ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি ।। দিনাজপুরের পার্বতিপুর মধ্যপাড়া খনিতে পাথর উৎপাদন ও খনি উন্নয়নের পাশাপাশি খনি এলাকাবাসীদের জন্য সামাজিক কল্যানে কাজ করে যাচ্ছে খনির ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জার্মানীয়া-ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)।
খনির সম্মুখে সমাজ কল্যান সংস্থা জিটিসি চ্যারিটি হোম প্রতিষ্ঠা করে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সেই সাথে প্রতি মাসে খনি শ্রমিকদের উচ্চ শিক্ষায় অধ্যায়নরত সন্তানদের মাসিক শিক্ষাউপবৃত্তি এবং ওই এলাকার নন এমপিভুক্ত মধ্যপাড়া মহাবিদ্যালয়কে মাসিক আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ এলাকার মসজিদ,মাদ্রাসা ও এতিমখানাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে আর্থিক ভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে আসছেন জিটিসি।
পার্বতীপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০কিলোমিটার দুরে প্রত্যন্ত একটি গ্রাম মধ্যপাড়া। সেই গ্রামটি আজ নিজ পরিচয়ে দেশ বিদেশে পরিচিত। কেননা সেখানে রয়েছে দেশের একমাত্র এবং বৃহৎ উৎপাদনশীল মধ্যপাড়া কঠিনশিলা খনি। বাংলাদেশের খনিজ সম্পদে সম্বৃদ্ধ পার্বতীপুর উপজেলার একটি সুনামধন্য এলাকা এই হরিরামপুর ইউনিয়নের মধ্যপাড়া।
৩ হাজার ৮৮৮ বর্গ কিলোমটিার আয়তনের এই ইউনিয়নে রয়েছে ১৪ টি গ্রাম। প্রত্যন্ত এই জনপদে কঠিন শিলা খনির কারনে আজ এখানকার অর্থনীতি অন্য গ্রমীন জনপদ থেকে অনেকটাই উন্নত।
মধ্যপাড়ার উন্নত শিলার উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতে ২০১৩ সালে খনিটির দায়িত্ব তুলে দেন দেশীয় একমাত্র মাইনিং কোম্পানী জার্মানীয়া কর্পোরেশন লিমিটেড ও বেলারুশ কোম্পানী ট্রেস্ট এসএসএর যৌথ প্রতিষ্ঠান জার্মানীয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি’র) হাতে।
সরকারের এই প্রতিষ্টানটিকে লাভের দিকে নিয়ে যেতে দায়িত্ব গ্রহনের শুরু থেকেই জিটিসি খনির উৎপাদন এবং উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে খনির উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী তিন শিফট চালু করে এই খনির পাথর উৎপাদন ইতিহাসে রেকর্ড গড়ে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিটিসি খনির পাথর উৎপাদন ও উন্নয়ন এর পাশাপাশি খনির সন্মুখে চ্যারিটি হোম স্থাপন করে বিভিন্ন সামাজিক কল্যান মূলক কর্মকান্ড এবং বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ সেবা দিয়ে এলাকাবাসীদের পাশে দাড়িয়ে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন।
এলাকার মানুষ বলছেন ইতি পূর্বে এই খনি এলাকাবাসীর জন্য এমন সামাজিক কর্মকান্ড নিয়ে এবং বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে কেউ তাদের পাশে দাড়ায়নি। জিটিসি’র এই সেবামূলক কর্মকান্ড একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোর জন্য এক দৃষ্টান্ত হতে পারে।
খনি কার্যক্রমের পাশাপাশি খনির এলাকাবাসীদের জন্য সামাজিককার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে খনি সন্মুখে সমাজকল্যান সংস্থা “ জিটিসি চ্যারিটি হোম” স্থাপন করা হয়েছে। চ্যারিটি হোমে একজন অভিজ্ঞ এমবিবিএস ডাক্তার দ্বারা প্রতিদিন খনি এলাকার ৪০/৫০ জন রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ সেবা প্রদান করা হচ্ছে। সেই সাথে প্রতি মাসে খনি শ্রমিকদের উচ্চ শিক্ষায় অধ্যায়নরত সন্তানদের মাসিক শিক্ষাউপবৃত্তি, নন এমপিভুক্ত মধ্যপাড়ামহাবিদ্যালয়কে মাসিক আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং এলাকার মসজিদ,মাদ্রাসা ও এতিমখানাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে আর্থিক ভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে আসছে জিটিসি।
কথা হয় খনি থেকে ১০ কিলোমিটার দুর পাচঁপুকুর গ্রাম থেকে ডাক্তার দেখাতে আসা ৭০ বছর বয়সী বিধবা বৃদ্ধা মোছাঃ সফিরন বেওয়ার সাথে। তিনি বলেন,মুইঅনেকদিন থেকে অসুখে ভুগছো, সরকারী হাসপাতাল মেলা দুর। যাবারও পারোনা। মানুষের কাছে শুননু এই খনির জিটিসি নাকি এটি একটা বড় ডাক্তার বসাইছে হামার এলাকার মানুষের চিকিৎসা দিবার তনে। তাই আইছু বাবা। ডাক্তার মোক দেখলো। ঔষুধদিল।
জিটিসি চ্যারিটি হোমে চিকিৎসা নেয়া খনি এলাকার অমিতা খাতুন (৭০) জানান, আমি কাশিঁ এবং সর্দি নিয়ে চ্যারিটি হোমে ডাক্তার দেখিয়েছি। ডাক্তার আন্তরিকতার সাথে আমার সমস্যার কথা শুনেছেন। তার পর ঔষুধ দিয়েছেন। সেই ঔষুধেই আমি সুস্থ্য হয়েছি। দ্বিতীয়বার আর যেতে হয়নি।
দীর্ঘ দিন ধরে অসুস্থ্য ছিলেন খনি এলাকার শাহাৎত হোসেন (৭৫) দেড় মাস আগে জিটিসি’র চ্যারিটি হোমে এসে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ্য হয়েছেন । তারসাথে কথা বলে জানাযায়, তিনি লোক মুখে শুনে জিটিসি চ্যারিটি হোমে এসে ডাক্তার দেখিয়ে ঔষুধ খেয়ে সুস্থ্য হয়েছে। তিনি এমন ভালো কাজের জন্য জিটিসকে ধন্যবাদ জানান।
চ্যারিটি হোমে শিক্ষা উপবৃত্তি গ্রহন করতে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া শিক্ষার্থী মোছা ঃ সুলতানা পারভিন বলেন,আমার বাবা প্রায় ২০-২২বছরধরে এই খনিতে চাকুরী করে আসছেন। ইতিপুর্বে খনি শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে জিটিসি’র মত এমন করে কেউ কখনো ভাবেনি। আমাদের প্রতি মাসে শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান করে উচ্চ শিক্ষায় সহযোগিতা করায় তিনি জিটিসি কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।
শিক্ষার্থী মোঃ নাহিদ আহম্মেদ বলেন,আমার বাবা এই খনিতে প্রায় ২০ বছরের অধিক সময় ধরে খনি উন্নয়ন ও পাথর উত্তোলন কাজের সাথে জড়িত আছেন। খনি শ্রমিকদের পরিবার এবং তাদের সন্তানদের নিয়ে ইতিপূর্বে কোন কোম্পানী জিটিসি’র মত করে ভাবেনি। তারা খনি শ্রমিকদের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি দিয়ে লেখাপড়ায় উৎসাহিত করেছেন। এছাড়া জিটিসিচ্যারিটি হোম প্রতিষ্ঠা করে অভিজ্ঞ এমবিবিএস ডাক্তার দিয়ে খনি শ্রমিকদের পরিবারের পাশাপাশি এলাকার মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ সেবা প্রদান করছে। এসকল কর্মকান্ড নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে।
মধ্যপাড়া মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মোঃ ওবায়দুররহমান বলেন, কলেজটি এমপিও ভুক্ত না হওয়ায় তাদের শিক্ষককর্মচারীরা সরকারী কোন প্রকার বেতন ভাতা পাননা। শিক্ষকদের এমন দূর্দশায় জিটিসি প্রতি মাসে আর্থিক ভাবে তাদের সহায়তা করে পাশে দাড়ানোর জন্য তিনি জিটিসি কর্তৃপক্ষকে বিশেষ করে নির্বাহী পরিচালক জাবেদ সিদ্দিকীকে ধন্যবাদ জানান।
১০ নং হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ মাসুদুর রহমান শাহ বলেন, গ্রামীন এই জনপদে স্বাস্থ্য সেবা নিতে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দুরে উপজেলা সদর হাসপাতাল এবং ১৫ কিলোমিটার দুরে ফুলবাড়ী হাসপাতালে যেতে হয়। জিটিসি চ্যারিটি হোম স্থাপানের মাধ্যমে সামাজিক কল্যানমূলক কাজের পাশাপাশি অভিজ্ঞ এমবিবিএস ডাক্তার দ্বারা এলাকার গণমানুষের স্বাস্থ্য সেবায় বিনামূল্যে স্বাস্থ্যপরামর্শ সেবাদিয়ে যে অবদান রাখছে তা নজিরবিহীন।
পাথর খনি লোড আন লোড কুলি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সাদেকুল ইসলাম বলেন, জিটিসি যেভাবে পাথর উত্তোলন করেছে ইতি পুর্বে এমন ভাবে কেউ এই খনি থেকে পাথর উত্তোলন করতে পারেনি। জিটিসিই পাথর খনিটিকে লাভজনক করেছে। আবার খনি এলাকাবাসীর জন্য জিটিসিচ্যারিটি হোম স্থাপন করে সেখান থেকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরামর্শ সেবা দিচ্ছে। এতে করে এলাকাবাসী খুশী। এমনকাজের জন্য জিটিসিকে ধন্যবাদ জানান তারা। কেননা আমাদের পাশেই কয়লাখনি রয়েছে। সেখানে খনি এলাকাবাসীর জন্য এমন কোন সামজিক কার্যক্রম নেই।
জার্মানীয়া-ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি) এর নির্বাহী পরিচালক জাবেদ সিদ্দিকী জানান, এই খনির জন্য এলাকাবাসীর অনেক ত্যাগ এবং অবদান রয়েছে। এই খনি নিয়ে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা অনেক। আমরা এই পাথর খনিকে সরকারের লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছি। সেই সাথে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের কোম্পানী খনি শ্রমিকদের উচ্চ শিক্ষায় অধ্যায়নরত সন্তানদের শিক্ষাউপবৃত্তি, এলাকাবাসীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ বিভিন্ন সামাজিক কল্যানমূলক কর্মকান্ডে তাদের পাশে দাড়ানোর জন্য একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে জিটিসি চ্যারিটি হোম প্রতিষ্ঠা করেছে। সামাজিক এই কর্মকান্ডে তিনি খনি এলাকার সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন।