সিসি ডেস্ক: ১৯৭১ সালের উত্তাল সময়ে তিনি সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্র। দেশমাতৃকার টানে তার বয়েসী অনেকেই ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তির যুদ্ধে। তার দাবি, তিনিও ছিলেন মুক্তির সে মিছিলে। সেই তিনিই এখন সিলেটে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিভাবক। তাকে এ পথটা তৈরি করে দিয়েছিল এক-এগারোর অস্থির সময়। গঠনতন্ত্র বহির্ভূত পদ সৃষ্টি করে তাকে বসানো হয় অভিভাবক হিসেবে। সেই থেকে তার দাপুটে পদচারণা। দুর্নীতির অভিযোগও জমতে থাকে তখন থেকেই। যেগুলোর তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুর্নীতির অভিযোগে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সিলেট জেলা ইউনিটের কমান্ডার সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে দুদক। গতকাল এ মামলায় আত্মসমর্পণ করতে গিয়েছিলেন আদালতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ না করে দেয়াল টপকে পালিয়ে যান তিনি। সূত্র জানায়, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ৩ কোটি ৫২ লাখ ৮০ হাজার টাকা, মুক্তিযোদ্ধা প্রকল্পের ১৪ লাখ টাকা, মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ দেয়া ১৩টি কম্পিউটার, কয়েদির মাঠে গরুর হাটের খাজনা বাবদ প্রাপ্ত টাকা আত্মসাতের অভিযোগসহ দুর্নীতির পাহাড় প্রমাণ অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। তবে সব ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে তার ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয় নিয়ে ওঠা প্রশ্নটাই। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সিলেট মহানগর ইউনিটের কমান্ডার ভবতোষ রায় বর্মণ জানান, সুব্রত চক্রবর্তী যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন বলে দাবি করেছেন তারা অনেক আগেই সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। এদের একজন হচ্ছেন মিরাবাজারের বাসিন্দা পুরেঞ্জয় চক্রবর্তী বাবলা, যিনি যুদ্ধকালীন সময়ে ৫ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন। তার সঙ্গে কথা হয় মানবজমিনের। তিনি বলেন, যুদ্ধকালীন সময়ে সুব্রত চক্রবর্তীর সঙ্গে আমার কোথাও দেখাই হয়নি। তিনি কোথায় যুদ্ধ করেছেন, কোথায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। ৫ নম্বর সেক্টরে থেকে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে দাপিয়ে বেড়ানো আবদুল হান্নানও বলছেন বিবৃতি দিয়ে তারা এ বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। তিনি জানান, সুব্রত চক্রবর্তী তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেননি। তিনি এও তথ্য দেন, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের কেউই বলবেন না সুব্রত চক্রবর্তী মুক্তিযুদ্ধ করেছেন বা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ৪ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন মুক্তেশ্বর পাল। তিনিও অস্বীকার করছেন সুব্রত চক্রবর্তীর সঙ্গে যুদ্ধ করার কথা। মানবজমিনকে জানান, যুদ্ধকালীন সময়ে সুব্রত চক্রবর্তীকে কোথাও দেখেননি তিনি।দুদকের অনুসন্ধানেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি। গত ১৬ই জুলাই সংস্থার পরিচালক বরাবরে জমা দেয়া দুদকের এক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দুদক সিলেট সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রাম মোহন নাথ সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার’ হিসেবে চিহ্নিত করে উল্লেখ করেন, ‘সংগৃহীত রেকর্ডপত্র যথা বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা, শনিবার, জুন ০৪, ২০০৫ প্রকাশিত গেজেট-এর কপি যাতে সিলেট বিভাগের সব মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা রয়েছে। লালমুক্তিবার্তার খণ্ড নং-৮৯ ও ১০০, যাতে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা রয়েছে। উল্লিখিত রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, তাতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অভিযুক্ত জনাব সুব্রত চক্রবর্তী (জুয়েল) এর নাম নেই।’
তবে কীভাবে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে উঠলেন সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল? এমন প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারাই। ২০০৮ সালের ৭ই নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে সিলেট জেলা ইউনিটের তৎকালীন আহ্বায়ক মাহমুদ হোসেন লিখিত বক্তব্যে সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন। সে বক্তব্যে সুনামগঞ্জের বাসিন্দা সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠার বর্ণনা দেয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, টাকা আত্মসাতের দায়ে সোনালী ব্যাংক জালালাবাদ সেনানিবাস শাখার ম্যানেজার পদ থেকে চাকরিটি চলে যাওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের পার্বত্য চট্টগ্রাম জুস প্লান্টে ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল।’ মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, তখনই মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার শখ জাগে সুব্রত চক্রবর্তীর। পরবতীকালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের সুদিন ফিরে আসে তখন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয়ের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন সুব্রত চক্রবর্তী। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনো গেজেটে নাম না থাকলেও তৎকালীন কমান্ডকে ‘ম্যানেজ’ করে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন তিনি। পরে ২০১৩ সালে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার নাম গেজেটে উঠে। অবশ্য তার আগেই ২০০৯ সালে হাতে এসে গিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধার সনদ।
সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের কপাল খুলে এক-এগারোর পট পরিবর্তনের সময়। তখনই তিনি পেয়ে যান সিলেট বিভাগীয় কমান্ডারের পদ। মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদে এ ধরনের কোনো পদই নেই। পদ না থাকলেও ‘বিশেষ বিবেচনা’য় সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের জন্য তৈরি হয় ‘বিভাগীয় কমান্ডার’ এর পদ। তার জন্য খুলে যায় তার ভাগ্যের দুয়ারও। দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদন বলছে, বিপুল অঙ্কের টাকা আয় হলেও পুরোটাই পকেটে ঢুকে সুব্রত চক্রবর্তীর। এক-এগারোর সময় দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের বিতরণের জন্য সিলেট সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ১ হাজার ৭০০টি রিকশার নম্বর প্লেট বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে ৫শ’ জন মুক্তিযোদ্ধাকে দুটি করে নাম্বার প্লেট বিতরণ করা হয়। বাকি ৭ শ’টি (রেজিস্ট্রেশন নং : ২১৪৭০ থেকে ২২১৬৯) থেকে যায় সুব্রত চক্রবর্তীর নিজের নামে। সিটি করপোরেশনেরর ভলিউমে এখনও নাম্বার প্লেটগুলো সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের নামেই তোলা আছে।
নানা বরাদ্দ, নানা সুযোগ-সুবিধা কিছুই ভাগে জুটেনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের। তারপরও সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল ঠিকই আছেন সিলেট জেলা ইউনিটের কমান্ডারের পদটিতে। মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেরই অভিযোগ খুঁটির জোর শক্ত থাকার কারণেই এ অবস্থানে সুব্রত চক্রবর্তী । খুঁটির জোর তার কতটা শক্ত তা টের পাওয়া যায় চৌহাট্টায় অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সটির উদ্বোধনের সময়। মহানগর ইউনিট কমান্ড কমপ্লেক্সটির দখল বুঝে পাওয়ায় খেপে যান সিলেট জেলা ইউনিটের কমান্ডার সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল। মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সটির উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ১৩ই আগস্ট অনুষ্ঠানের দিন সুব্রত চক্রবর্তী কালো পতাকা প্রদর্শন করেন। এতেও তার তৃপ্তি হয়নি। আরো বড় আকারে শোধ তুলেন তিনি। সিলেট জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডের উদ্যোগে তার সম্পাদনায় ২০শে আগস্ট কোনো উপলক্ষ ছাড়াই প্রকাশিত হয় রণাঙ্গন-৭১ নামে একটি স্মারক। সে স্মারকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বাবা সিলেটের বিশিষ্ট গুণীজন অ্যাডভোকেট আবদুল হাফিজকে চিহ্নিত করা হয় স্বাধীনতাবিরোধী শান্তি কমিটির সিলেট জেলা সদস্য হিসেবে। সিলেট আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অনেকের উপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের হাত দিয়ে তিনি সে স্মারকের মোড়ক উন্মোচন করান। যেন বার্তা দিলেন সামনে যে-ই আসুক কাউকেই পরোয়া নেই তার।
কথা হয় সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সবই মিথ্য-বানোয়াট। আমিতো হিন্দু সব আত্মসাৎ করে ইন্ডিয়া পাচার করে দিয়েছি এমন কথাওতো বলা হচ্ছে। দুদক আমার বিরুদ্ধে আনা কোনো অভিযোগ সুনির্দিষ্ট করেনি। মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স উদ্বোধনের সময় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে কালো পতাকা প্রদর্শন সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা শোক দিবসের র্যালি করছিলাম, তবে মুহিত সাহেব মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে ডিভিশন তৈরি করেছেন। রণাঙ্গন-৭১ নামক স্মারকে আবুল মাল আবদুল মুহিতের বাবা অ্যাডভোকেট আবদুল হাফিজকে স্বাধীনতাবিরোধী শান্তি কমিটির সিলেট জেলা সদস্য হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়ে সুব্রত চক্রবর্তী বলেন, হ্যা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও এমপি মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর বাবার নাম স্বাধীনতাবিরোধী শান্তি কমিটির তালিকায় এসেছে। আমি চাইলেইতো ইতিহাস বদলাতে পারি না।