• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৪ অপরাহ্ন |
শিরোনাম :

প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্নে থেকে পতিতালয়ে“জুনেরা”

6293সিসি ডেস্ক: আর্থিক দৈন্যের কারণে পরিবারে কষ্টের অন্ত ছিল না। সেই কষ্টের সমাপ্তি টানতে দুই বোন স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে প্রকৌশলী হবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। উল্টো তাদের জীবনের পরিণতি হয়েছে ভয়ঙ্কর। পাচারকারীর ফাঁদে পড়ে তাদের যৌনকর্মীর পেশায় যেতে বাধ্য হতে হয় এবং জীবনে নেমে আসে কষ্টের পাহাড়।

পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের মেয়ে জুনেরা। শৈশবে স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে প্রকৌশলী হওয়ার। কিন্তু জুনেরা ও তার বোনের জীবনটাই দুর্বিষহ করে দিয়েছে প্রতারক চক্র। বাধ্য হয়ে পতিতাবৃত্তির খাতায় তুলতে হয়েছে তাদের নাম। দুই বোনের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে পূর্ণ নাম এবং ঠিকানা গোপন রেখে বার্তা সংস্থা এএফপি প্রকাশ করেছে এমন এক প্রতিবেদন, যা পড়ে যে-কোনো স্বাভাবিক মানুষের হৃদয় কাঁদবে।

পরিবারে যখন আর্থিক সমস্যার মাত্রা সীমানা অতিক্রম করে। তখন আয়েশা নামের এলাকার এক নারী জুনেরার পরিবারকে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন ছদ্মাবরণে। দুই বোনকে স্থানীয় বাসায় কাজের ব্যবস্থা করে দেন তিনি।

এরপর আরও লোভনীয় সুযোগ আসে। দুবাই গিয়ে ভালো কাজ করে পরিবারের আর্থিক সমস্যা কাটিয়ে উঠার সুযোগ। এমন সুযোগ ফেলে দিতে চাননি জুনেরা। তখন তাদের বয়স ১৮-ও পেরোয়নি। আয়েশা তবুও তাদের জন্য দুবাই যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। এক্ষেত্রে জাল কাগজপত্র করা হয়। দুবাই বিমানবন্দরে নামতেই মুখোশ উন্মোচিত হয় আয়েশার। জুনেরা আর শাইস্তাকে জানিয়ে দেয়, এখন থেকে দেহের বিনিময়ে নিজেদের আয় করতে হবে। রাজি না হওয়ায় তাদের ভয় দেখানো হয়, পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার। পরবর্তীতে অচেনা জায়গায় অল্প বয়সী মেয়ে দুটি আর না করতে পারেনি। পরিবার-পরিজন ছাড়া এমন জায়গা আর কি-ই বা করার ছিল তাদের?

এরপর থেকেই জুনেরা আর শাইস্তার বসবাস শুরু হয় পতিতা হিসেবে। হয়ে যান নিষিদ্ধ পল্লীর সদস্য! প্রথম দিনেই বোনের সামনে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে অন্য বোনকে ধর্ষণ করান আয়েশা। পরদিন থেকে কাছে না থাকলেও খদ্দেরের মোবাইল চালু রাখার নিয়ম করেন তিনি। যেন দুই বোন যৌনকাজে আপত্তি করলে ব্যবস্থা নিতে পারেন! আর এভাবেই চলতে থাকে ধর্ষণ আর নির্যাতন। জুনেরা আর শাইস্তার সারা শরীরে এখনেও আছে সেসবের চিহ্ন। ফলে প্রতিবাদের ভাষা এক সময় হারিয়ে ফেলে দুই বোন।

কিন্তু এভাবে আর কতদিন? চার বছর অমানবিক নির্যাতন সহ্যের পর ২০১৩ সালে লুকিয়ে দেশে ফিরেন জুনেরা আর শাইস্তা। আগের চার বছরে কয়েকবার দেশে আসার সুযোগ পেয়েছিল তারা। আয়শাই নিয়ে এসেছিল সব কাগজপত্র হালনাগাদ করাতে। মা-বাবার কাছে পৌঁছে দেবার সময় আয়শা বলে যেতো, ‘দুবাইতে কী করিস তা ভুলেও বলবিনা। বললেই মেরে ফেলবো।’ ফলে চুপ থাকতো তারা। প্রাণভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারতো না ফয়সালাবাদের সাধারণ পরিবারের দুটি মেয়ে। অত্যাচার সহ্য করতে করতে একসময় সহ্যের সীমা অতিক্রম করায় দু-বোনই সব খুলে বলল বড় বোন কামারকে। কামারের সাহসী পদক্ষেপের কারণেই জুনেরা আর শাইস্তা এখন পাকিস্তানে। তবে স্বদেশেও জীবন মোটেই সুখের হয়নি। আয়শার নারী পাচার চক্রকে বিচারের মুখোমুখি করতে পুলিশের শরণাপন্ন হয়েছিলেন কামার। কয়েকদিনের মধ্যেই আয়শার এক ভাই এসে তিনটি গুলি করে জুনেরার পায়ে। গুলি করে সদর্পে ফিরে যায় আয়শার ভাই। আতঙ্কে তাদের ঘরছাড়া হতেও হয়েছে।

আহত অবস্থায় হাসপাতালে জুনেরার পায়ে অস্ত্রোপচার করা হলেও থামেনি অত্যাচার। স্থানীয় পুলিশ দিয়ে অপদস্থ করা হয় জুনেরা ও তার বোনকে। হাসপাতালেই সদ্য অস্ত্রোপচার করানো পা নিয়েই জুনেরাকে হেঁটে দেখাতে বলে পুলিশ। কষ্টে হেঁটে দেখিয়েছিলেন ঠিকই, তবে তারপর আর হাসপাতালে থাকা হয়নি। শুধু হাসপাতাল ছাড়াই নয়। তার পরিবার এখন গ্রামছাড়া।

তবে আয়েশার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চলছে, যেন ভবিষ্যতে কারো ভাগ্যে এমন পরিণতি না ঘটে। কিন্তু এই মামলার শেষ কবে, কীভাবে হবে তার নিয়ে আশঙ্কা করছেন তার আইনজীবী। আইনজীবী জুলফিকার আলী ভুট্টা বললেন, ‘এ মামলার প্রধান আসামী (আয়শার স্বামী) আশফাক। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সামনেই আদালত থেকে পালিয়েছে সে। আদালত জামিন বাতিল করা সত্ত্বেও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।’

জীবন যুদ্ধে যে প্রকৌশলী হতে চেয়েছিল, তাদের সব স্বপ্ন ভেস্তে গেছে আরও অনেক আগেই। কিন্তু এখন তারা সুস্থভাবে বেঁচেও কী থাকতে পারবেন না। দুবাই থাকতে শরীরের উপর দিয়ে সব অত্যাচার-নির্যাতন চলেছে। আর এখন দেশে ফিরে জীবন নিয়েই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। বিচারের আশায় মামলার দিকে তাকিয়ে আছেন প্রতারক-পাচারকারী আয়েশার শাস্তির জন্য।

সূত্র: ডিডব্লিউ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ