নওশাদ , সিসি নিউজ: নীলফামারীর সৈয়দপুরের মুক্তি আকা মাহি জেলা পর্যায়ে পেয়েছেন জয়িতা এওয়ার্ড। বেগম রোকেয়া দিবসে নীলফামারীতে জেলা পর্যায়ে পাঁচ সফল নারীকে সম্মাননা দিয়েছে মহিলা বিষয়ক অধিদফতর। সেরা পাঁচ নারীর মধ্যে সৈয়দপুরের মুক্তি আকা খাতুন মাহি অর্থনীতিতে সফলতার দরুন পেয়েছেন প্রথম এ সম্মাননা। শনিবার (৯ নভেম্বর) দুপুরে নীলফামারীর শিল্পকলা অডিটোরিয়ামে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর ও জেলা প্রশাসক খালিদ রহিম এসময় মাহির হাতে সফলতা স্বরুপ ওই সম্মাননা সদনপত্র ও ক্রেস্ট তুলে দেন।
সৈয়দপুরের মুক্তি আকা খাতুন মাহি ছাড়া আরো যারা সম্মাননা পেয়েছেন তারা হলেন শিক্ষা ও চাকরিতে জেসমিন আক্তার, সফল জননীতে জাহানারা বেগম, নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করায় ফাতেমা খাতুন এবং সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখায় সেরা জয়িতা হিসেবে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
সৈয়দপুরের সফল একজন নারী মুক্তি আকা খাতুন। যিনি জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে করেছেন কঠিন সংগ্রাম। হাটি হাটি পা পা করে এগিয়ে যাওয়া মাহির জীবন শুরুতে মোটেই সুখর ছিল না। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের হাল ও ভাইবোনসহ নিজের লেখাপড়ার জন্য প্রথমে মাহি সামান্য বেতনে চাকরী করেছেন ট্রাভেল এজেন্টে। সেই হাটি হাটি পা পা করে মাহি আজ সৈয়দপুরে গাউসিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক। সৈয়দপুরে শহরে মাহিকে সবাই জয়িতা বলে চেনে।
শহরের পুরাতন বাবুপাড়ার বসবাস জয়িতার। বাবা শাহনেওয়াজ ব্যবসা করে সংসার ও ভাইবোন সকলের লেখাপড়া চালাতেন। সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও সুখের অভাব ছিলনা। ২০১২ সালে হঠৎ মাহির পিতা না ফেরার দেশে চলে যান। তখন মাহি উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী। কি করবে মাহি তখন কিছু বুঝে উঠতে পারছিল না। কিন্তু হারবার মেয়ে ছিল না মাহি। তাই পরিবারের ভরণপোষন এবং ৯ ভাই-বোনের লেখাপড়ার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে প্রথমে চাকরী খুঁজতে থাকেন মাহি। চাকরী জোটে টিকিট বিক্রির প্রতিষ্ঠান গালিব ইন্টারন্যাশনালে। সেখানে একজন টিকিট বিক্রেতা হিসাবে মাত্র ৬ হাজার টাকা বেতনে টানা ৪ বছর কাজ করেন মাহি। পাশাপাশি নিজের ও ভাইবোনদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে থাকেন সেই স্বল্প খরচে।
ব্যবসাটি ভালোভাবে শিখে নেওয়ার পর নিজের পাঁয়ে দাঁড়ানোর সংগ্রাম শুরু মাহির। অবশেষে ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর ধার দেনা করে গাউসিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস নামে একটি ট্রাভেল এজেন্সী খোলেন তিনি। শহরের কেন্দ্রস্থলে নিউ ক্লোথ মার্কেট সংলগ্ন মদিনা মোড়ে ৩ হাজার টাকায় দোকান ভাড়া নিয়ে দিব্যি ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকেন মাহি। উপার্জন অর্থ দিয়ে ভাইবোনদের লেখাপড়া করানোর পাশাপাশি নিজেও পড়েছ্নে সৈয়দপুর কলেজে। আচার-আচরণ ও টিকিট হোম ডেলিভারী দেওয়ার কারণে মাহির ব্যবসা ইতোমধ্যে সুনাম অর্জন করেছে সৈয়দপুরসহ আশপাশের শহরের বিমানের যাত্রীদের কাছে। ফলে দোকানে দুইজন কর্মচারিও রেখেছেন তিনি। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করছে ছোট ভাই মাহতাব। বর্তমানে মাহির মাসিক আয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা । এভাবে আর পেছনে তাঁকাতে হচ্ছে না মাহিকে। একে একে সফলতা যেনো নিজেই ধরা দিচ্ছে মাহির কাছে। বিভিন্ন ইলেক্ট্রোনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় মাহির সংগ্রাম নিয়ে স্বচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ পায় কয়েকবার। ফলে সফলতার স্বরুপ জয় করেছেন কয়েকটি এওয়ার্ড। আর সেই সফলতার সম্মাননা স্বরুপ মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে একজন সফল অর্থনৈতিক উদ্যোক্তা হিসাবে পেলেন জয়িতা এওয়ার্ড। নীলফামারী জেলায় এওয়ার্ড পাওয়ার আগে ওই দিনেই সৈয়দপুর উপজেলায় দেওয়া হয় মাহিকে সম্মাননা। কয়েক মাস আগে বিয়ে করে মুক্তি আকা থেকে হয়েছেন মুক্তি আকা খাতুন। জিরো থেকে হিরোইন হওয়া মাহি এখন অনুকরণীয় একটি নাম জীবনযুদ্ধে নামা প্রত্যেক নারীর কাছে।