সিসি নিউজ ।। সময়, শ্রম ও ব্যয়ে সাশ্রয় হওয়ায় নীলফামারীতে কফি চাষাবাদ বাড়ছে। চলতি বছরে জেলায় ৬০ বিঘা জমিতে রোবাস্টা জাতের কফির ছোট ছোট বাগান গড়ে উঠেছে। কফির এ জাতটি এখানকার আবহাওয়া জন্য যথেষ্ট উপযোগি। তাই চাষীদের মাঝে রোবাস্টা জাতের কফির চারা বিনা মূল্যে বিতরণ করে এর চাষাবাদের জন্য উৎসাহ দিয়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র মতে, কফি চাষের জন্য প্রয়োজন উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া এবং মাঝারি বৃষ্টিপাত। নীলফামারীর আবহাওয়া এবং এ অঞ্চলে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের মাত্রা কফি চাষের অনুকূল। এখানকার কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া কফিগাছের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তবে ফল পাকার জন্য শুষ্ক আবহাওয়া দরকার। মৃদু অম্লধর্মী মাটি ও লৌহ, পটাশ, নাইট্রোজেন ও জৈবিক উপাদানসমৃদ্ধ লালচে দোঁ-আশ মাটি কফি চাষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত, যা এখানে রয়েছে। মাটির শ্রেণি উঁচু ও সুনিষ্কাশিত হওয়ার কারণে কফি চাষের জন্য আদর্শ।
কৃষি বিভাগের মতে কফি একটি চিরহরিৎ, গুল্মজাতীয় ও বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। কফির অনেক জাত থাকলেও এখন পর্যন্ত দুটি জাত বাংলাদেশে চাষ হচ্ছে। একটি অ্যারাবিকা, অন্যটি রোবাস্টা। অ্যারাবিকা জাতের কফি সাধারণত মিহি, হালকা ও সুগন্ধযুক্ত। অন্যদিকে কিছুটা তিতকুটে স্বাদ ও অতিরিক্ত ক্যাফেইনসমৃদ্ধ কফি হলো রোবাস্টা। এই কফির ফলন তুলনামূলক বেশি। কফিগাছ থেকে শুধু পরিচিত পানীয়টিই নয়, কফিগাছের অন্য উপকরণ ব্যবহার করে মধু ও শ্যাম্পু তৈরি করা যায়। একটি কফিগাছের ফুল থেকে প্রতিবার ১০০ গ্রাম মধু সংগ্রহ করা সম্ভব। এ ছাড়া নষ্ট হয়ে যাওয়া কফি চেরি দিয়ে ময়দা তৈরি হয়। এই ময়দা দিয়ে রুটি, চকলেট, সস ও কেক তৈরি করা যায়।
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মুন্সিপাড়া গ্রামের কফি চাষী আব্দুল কুদ্দুস জানান, ২০০৯ সালে কক্সবাজার থেকে ২০ টাকা দরে ১৫০টি অ্যারাবিকা জাতের কফির চারা কিনে ৪ শতাংশ জমিতে প্রথম চাষ শুরু করি। তিন বছরের মাথায় ফলন আসে। এরপর নিজেই চারা প্রস্তুত ও বিক্রিতে মন দেই। এখন প্রতিবছর শুধু কফির চারা বিক্রি করে ৫-৬ লাখ টাকা আয় করি। তিনি জানান, এ গাছের বংশবিস্তার মূলত বীজ দিয়েই হয়। গুটিকলম করেও চারা প্রস্তুত করা যায়।
একই উপজেলার পুঁটিমারী ইউনিয়নের কাছারীপাড়া গ্রামের সুলতান আলী মাস্টার জানান, ৮ বছর আগে বাড়ির সামনে পতিত ৮ শতাংশ জমিতে কফি চাষ শুরু করি। বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় এক বিঘা জমির ওপর কফির বাগান করছি। জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের সুনগর গ্রামের খাদিজা আক্তার ২০১৯ সালে ৪০ শতাংশ জমিতে অ্যারাবিকা জাতের কফির চারা লাগান। এ বছর তাঁর বাগানে প্রথম ফলন এসেছে। কৃষি বিভাগের দেয়া পরামর্শে কফির সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে আদা, হলুদ প্রভূতি মসলাজাতীয় ফসল চাষ করছেন তিনি।
কিশোরগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তা তুষার কান্তি রায় জানান, চারা রোপণের দুই বছরের মাথায় ফল আসা শুরু হয় কফি গাছে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে ফুল আসা শুরু হয় আর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে ফল সংগ্রহ করা যায়। তিনি জানান, প্রথম অবস্থায় প্রতি গাছে ২ কেজির মতো ফল আসে। পরে তা শুকিয়ে ৩০০ গ্রামের মতো পাওয়া যায়। ফল সংগ্রহের পর কফির বিনগুলো রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে তাৎক্ষণিকভাবে কফি প্রস্তুত করা যায়।
নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, কফি পাহাড়ি অঞ্চলে ভালো হলেও নীলফামারীর কৃষকেরা সমতল ভূমিতে এর চাষ করে সাফল্য দেখিয়েছেন। ভবিষ্যতে কফি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে কফি চাষের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে এ অঞ্চলে। কৃষকদের কফি বিষয়ে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া গেলে এ অঞ্চলে কফি চাষের এক বিরাট সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। ফলে দেশে কফির আমদানি নির্ভরতা কমবে।