জয়পুরহাট, ২ এপ্রিল:থই থই পা নিতে বাদাম তুলে চলছে নৌকা। কোথাও বা জাল দিয়ে মাছ ধরছেন জেলেরা। তীরে কলসি কাঁখে কুলবধূ। আবার হয়তো নদীর দুই পার সংযোগকারী সেতুর নিচে বয়ে যায় কুলকুল জলধারা। এই তো নদীর চিড়ন্তন রূপ।
কিন্তু তা না হয়ে যখন জলহীন নদীর বুক দখল করে চাষ হয় ফসল, তখন তাকে কি নদী বলা যায় ? ছোট যমুনা, তুলশী গঙ্গা, শ্রী নদী ও হারাবতী এই ৪ নদী এখন কেবলই জয়পুরহাটের নাম সর্বস্ব নদী।
সরেজমিনে জানা গেছে, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পলি জমে নদীগুলোর বুক ভরাট হয়েছে অনেক আগেই। এখন নদী তীরবর্তী প্রভাবশালীরা দখলে নিয়ে সেখানে যে যার মত গড়ে তুলেছেন ফসলের মাঠ। নদী বক্ষে চাষাবাদ হচ্ছে ধান, মিষ্টি আলুসহ নানা ফসল। অন্য দিকে গরু-ছাগল চড়াচ্ছেন রাখালরা, আর খেলার মাঠ বানিয়ে তাতে নানা খেলায় মেতে উঠছে শিশু-কিশোরের দল।
এই মরা নদীগুলোইই আবার দুঃখের কারণ হচ্ছে বর্ষায়। উজান থেকে নেমে আসা বর্ষার পানি নামতে পারে না ভাটিতে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে নদীর পানি দুই কূল ছাপিয়ে জনপদে ঢুকে সৃষ্টি করছে জলাবদ্ধতার। প্রতি বছর অস্বাভাবিক বন্যায় ক্ষতি হচ্ছে ফসলের। পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করে হাজার হাজার মানুষ।
নাম প্রকাশে অনেচ্ছুক জেলা ত্রাণ ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা, বর্ষাকালের বন্যায় ফসল, কাঁচা-পাকা বাড়িঘর, রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে প্রতি বছর প্রায় ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। সেই হিসাবে গত ১২ বছরে ক্ষতির পরিমান দারিয়েছে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার মত।
অথচ নদীগুলো সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই সরকারের। প্রতি বছর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে নদী খননের প্রস্তাব পাঠালেও কোনো পদক্ষেপ নেই সরকারের। নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ সৃষ্টি করতে না পারলে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে এ এলাকায় মরু পরিবেশ সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় পানি বিশেষজ্ঞরা।
নদীতীর এলাকার জয়পুরহাট পৌর মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক, পাঁচবিবি উপজেলার ধরঞ্জি ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা, ক্ষেতলাল উপজেলার তলশিগঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান হাইকুল ইসলাম লেবুসহ স্থানীয়রা জানান, ভারতীয় সীমানার অভ্যন্তরে সৃষ্টি হয়ে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে জয়পুরহাট জেলায় প্রবেশ করেছে নদীগুলো। এক সময় সারা বছর পানিতে ভরা থাকত নদীগুলো। নৌকা চলত, মাঝির গলায় গান উঠত। সড়ক পথের চেয়ে নদীপথ ব্যবহৃত হতো বেশি। পার্শ্ববর্তী জেলার সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল এই নদীগুলো।
তারা আরো বলেন, বর্ষায় যে পানি আসে তা মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়। উজান থেকে নেমে আসা পানি ধারণ করতে পারায় ভরাট হওয়া নদীগুলোর দু’কূল ছাপিয়ে সৃষ্টি হয় বন্যা আর জলাবদ্ধতা। আবার শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলো শুকে বেশীর ভাগ স্থানে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হয়, আবার কোথাও ঘাঁসে ভরে গিয়ে দৃশ্যপট হয়ে পরে সবুজ শ্যামল মাঠে।
১৯৮২ সালে তৎকালীন সরকারের আমলে তুলসীগঙ্গা নদী খনন কাজ শুরু হলেও পরে অজ্ঞাত কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। বাকি তিনটি নদী জন্মের পর কোনোদিনই খনন করা হয়নি বলেও জানান তারা।
জয়পুরহাট পানি উন্নয়ন বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী আপেল মাহমুদ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, ওই চারটি নদী খননের জন্য ১৩৪ কোটি ৪১ লাখ টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পক্রিয়াধীন রয়েছে। একনেকে পাস হলে নদীগুলোকে আগের মত ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনেচ্ছুক পানি উন্নয়ন বিভাগে কর্মরত পানি বিশেষজ্ঞরা জানান, নদীগুলো খনন করে পানি প্রবাহ সৃষ্টি করা না গেলে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে এ অঞ্চলে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি জয়পুরহাট জেলার ওই ৪টি নদীসহ স্থায়ী মরুভূমিতে পরিণত হবে জয়পুরহাটসহ বিস্তীর্ণ এলাকা।