে থাকবে, সেটা সাদা চোখে সাথে সাথেই বোঝা যাবে না। বুঝতে বুঝতে বহুকিছু ঘটে যাবে। শুধুই থাকবে প্রচন্ড ব্যস্ততা। নেতার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যস্ততা এমন বাড়বে যে সব সমস্যার কথা তার মনে থাকলেও তেমন কিছু করার থাকবে না। তার ব্যস্ততার ক্ষেত্রের ব্যপ্তি ঘটেছে ব্যাপকভাবে। দেশ ছাপিয়ে বিদেশ পর্যন্ত। ব্যস্ততার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে দেশের সকল প্রশাসনিক কেন্দ্রের যাদুর শহর ঢাকায়। সারা দেশের এমপি কোথায় কি করছেন, কোন মন্ত্রীর সাথে কার কীরকম সম্পর্ক, প্রশাসনের কোন কর্মকর্তা কার কথা বেশি শোনেন, কীভাবে এসব অর্জন করা যায় এরকম কতকিছু ভাবতে এবং কাজ করতে একরকম পাগল হয়ে যাবেন। সবসময় মনে হবে এটা করতে না পারলে ছোট হয়ে যাবো, ওটা করতে না পারলে ভবিষ্যত নষ্ট, বিদেশ যাওয়াসহ কত ধরনের প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। এর মধ্যে নিজের এলাকা ভ্রমন যেমন কমে যাবে তেমনি অনেককিছু ভুলতেও বাধ্য হবেন। এলাকার খোঁজ-খবর নেওয়ার বিষয়টি অন্যের মাধ্যমে নির্ভর হতে হবে। কিছু ঘনিষ্ঠ মানুষ অবশ্য সেটাই চায়। উপায় নাই। প্রশ্ন হচ্ছে- তাহলে উপায় কী।
অনেক বুদ্ধিজীবি বলে যাচ্ছেন দেশ জবাবদিহিমূলক না হলে গণতন্ত্র বিনির্মান হবে না। সেজন্য প্রথম দরকার রাজনৈতিক দলের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা। তাহলে দুর্নীতি রোধ করা, কমপক্ষে কমানো যাবে। এরকম প্রশ্নের উত্তরে রাজনৈতিক দলের নেতারা অবশ্য বলেন, তাদের দলে এক ধরনের গণতান্ত্রিক চর্চা অবশ্যই আছে। একথাও পুরানো হয়ে গেছে। বোঝা যাচ্ছে তাতে কাজ হচ্ছে না। এখন প্রতিশ্রুতি ও জবাবদিহিতার মৌসুম চলছে। এখন যেকোন আলোচনাতেই সকল প্রার্থীই সম্মতি জানাচ্ছেন, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। প্রতিশ্রুতির কীহাল তা শুরুতেই আলোচনা এসেছে। তাই বলিকি এত কথার দরকার কী। প্রার্থী একটি প্রতিশ্রুতি দিলেই তো মিটে যায়। তিনি কোন বিষয়ে কোন প্রকার অন্যায়, অন্যায্য কাজ করবেন না, অবৈধ কোন প্রকার সুযোগ সুবিধা নেবেন না। ব্যক্তিগতভাবে সকল ক্ষেত্রে তিনি সৎ থাকবেন। অভিযোগ এবং পরামর্শ বক্স রাখবেন তার অবস্থান স্থলে (সংসদীয় এলাকার মধ্যেই)। নিয়মিত সে বক্স খুলে লিপিবদ্ধ করবেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর পর খোলা মাঠে জনসম্মুখে যেকোন অভিযোগ, পরামর্শ বিষয়ে মতামত জানাবেন। এ পদ্ধতি মানতে যেয়ে তার যদি কোন সমস্যা হয় সেটাও জনগণের সামনে বলবেন। সে সমস্যা সমাধানে জনমত কী সমাধান দেয় সেটা দেখাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সবাই জানেন এক জন সংসদ সদস্য আইন অনুযায়ী যে মর্যাদা ভোগ করেন তার সমকক্ষ মর্যাদার কোন সরকারী কর্মকর্তা শুধু জেলা নয় বিভাগীয় পর্যায়েও নেই। অথচ সে মর্যাদা রক্ষার জন্য সংসদ সদস্যদের কোন চেষ্টা, চিন্তা নেই বললেই চলে। কেন থাকবে, তারা যখন সরকারী নিয়োগ বানিজ্য, উন্নয়ন বানিজ্যসহ নানা আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করার জন্য মুখিয়ে থাকেন সেখানে তার সম্মান মর্যাদা যেমন থাকে না তেমনি জনগণের থাকার প্রশ্নই উঠে না। ব্যক্তি পরিবর্তনের বিষয়টিকে উপেক্ষা করে দল, সমাজ, সরকার, রাষ্ট্র কোন কোন ক্ষেত্রেই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন সৎ, সাহসী সেই প্রার্থী। তিনি প্রতিশ্রুতি দেবেন এবং মেনে চলবেন। তার কোন পরাজয় হতে পারে না। হ্যাঁ, এখান থেকেই শুরু হতে পারে কাঙ্খিত স্বপ্ন পূরণের যাত্রা।
লেখক: উন্নয়ন কর্মী, নীলফামারী


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

আর্কাইভ