• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০১ অপরাহ্ন |

পুলিশ যেখানে ক্রিমিনাল

Omorবদরুদ্দীন উমর: জাহেদুর রহমান খান নামে মিরপুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর ১৩ জুলাই রোববার সুজন নামে একজন গার্মেন্ট ঝুট ব্যবসায়ীকে থানায় নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে। এই পুলিশ অফিসার শঙ্করে সুজনের বাসায় উপস্থিত হয়ে তাকে তার ঘরের মধ্যেই প্রচণ্ডভাবে মারধর করতে থাকে। তাকে এভাবে মারধর করার সময় তার স্ত্রী এবং পাঁচ বছরের সন্তান অনেক কাকুতি-মিনতি করে মারধর বন্ধ করার জন্য বলতে থাকা সত্ত্বেও অফিসার নির্মমভাবে তাদের সামনেই মারধর চালাতে থাকে। পরে সুজনকে প্রিজন ভ্যানে চড়িয়ে মারতে মারতে মিরপুর থানায় নিয়ে সেখানে এত প্রচণ্ডভাবে একটানা মারধর করে যে, পুলিশ হেফাজতে থানার মধ্যেই সুজনের মৃত্যু হয়। এক্ষেত্রে যা লক্ষ্য করার বিষয় তা হল, সাব-ইন্সপেক্টর জাহিদ এভাবে মারধর করে যখন সুজনকে হত্যা করে, তখন থানার অন্য অফিসাররাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন! তারা কেউই জাহিদের হাত থেকে সুজনকে রক্ষা করার কোনো চেষ্টা করেননি। এর থেকে প্রমাণিত হয়, এই হত্যাকাণ্ডের জন্য শুধু সাব-ইন্সপেক্টর জাহিদই নয়, ওসিসহ অন্য অফিসাররাও দায়ী। এ কারণে সুজনের পরিবার শুধু জাহিদের বিরুদ্ধে নয়, মিরপুর থানার ওসি সালাহউদ্দীন এবং সাব-ইন্সপেক্টর আসাদসহ আরও কয়েকজন অফিসারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবেন।
সুজনের কাছ থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টা করে টাকা না পাওয়ার কারণেই সাব-ইন্সপেক্টর জাহিদ তার বাসায় উপস্থিত হয়ে তাকে মারধর করতে থাকে এবং পরে থানায় নিয়ে পুলিশ হেফাজতে থাকার সময়ই তাকে ক্রমাগত নির্দয়ভাবে মারধর করে হত্যা করে। থানার মধ্যে অন্যান্য পুলিশ অফিসারের উপস্থিতিতে খোলাখুলিভাবে এই হত্যাকাণ্ড যেভাবে ঘটে তার থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, শুধু একজন অফিসারই নয়, সমগ্র পুলিশই এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এখানে উল্লেখ করা দরকার, সুজনের হত্যাই সাব-ইন্সপেক্টর জাহিদের প্রথম হত্যাকাণ্ড নয়, বিগত ফেব্র“য়ারি মাসে পুলিশ হেফাজতে পল্লবীর এক যুবকের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জাহিদের জড়িত থাকার অভিযোগও আছে (Daily Star, 16.07.2014)।

পুলিশ হেফাজতে বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্ত অসংখ্য। এটা এখন বাংলাদেশে প্রায়ই বিভিন্ন থানায় ঘটে থাকে। এর কোনো বিচার হয় না। কোনো শাস্তি পুলিশ অফিসারদের হয় না। পুলিশ অফিসাররা অধিকাংশ ক্ষেত্রে টাকা আদায় সম্পর্কিত বিষয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণেই এই অপরাধ করে থাকে। পুলিশ হেফাজতে হত্যাকাণ্ডের জন্য কদাচিৎ তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে যে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়া হয় তার নাম ‘ক্লোজ করা’। এই ‘ক্লোজ’ করার অর্থ জেল, জরিমানা, চাকরি থেকে বরখাস্তের মতো কিছু নয়; এর অর্থ হল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাউকে সাসপেন্ড করা। সাসপেনশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাকে আবার চাকরিতে বহাল করা। চাকরিতে বহাল হওয়ার পর ‘শাস্তিপ্রাপ্ত’ অফিসার আবার নতুন উদ্যমে আগের মতোই তার অপরাধমূলক কাজ চালিয়ে যান। সাব-ইন্সপেক্টর জাহিদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

সাব-ইন্সপেক্টর জাহিদকে এই হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেফতার করা হয়নি। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি মোজাম্মেল হক খানকে জিজ্ঞেস করায় তিনি নেতিবাচক জবাব দেন এবং বলেন, এ ধরনের নন-ক্যাডার অফিসারদের অপরাধের কারণে তাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় কোনো সরাসরি পদক্ষেপ নেয় না। পুলিশ এ ব্যাপারে যা করার সেটা করে তাদের অবগত করে। ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশকে (আইজি) এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তারা এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছেন (উধরষু ঝঃধৎ, ১৬.০৭.২০১৪)। এই তদন্তের অর্থ ও পরিণতি যে কী এটা কারও অজানা নয়। পুলিশের অপরাধের জন্য কয়েকজন পুলিশ অফিসার দিয়েই তদন্ত করানো হয় এবং তারা অবশেষে এর মীমাংসা করে ক্রিমিনালকে দায়মুক্ত করেন। তারা আবার চাকরিতে যোগদান করে বহাল তবিয়তে এবং নির্ভয়ে নিজেদের অপরাধমূলক তৎপরতা অব্যাহত রাখে!

নিহত সুজনের স্ত্রী মমতাজ সুলতানা বলেন, সুজনকে প্রতি মাসে পুলিশ এবং স্থানীয় গুণ্ডাদের ৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দিতে হতো। পুলিশের সঙ্গে এই গুণ্ডাদের যোগসাজশের ফলেই এটা হতো (Daily Star, 16.07.2014)। রক্ষক ও ভক্ষকের এই সাঙ্গাৎগিরি কোনো নতুন বা অজানা ব্যাপার নয়। শুধু তাই নয়, এটাই প্রধান কারণ যে জন্য বাংলাদেশে যত বড় অপরাধই করুক, অপরাধীদের কোনো শাস্তি হয় না। শুধু স্থানীয় গুণ্ডাপাণ্ডা বা মাফিয়াই নয়, দেশের সরকারি দল ও সরকারের লোকজন ব্যাপক আকারে এ ধরনের ক্রাইমের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণেই বাংলাদেশ এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনা, ফেনীর হত্যাকাণ্ড তো বটেই, এমনকি সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির নির্মম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও সরকারি লোকদের এই যোগসাজশ অথবা সরাসরি সরকারি লোকদের সম্পর্ক কোনো গোপন ব্যাপার নয়। সাগর-রুনীর হত্যাকাণ্ডের পর যথেষ্ট হৈচৈ এবং সাংবাদিকদের এত আন্দোলনের পরও যে সেই ঘটনা ধামাচাপা দেয়া সম্ভব হল, এর অন্য কোনো কারণ থাকা সম্ভব নয়।

আসলে সরকারি দলের শীর্ষ পর্যায়ের লোকজন পুলিশ, র‌্যাব ইত্যাদি বাহিনীকে নানা ধরনের অপরাধের জন্য যেভাবে যুক্ত করে, তার ফলেই পুলিশ ইত্যাদির মধ্যে ক্রাইম এত বৃদ্ধি পেয়েছে। পুলিশ যখন দেখে যে, তাদের সাহায্যে ক্রিমিনালদের শাস্তি না দিয়ে রক্ষা করা হয়, তখন তারা নিজেরাও ক্রাইম করে সরকারের সহায়তায় সহজেই রক্ষা পায়। এজন্য ক্রসফায়ার, পুলিশ হেফাজতে হত্যা ইত্যাদি করে চলা সত্ত্বেও পুলিশ বা র‌্যাবের শাস্তি হয় না। এ পরিস্থিতিতে সারা দেশে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি যে ভেঙে পড়বে এবং ক্রিমিনালরা কোনো অপরাধ করতে শাস্তির ভয়ে যে দ্বিধা করবে না, এটাই স্বাভাবিক। এটা অবশ্যই বলা দরকার যে, বর্তমান সরকারের আমলে এই পরিস্থিতির অবিশ্বাস্য রকম অবনতি হয়েছে। বিগত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মতো ভুয়া ও ধাপ্পাবাজির নির্বাচন থেকে নিয়ে এমন কোনো অপরাধমূলক কাজ নেই যা এখন সরকারি দলের লোকজন করছে না। এর ফলে দেশের জনগণ আজ এক ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন।

অবস্থা দেখে মনে হয়, অন্য কারণ বাদ দিয়েও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং নিজেদের আশা-আকাক্সক্ষা ক্ষমতাসীনদের দ্বারা পদদলিত হতে থাকায় ক্ষুব্ধ জনগণের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের জন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার এখন মরিয়া হয়েছে। মরিয়া হয়ে তারা দেশকে অপরাধের লীলাভূমি এবং অভয়ারণ্যে পরিণত করে আইনশৃংখলার অবনতি যেভাবে ঘটিয়ে চলেছে, এর কোনো পূর্ব দৃষ্টান্ত ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমলে তো নয়ই, এমনকি বাংলাদেশেও এর আগে দেখা যায়নি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ