• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৯ অপরাহ্ন |

জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের মডেল ?

83232_1সিসিনিউজ: নিজের সৃষ্টির প্রশংসা করাটাই অনেকের জন্য স্বাভাবিক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার ব্যতিক্রম নয়। তিনি শনিবার সংসদে বিরোধী দলের ভূয়সী প্রশংসা করেন। কেননা তিনিই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল বানিয়েছেন। একথা সত্য যে এই নির্বাচনে বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল অংশ না নিলেও জাতীয় পার্টিকে যে কোনভাবে নির্বাচনে এনে দলটিকে বিরোধী দলের ভূমিকায় দাঁড় করাতে পেরেছেন। যা অবশ্যই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধিন সরকারের একটা ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য এবং এটা সবাইকে স্বীকার করতেই হবে।

নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকার ব্যাপারে রাজি হলেও তাদেরকে যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে এই বিনিময়ে দলটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছ থেকে কিছু অযৌক্তিক সুবিধাও আদায় করে নিয়েছে। মহাজোট সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা দলটিকে সন্তষ্ট রাখতে জাপার তিনজনকে তার মন্ত্রিসভার সদস্য বানিয়েছেন এবং একই সাথে দলটিকে বিরোধী দলের ভূমিকায়ও দাঁড় করিয়েছেন। যা সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে নজীরবিহীন। এ অবস্থায় শেখ হাসিনা যদি সংসদ নেতা হিসেবে জাতীয় পার্টির কাজ কর্মের সমালোচনা করেন তাহলে ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন নিয়ে আরো বিতর্ক তৈরি হবে এবং এমনকি তা তার সরকারের জন্যও সমালোচনার খোরাক হতে পারে। তারপরও শেখ হাসিনার তার হাতে তৈরি এই বিরোধী দলের এই ভূমিকার প্রশংসা ব্যতিক্রম বৈকি।

রওশন এরশাদ সংসদে তার বাজেট বক্তৃতার শুরুতে বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যাওয়াটা তাদের জন্য সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ছিল। আর এমন বক্তব্যের কারণেই রওশন আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তাছাড়া রওশন এমন এক ব্যক্তি যিনি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদকে পাশ কাটিয়ে ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে অংশ নেন। অথচ ঐ সময় দলের চেয়ারম্যান এরশাদ নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিল। আর ঐ নির্বাচনের অংশ নেয়ার পুরস্কার হিসেবে রওশন আজ মন্ত্রীর মর্যাদায় বিরোধী দলের নেত্রী। অথচ ১৯৯০ সালে দেশে স্বৈরশাসকের পতনের পর থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের এই উচ্চ পদে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতা শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এমনকি জাপার চেয়ারম্যান এরশাদ যিনি কি না ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনিও আজ প্রধানমন্ত্রীর আশির্বাদপুষ্ট। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে মন্ত্রীর মর্যাদায় তার বিশেষ দূত বানিয়েছেন। কোন ধরনের কাজ কর্ম ছাড়াই এরশাদ এখন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন।

তবে সরকারের নীতি নির্ধারকদের সংসদের বিরোধী দলীয় সদস্যদের প্রসংশা করার আরো কিছু কারণ রয়েছে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সরকারি দল সংসদে বিরোধী দলের সমালোচনা খুব কমই সহ্য করতে পারে। এর আগের সংসদে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় না হওয়াই যেন ছিল অস্বাভাবিক। এমনকি দল দুটির নেতাদের অশালীন ও অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করে একে অপরকে আক্রমণ করতেও দেখা গেছে। কিন্তু বর্তমান সংসদের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমান বিরোধী দলের সদস্যদের পক্ষ থেকে সংসদে ক্ষমতাসীন দলকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেয়া তো দূরের কথা সরকারের অনেক ব্যর্থতার গঠনমূলক সমালোচনাও করতে দেখা যায় না খুব একটা। তারা সবসময় চেষ্টা করে সরকারের সাথে একটা সুসম্পর্ক বজায় রাখতে। অথচ সরকারের দুর্বলতাগুলো সংসদে তুলে ধরাই তাদের প্রধান দায়িত্ব।

চলতি অর্থবছরের জন্য সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ক্ষেত্রেও তারা কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে নি। জুন মাসের প্রথমার্ধে অর্থমন্ত্রী যখন সংসদে আগামী অর্থ বছরের জন্য সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেন তখন বিরোধী দলের দায়িত্ব ছিল প্রস্তাবিত এই বাজেটের সকল দিক যাচাই করে এর নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা। অথচ উল্টো তাদেরকে এই প্রস্তাবিত বাজেটকে স্বাগত জানাতে দেখা গেছে। সুতরাং এমন বিরোধী দলকে সরকার প্রশংসা করবে এটাই স্বাভাবিক। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের প্রশংসা করে বলেন, ‘‘সংসদ কিভাবে কাজ করে জনগণ তা বুঝতে পারছে। তিনি আরো বলেন, জনগণ বিশেষ করে যুবসমাজ ও পরবর্তী প্রজম্ম এখন উপলব্ধি করতে পারছে কিভাবে গণতন্ত্র চর্চা করতে হয়।’’ তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে এটাই ইঙ্গিত করছে যে, জাতীয় পার্টি এখন সংসদে বিরোধী দলের মডেল। আর জাতীয় পার্টি সত্যি যদি সংসদে বিরোধী দলের মডেল হয়ে থাকে তাহলে এজন্য প্রধানমন্ত্রী নিজেই এর প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার । কারণ তিনি নিজেই জাতীয় পার্টিকে সংসদে বিরোধী দল বানিয়েছেন। যদিও বিরোধ দল বিষয়টিকে দেখছে ভিন্নভাবে।

দি ডেইলি স্টার


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ