সিসি নিউজ।। নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের কয়ানিজপাড়া এলাকার বাসিন্দা এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ফেরদৌসী বেগম। ভবিষ্যৎ জীবনের কথা চিন্তা করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্সের স্থানীয় শাখায় বীমা পলিসি করেন তিনি। যার মেয়াদ পূর্ণ হয় ২০২০ সালে। কিন্তু মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার তিন বছর পার হলেও দাবির টাকা পাননি তিনি।
এদিকে ফেরদৌসী বেগম অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য টাকা প্রয়োজন। তাই ফেরদৌসী বেগম দাবির টাকা বুঝে পেতে প্রতিষ্ঠানটিতে দিনের পর দিন ধরনা দিচ্ছেন। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। মুনাফা তো দূরের কথা, এখন আসল টাকাও ফেরত দিচ্ছে না ওই ইন্সুরেন্স কোম্পানিটি। সোমবার দুপুরে বীমা অফিস থেকে বের হওয়ার সময় এসব কথা জানান তিনি।
শুধু ফেরদৌসী বেগম একাই নন, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মেয়াদ শেষ হলেও ১৩ হাজার পলিসির দাবির টাকা না দেওয়ার অভিযোগ ওঠেছে। এর মধ্যে কারও দুই বছর, কারও তিন বছর আবার কারও পাঁচ বছর পার হলেও সমুদয় অর্থ ফেরত পাননি। এতে দুর্বিষহ জীবন পার করছেন অনেক গ্রাহক। তবে ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষের দাবি, ইতোমধ্যে তারা অধিকাংশ বিমা দাবির অর্থ পরিশোধ করেছে। বাকিগুলো প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে।
ওইদিন সরেজমিন ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্সের সৈয়দপুর উপজেলা শাখায় গিয়ে দেখা গেছে, অফিসে শত শত মানুষ বিমার টাকা নিতে ভিড় জমান। অনেকেই অফিসে এসে দায়িত্বরত কাউকে না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। ভুক্তভোগী ফেরদৌসী বেগম বলেন, বীমায় নাকি অনেক সুযোগ-সুবিধা। বীমা সম্পর্কে আমাকে কতবার যে বুঝিয়েছিল তার হিসাব আমার মনে নেই। অসুস্থ হলে নাকি টাকা দিবে। যে কোন বিপদে আপদে পাশে থাকবে। মরে গেলে এর কয়েকগুন টাকা দিবে।
তারপর তাঁদের কথা অনুযায়ী ফারইস্ট লাইফ ইন্সুরেন্স নামে একটি জীবন কোম্পানিতে এক হাজার টাকা করে ১২ বছর মেয়াদী একটি পলিসি করি। প্রতিমাসে নিয়মিত টাকা জমা দিই। ২০২০ সালে পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হয়। আমি এক লাখ ৮৮ হাজার টাকা ওই ইন্সুরেন্সের কাছ থেকে পাব। তিনি আরও বলেন আমি অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য টাকার খুব প্রয়োজন। আজ তিন বছর হতে চলল আমি এখনো টাকা পেলাম না। প্রতি সপ্তাহে তিন চারবার করে আসি অফিসে। আজ কাল করতে করতে দিন শেষ হয় যায়। এভাবে আর কতদিন ঘুরতে হবে, আমি কি আমার টাকাটা পাব না?
আনিছুর রহমান নামে আরেক ভুক্তভোগী গ্রাহক বলেন, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্সে আমি এক হাজার টাকা করে ১২ বছর মেয়াদী একটি পলিসি করি। আমি গরিব মানুষ। কষ্টের সংসার। তারপরও নিয়মিত বিমার প্রিমিয়ামের টাকা জমা দিয়েছি। মেয়াদ শেষে বিমা দাবির টাকা চাইলে কোম্পানির প্রতিনিধিরা সব কাগজপত্র নিয়ে নেন। কিন্তু মাস গড়িয়ে দুই বছর চলে গেলেও বিমা দাবির টাকা দিচ্ছেন না।
শহরের গোলাহাট এলাকার চানাচুর ফ্যাক্টরির কর্মচারী আতিয়ার রহমান। ভুক্তভোগী এ গ্রাহক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘একসঙ্গে মুনাফাসহ আসল পাব এ আশায় প্রতি মাসে ২০০ টাকা কিস্তির ক্ষুদ্র সঞ্চয় বিমা করি ফারইস্ট লাইফ ইন্সুরেন্সে। ২০১৮ সালে বিমার মেয়াদ শেষ হয়। তারপর থেকে টাকার জন্য সৈয়দপুর, রংপুর, ঢাকা অফিসের স্যারদের পেছনে দৌড়াচ্ছি, কিন্তু টাকা পাচ্ছি না। তিন সন্তান আর আমরা দুজন; পাঁচজনের সংসারে আশা করেছিলাম জমানো টাকা দিয়ে কিছু একটা করব। কিন্তু তারা টাকা দিচ্ছে না।
খানসামা থেকে মুন্না হোসেন জানান, তার মা বীমা পলিসি করেন এবং দুই বছর আগে তা মেয়াদ পূর্ণ হয়। বর্তমানে আমার অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। তাঁর চিকিৎসার জন্যে অনেক টাকার প্রয়োজন। সপ্তাহে ২/৩ দিন করে আসছি এ অফিসে কিন্তু অফিসাররা বলছে কেন্দ্রীয় অফিসে ঝামেলা চলছে টাকা পেতে আরো ২/৩ বছর লাগতে পারে। আমার মায়ের চিকিৎসার কাজে যদি এ টাকা না লাগলো তাহলে কি লাভ বীমা পলিসি করে?
ফারইস্ট ইসলামী ইন্সুরেন্স কোম্পানির সৈয়দপুর শাখা অফিসের একটি সূত্রে জানা যায়, এ শাখায় মোট গ্রাহকের সংখ্যা ৩৭ হাজার। তার মধ্যে মেয়াদ শেষ হলেও চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১৩ হাজার পলিসির দাবি প্রায় ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করেনি। বিমা আইন অনুযায়ী, পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করতে হবে। যদি কোনো কোম্পানি নির্ধারিত সময়ে টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তাহলে বর্তমান ব্যাংকের সুদের চেয়ে বেশি হারে বিমা দাবির সুদ দিতে হয়। কিন্তু ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর বিমা দাবির অর্থ আটকে রেখেছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
এ নিয়ে কথা হয় ফারইস্ট ইসলামি লাইফ ইনস্যুরেন্সের সৈয়দপুর শাখার ইনচার্জ আব্দুর রহিমের সাথে। তিনি বলেন, ৩৭ হাজারের মধ্যে ইতিমধ্যে ২৪ হাজারের বেশি বীমা দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। তবে করোনার পর থেকে কেন্দ্রীয় অফিস অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে না। এ কারণে মেয়াদ শেষ হলেও এখন অনেক গ্রাহক টাকা পাচ্ছে না। গ্রাহকরা যাতে বীমা দাবির টাকা পায়, সে জন্য আমি চেস্টা অব্যাহত রেখেছি। সবকিছু ঠিক থাকলে কোম্পানি গ্রাহকের বিমা দাবির টাকা দিতে বাধ্য।