• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫২ অপরাহ্ন |

পাকিস্তানের সঙ্গে মোদীর পানি রাজনীতি: নেপথ্যে কী?

11।। রাশেদ শাওন ।। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে Hydropolitics কথাটা নতুন। প্রথম ১৯৭৯ সালে আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী John Waterbury তার Hydropolitics of the Nile Valley বইতে শব্দটা ব্যবহার করেন। পানি নিয়ে রাজনীতি। ছোটবেলা থেকে (যখন থেকে পত্র-পত্রিকা পড়ি) শুনে আসছি, পৃথিবীতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাকি হতে পারে পানি নিয়ে। কথাটার গুরুত্ব তখন না বুঝলেও সম্প্রতি পাকিস্তান ও ভারতের ‘পানি রাজনীতি’ দেখে মনে হচ্ছে, পানি নিয়ে বড় একটা যুদ্ধ হলেও হতে পারে। তাছাড়া বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে যেভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের বাতাস বইছে তাতে পানির বিষয়টা আরো বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে।

কাশ্মীরের উরিতে হামলার পর পাকিস্তানকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছে ভারত। প্রতিবেশী এই শায়েস্তা করার নানা কথাই বলেছে মোদী সরকার। প্রথম কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার কথা বললেও পরে নরেন্দ্র মোদী বলেছেন পানিতে মারার কথা। মঙ্গলবার মোদী ঘোষণা দেন, Blood and water cannot flow simultaneously। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সিন্ধু পানি চুক্তি পুনর্বিবেচনার হুমকি দিয়েছেন তিনি। এদিকে পাকিস্তানও থেমে নেই। প্রতিক্রিয়ায় পাক প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সার্তাজ আজিজ বলেছেন, Revocation of Indus Waters Treaty can be taken as an act of war। সব মিলিয়ে পানি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের যুদ্ধাবস্থা।

পাকিস্তানে পানির প্রধান ভরসা সিন্ধু নদ। এই নদ চীন থেকে ভারত হয়ে এসেছে পাকিস্তানের মধ্যে। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান ও ভারত সিন্ধুর পানি বণ্টন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ‘সিন্ধু পানি চুক্তি’ করে। আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে সবচেয়ে সফল পানি চুক্তি বলা হয় এটাকে। হঠাৎ করেই কেন অন্য পথ বাদ দিয়ে এই চুক্তি পুনর্বিবেচনার কথা ভাবছেন মোদী?

গত ১৮ সেপ্টেম্বর উরিতে হামলার ৫ দিন আগে ১৩ সেপ্টেম্বর এই পানি নিয়ে ভারতে হয়েছে লঙ্কাকাণ্ড। ভারতের কর্নাটকের কাবেরি নদীর কিছু পানি তামিলনাড়ু রাজ্যকে ছেড়ে দিতে কর্নাটক রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেয় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। এতে শুরু হয়ে যায় দাঙ্গা। তামিলদের পানি দিতে রাজি নয় কর্নাটকের মানুষ। কারণ এখানেও আছে পানি সঙ্কট। সহিংসতায় নিহত হয় ২ জন। জ্বালিয়ে দেয়া হয় অসংখ্য গাড়ি, বন্ধ হয়ে আছে স্কুল-কলেজ। বড় ক্ষতিটা হয়েছে ভারতের প্রযুক্তি শিল্পের। বন্ধ হয়ে আছে বেঙ্গালুরের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো।

কর্নাটক রাজ্যের এই বেঙ্গালুর শহরকে বলা হয় ভারতের ‘সিলিকন ভ্যালি’। ভারতের প্রযুক্তি শিল্প উদীয়মান। নরেন্দ্র মোদীও গর্ব করে বলেছেন, India Exports Software, Pakistan Exports Terror। আবার ভারতে পানি সঙ্কটও চরম। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে হাজারো মানুষ মারা যায় পানির অভাবে। তার মধ্যে অন্যমত খারাপ অবস্থা কর্নাটকের। বারবার এখানে পানি নিয়ে সহিংসতা হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশটির উদীয়মান প্রযুক্তি। আর তাই সিন্ধুর পানি পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে মোদী সরকার।

চুক্তি অনুসারে, সিন্ধু নদের পানির ২০ শতাংশ পায় ভারত। কাশ্মীর ইস্যুতে পানি রাজনীতি কাজে লাগানো গেলে পানি সঙ্কটের অনেকটাই সমাধান করা যাবে। তবে পাক-ভারত বৈরিতা নতুন করে কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় সেটাই দেখার বিষয়। কারণ পানি নিয়ে আরো অনেক দেশের মধ্যেই সঙ্কট লেগে আছে। নীল নদের পানি নিয়ে মিশর, ইথিওপিয়া, সুদান; টাইগ্রিস নদীর পানি নিয়ে তুরস্ক, ইরাক; আর জর্দানের নদীগুলোর পানি নিয়ে ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের সঙ্কট চলে আসছে।

যাই হোক, ভারত এমনি এমনি পানি নিয়ে রাজনীতি শুরু করে নাই। একদিকে সে চাইছে সিন্ধুর পানি দিয়ে নিজের চাহিদা মেটাতে; সিন্ধুর শীতল জলে দেশের অভ্যন্তরীণ আগুন নেভাতে। অপরদিকে পাক-বিরোধী ভারতীয় জনগণকে বোঝাতে চাইছে, ‘আমরা পাকিস্তানকে বিশাল শিক্ষা দিয়ে ছেড়েছি।’ কারণ কয়েক বছর পরই আবার ভোটের হিসেব-নিকেশ আছে। সব মিলিয়ে এক ঢিলে দুই পাখি মারার পরিকল্পনা মোদীর।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ