• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৫ অপরাহ্ন |

চেনা অচেনার মিথষ্ক্রিয়া

1476604_393778340752150_2016814785_n_18349আলী এহসান:
ফট্টাস… ফট্টাস… ফট্টাস …
শব্দ নয়! প্রতিধ্বনি কলজে কাঁপায়। শিউরে ওঠে ভয়ে, আতঙ্কে আঁতকে ওঠে। ধ্বনির উৎস নাচে তাণ্ডব উল্লাসে। শব্দের ঠোঁটে রক্তমাখা হাসি। একাত্তরের বধ্যভূমি দেখার চকচকে আনন্দ। ষোলো কোটি মন স্বজন হারানোর ব্যথায় যতোই কাতর হোক। ক্ষোভে ফুঁসে উঠুক। রাস্তায় নামুক দৃপ্ত শ্লোগান কণ্ঠে। পরোয়া নেই। প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়া বোমা, আগুন আরো ব্যাপক রক্তপাত। শান্তির আহ্বান রবীন্দ্র সুরে গোঁঙায় শুধু। তাও মাত্র দিনকয়েক। তারপর বাতাস বয় শত্রুর ইচ্ছেয়। এবার এসপার ওসপার একটা কিছু হবেই! রাহাতের অনিশ্চিত মনের দ্বিধান্বিত উচ্চারণ- ‘যতোই হম্বি তম্বি ছড়াক; কোথাও গড়ে ওঠছে না নিরেট ঐক্য।’ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় একতার প্রতিবিম্ব দেখা গেলেও মত ও পথের পার্থক্য বাড়ায় দূরত্ব। ক্ষমতার লোভ, লালসার তান্ডব ধ্বংস করে দিচ্ছে সব সুন্দর।
সুন্দর অসুন্দরের পরিসংখ্যান পরে; এখন প্রাণ মুঠোয় দৌঁড়ানোটা জরুরি। রাহাত এদিক-ওদিক তাকায়। আশেপাশে পরিচিত আস্তানা আছেকিনা মনে করতে চেষ্টা করে। চেতনায় হঠাৎ ঝিলিক দেয় সবুরের মুখ।
মুঠোয় আকাশ। তর্জনি গোণে ছায়াপথ।  নক্ষত্র নিয়ন্ত্রণে চোখ- ইশারায় খেলে বাকাডুলি। জ্যোতিষ্ক মেলায় সময় নিছক দর্শক মাত্র। প্রকৃতিতে এর প্রভাব সার্বক্ষণিক। দিন-রাত, পূর্ণি-অমাবশ্যা, জোয়ার-ভাটা। প্রাণী-উদ্ভিদও মহাজগতিক রহস্যময়তার চক্করে খাচ্ছে ঘুরপাক।
ক্লোজসার্কিটের পর্দায় পরিচয় নিশ্চিত হয়ে রিমোটে দরজা খোলে সবুর। সাক্ষাতপ্রার্থী ঘনিষ্ঠবন্ধু। সহপাঠী রাহাত। প্রচার মাধ্যমে সাড়া জাগানো পুরুষ। ডাকসাইটে সংবাদ কর্মী। ক্ষমতাশালী হয়েও সবুরকে তাই একটু সমঝে চলতে হয়। রাহাত যদিও খোলা মনের সহজ মানুষ। কথার জালে স্বপ্ন বোনে। পথ দেখায়। আবেগে নয়। বাস্তবতার বিশ্লেষণে। যুক্তির নিরীখে। ঘনিষ্ঠ হলেও সে খুব সাবধানী। রাহাতের সামনে জিভ আলগা করে না। কখন মুখ ফসকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে পড়বে কে জানে? আমলা জীবনের ধারাই এমন। প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে রাখতে হয় সতর্ক। সংযত। আর ফাইল নোটের মার-প্যাঁচে রাজনৈতিক মন্ত্রীদেরকে ইচ্ছের বড়শি গেলানো! আছে ডানহাত-বামহাতের সমান তৎপরতা।
রাহাত স্থিতু নয় কোথাও। অনুসন্ধানী পতিবেদনের রসদ খোঁজতে চষে বেড়ায় গোটা দেশ। আজ পঞ্চগড়তো কাল খাগড়াছড়ি। রিপোর্ট পাঠায় ই-মেইলে। যেখানে যাক, যার ওখানেই উঠুক- সবকিছু নিজের করে নেয়। আন্তরিকতায় ভরিয়ে তোলে সবার মন। একজন সচিব হয়েও সবুর নিজের বাড়িতে যেনো রাহাতের কথায় খানিকটা লেজ নাড়ায়। নাড়াতে বাধ্য। তা না হলে কখন কোন ফোঁকড় দিয়ে বাঁশ ঢুকাবে কে জানে!
   হরতাল কাভার করছিস?
   আরে নাহ্। চারপাশের হালচাল দেখতে বেরিয়ে ছিলাম।
   তারপর?
   বোমার তাড়া! দৌড়ে প্রাণ বাঁচিয়েছি।
   তোরা না সাংবাদিক! যুদ্ধক্ষেত্রেওতো লক্ষ্যের আওতামুক্ত।
   জেনেভা কনভেশন ওরা থোড়াই কেয়ার করে। এখন মিডিয়া সেন্টারই
   রক্ষা পায় না আর খাতির করবে সাংবাদিককে!
   তা অবশ্য ঠিক।
   মিষ্টি কোথায়? ওকে কিছু ঝাল-টালের ব্যবস্থা করতে বল।
   বলার অপেক্ষায় থাকিনি। ফোন পেয়ে বসিয়ে দিয়েছি। এলো বলে। মিষ্টি এসে মুখোমুখি সোফায় বসে।
   ক্যামন আছিস তুই?
   ভালো, তুই?
   নিচে পড়ে থাকতে আর ইচ্ছে করছে না।
   উপরে উঠতে নিষেধ করেছে কে?
   সবকিছু সহজে হয় না।
   হবে না কেনো? সরাসরি উঠে যা পাহড় চূড়োয়। তখন দেখবি; পায়ের
   নিচে সবাই পিঁপড়ে।
   পাহাড়ে অক্সিজেন নেই।
   না থাক; বরফতো আছে!
   বরফ দিয়ে কি করবো?
   বরফ থেকে পানি। পানি থেকে হাইড্রোজেন সরালেই অক্সিজেন। ব্যস্!
   তোর হয়ে গেলো।
কথার পিঠে কথা। অযথা সময় অপচয়। অপেক্ষার বিরক্তি কাটাতে ফালতু কথাই টনিক। মিষ্টির কর্মকন্যা ট্রেতে জলখাবার সাজিয়ে এনে রাখে টেবিলের উপর। সবুর উঠে দাঁড়ায়। বলে- ‘জরুরি কাজে আমাকে একটু বেরোতে হচ্ছে।’
   বাব্বাহ্! এলাম সচিবালয়ের ট্যাম্পারেচার জানতে। আর তুই শালা
   পালাচ্ছিস! এ না হলে আমলা!
   এতোক্ষণ তোর সম্মানেই বসে ছিলাম। নয়তো বেরিয়ে যেতাম অনেক
   আগেই। সবুর বেরিয়ে যায়। মিষ্টি আর রাহাত মুখোমুখি চেয়ারে। সামনের টেবিলে গরম সমুচা ধোঁয়া ওড়াচ্ছে। রাহাত একটা তুলে নিয়ে কামড় বসায়। মিষ্টি জিজ্ঞেস করে-
   এ্যাই খবরের জাহাজ!
   বল শুনছি।
   চারদিকে এতো বোমা-বারুদ; বলতো দেশ এখোন কোন তীর্থে?
   কাশীও নয়, মক্কাও না।
   তাহলে সামনে কী?
   মারো-কাটো, ভাঙো-পোড়াও।
   শান্তি ফেরানো যায় না?
   যেতো; যদি পক্ষগুলোর সদিচ্ছা থাকতো। হাঁটতো সমঝোতার পথে।
   সমস্যা কোথায়? নির্বাচনেতো এরাই লাফাবে।
   লাফাচ্ছে এখনো।
   তাহলে?
   এক পক্ষের কাঁধে তালেবানি ভূত; আরেক পক্ষ চায় ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে।
   গতবার ওরাওতো তাই চেয়েছে।
   শানেনযুল ওখানেই। এক-এগারোর পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে গাড়িতে আবার
   জাতীয় পতাকা ওড়ানো।
   দেশকী তাহেরি স্কয়ারের পথে?
   অনেকটা। বলতে পারিস তালেবানি সংঘাত। হিংস্র হয়ে উঠবে আরো।
   নেবে একাত্তরের প্রতিশোধ। আবার শুরু হবে বুদ্ধিজীবি হত্যা। হয়তো গণহত্যাও।
   এতো ভয়ঙ্কর কথা!
   ভয়ঙ্কর হওয়াটাই দরকার! জনগণ প্রথম বোঝেনি। এবার বুঝবে। মানুষ
   সচেতন হলে, সমাজ পালটে ফেলতে সময় লাগবে না।
   প্রগতিশীল হয়ে তুই অমন দায়িত্বহীনের মতো কথা বলিস কী করে?
   বিষয়টা কি এতোই সরল?
   তুই দায়িত্বের ডিমে বসে তা দিতে থাক আমি চললাম।
   যদি’র বড়শিতে মাছ শিকার করতে গিয়ে তোরা সব সময় থোড়বড়ি খাড়া
   খাড়াবড়ি থোড়ই রয়ে গেলি। বেরোতে পারলি না বৃত্তের বাইরে।
   আর তোরা বিশ্ব জয় করে ফেলেছিস! তাই না?
রাহাত বেরিয়ে যায়। বৃষ্টি দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক। মনের ক্যানভাসে ভবিষ্যতের ভয়াল প্রতিচ্ছবি। মাঝে মধ্যে আবার আলোর ঝলকানিও থাকে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ