• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৮ অপরাহ্ন |
শিরোনাম :

জীবন যুদ্ধে এখনো টিকে আছেন স্বামী পরিত্যাক্তা ভ্যান চালক মুংলী রানী

জয়পুরহাট প্রতিনিধি ।। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের বুধা মালীর স্বামী পরিত্যাক্তা মেয়ে সপ্তমী রানী (মুংলী)। ২০০২ সালের দিকে জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার বামনগ্রামের কাশীনাথের ছেলে বিটল মালীর সাথে একটা চায়না ফোনিক্স বাইসাইকেল, আধা ভরি সোনা, ২০হাজার টাকা ও ঘর সাজানোর আসবাব পত্র দিয়ে খুব অল্প বয়সে বলতে গেলে বাল্য বিয়েই হয় সপ্তমী রানীর।
সংসার কি জিনিস তখন তা ঠিক মত না বুঝতেই বিয়ের পর থেকে শুরু হয় শ্বশুড় বাড়ীর অমানবিক নির্যাতন। নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন মুংলী। একে একে বলতে থাকেন তাকে কিভাবে তার শ্বশুড় বাড়ীর লোকেরা নির্যাতন করত।
প্রথমে শ্বশুড় আমাকে মারধর করত, তারপর আমার স্বামী বিটল বাবার পক্ষ নিয়ে আমাকে কখনো চড় থাপ্পর আবার কখনো লাঠি দিয়ে পেটাত, প্রতিবাদ করলে বা জোড়ে কাঁদলে মুখে কাপড় গুঁজে দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে সিগারেট না হয় জ্বলন্ত মশার কয়েলের স্যাকা দিত। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বাবার বাড়ি আসলে অভাবী বাবা মা আবারো জোর করে শ্বশুড় বাড়ি পাঠাত। তারপর দুই গুন, তিনগুন নির্যাতন।”
মুংলীর মা শেফালী রানী বলেন, এ ভাবে শত নির্যাতন সহ্য করে কখনো শ্বশুড় বাড়ি আবার কখনো বাবার বাড়ি আসা যাওয়ার মধ্যেই তিনটি সন্তানের জন্ম দেয় মুংলী। সন্তানদের কথা ভেবে ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে বলে মুংলীকে স্বামীর বাড়িতে বার বার পাঠানো হলেও সুখী হয়নি মুংলী।
নির্যাতনের মাত্রা এত বেড়ে গেল যে, স্বামীর নির্যাতন সইতে না পেরে, গত ৭ বছর আগে ২০১৩ সালে তিন সন্তানকে নিয়ে একেবারে চলে আসেন হত দরিদ্র বাবার বাড়িতে। বিষ্ণাপুর গ্রামের প্রদীপ কুমার, পাশ্ববর্তী খুলাগাড়ি গ্রামের মাসুদ সহ এলাকাবাসীরা জানান, বাবার অভাবের সংসারে বোঝা হতে চাননি মুংলী, দুবেলা দুমুঠো খাবার জোগাড় করতে ও তিন সন্তানকে মানুষ করতে শুরুর দিকে পাড়ায় পাড়ায় পান ফেরি করতেন। এতেও তার সংসারে টলমল অবস্থা, “যেন নুন আনতে পানতা ফুরায়” অবস্থা। কিন্তু তাতেও হাল ছেড়ে না দিয়ে একটু বেশী আয়ের জন্য মুংলী ২০১৫ সাল থেকে শক্ত-সামর্থ পুরুষদের পেশা বলে পরিচিত ভ্যান চালাতে শুরু করেন।
ভ্যান চালাতে আগের চেয়ে অনেক কষ্ট কম হয় জানিয়ে মুংলী বলেন, “আগে পা প্যাডেল ঘুড়িয়ে ভ্যান চালাতাম আর এখন ব্যাটারী চালিত ভ্যান চালাই, প্রতিদিন সকালে ভ্যান নিয়ে বাড়ি থেকে বের হই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভ্যান চালিয়ে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরি। হাত-পা তখন প্রচন্ড ব্যথা করে। দিনে দুই-তিন’শ টাকা কামাই করে বাড়ি ফিরি। সেই টাকা দিয়ে সংসারের খরচ চালাই ও তিনটা ছেলে মেয়েকে পড়াশুনা করাই।
১২ বছর বয়সী বড় ছেলে তৃতীয়, মেঝ মেয়ে সুফলা ২য় শ্রেনীতে ও ছোট ৭ বছরের ছোট মেয়ে শংকরীকে মানুষের মত মানুষ করার স্বপ্ন দেখেন মুংলী। মুংলী বলেন, পুরুষ ভ্যান চালকরা সবাই তাকে ছোট করে দেখেন না, কোন কটুক্তি করেন না বা খারাপ কোন আচরনও করেন না, সবাই তাকে ভালবাসেন। ভ্যান চালক একই এলাকার বামনী গ্রমের ইয়াকুব আলী, পাশ্ববর্তী নূর নগর গ্রামের মোস্তফাসহ এলাকাবাসীরা জানান, তারা মুংলীর সব কিছুই জানেন, মুংলীর যাতে একটু বেশী টাকা রোজগার হয় সে জন্য তারা তাকে ২/৪ জন যাত্রী বা বহনের জন্য মালামাল ছাড় দেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিলকপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সেলিম মাহবুব সেলিম বলেন, মুংলীর বসত বাড়ি নেই, তাই প্রধান মন্ত্রীর তহবিল থেকে আবাসন প্রকল্পের একটি বাড়ি তৈরীর করে দেওয়ার জন্য তার নামের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। মুংলীদের সৎ উপাজনে বিশ্বাসীদের পাশে থাকার জন্য আমি সরকারি ও বেসরকারি সংগঠনসহ দাতাগনের কাছে আহবান জানান এই জনপ্রতিনিধি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ