• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩১ অপরাহ্ন |

বদলে যাচ্ছে এফএম রেডিও

image_100282_0ইকরাম কবীর : রেডিও জীবনে প্রথম শুনি ১৯৭১ সালে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে, তখন আমার বয়স পাঁচ। বড়রা সারাক্ষণই আকাশবাণী অথবা বিবিসি শুনছেন, তবে শোনার সময় কেমন যেন লুকোচুরি-লুকোচুরি ভাব। বাবার কাছে জানতে ছেয়েছিলাম, তিনি বলেছিলেন, ‘রেডিও শুনতে কেউ যদি দেখতে পায় তাহলে ধরে নিয়ে যাবে।’ তিনি ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন, তবে বুঝেছিলাম আরও পরে। সে সময় রেডিও সেট ছিল অনেক বড় এবং লুকিয়ে-লুকিয়ে শোনাটাও ছিল কষ্টসাধ্য। তার পরও বেশির ভাগ মানুষের জন্য দৈনিক খবরাখবর পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিল এই রেডিও।

যুদ্ধের মধ্যে আমাদের সব খোয়া গেলেও রেডিওটি কেমন করে যেন বেঁচে গিয়েছিল। মনে আছে, যুদ্ধের পর বাবা বাংলাদেশ বেতারের খবর শুনতেন আর মা শুনতেন গান, নাটক আর অন্যান্য অনুষ্ঠান। সারা দিনই প্রায় আমাদের রেডিও খোলা থাকত।

আমরা ছোটরা শুনতাম সিনেমার অনুষ্ঠান, বিশেষ করে মাজহারুল ইসলামের উপস্থাপনায় যে সিনেমার অনুষ্ঠান হতো তা আমাদের কাছে ছিল খুবই জনপ্রিয়। আমরা বড়ই হয়েছি সকালে গান, দুপুরে সিনেমার অনুষ্ঠান আর সন্ধ্যায় নাটক শুনে। টেলিভিশন না থাকায় রেডিওই ছিল আমাদের পরিবারের কাছে সব। আমাদের মতো তখন অনেকেই ছিল যাদের একমাত্র ভরসা ছিল রেডিও।

’৭৮ সালে গেলাম একটা বোর্ডিং স্কুলে। সেখানে অবশ্য টিভি ছিল; কিন্তু ছাত্রদের জন্য খেলাধুলার লাইভ ধারাভাষ্যের জন্য রেডিও ছাড়া আর কোনো উপায়ই ছিল না। আন্তর্জাতিক খবর জানার জন্যেও আমরা রেডিও শুনতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে বেতারের বেশ কয়েকটি পড়াশোনা-সংক্রান্ত লাইভ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছি। বাসায় বলে রাখতাম ক্যাসেটে রেকর্ড করে রাখতে, পরে গিয়ে নিজে শুনতাম। নিজের গলা রেডিওতে শুনতে কী যে ভালো লাগত তা বলে বোঝাতে পারব না। তখন আমার রেডিও শোনা আরও বেড়ে গেল।

কর্মজীবনে এসে বিবিসি রেডিওতে কাজ করার সুযোগ যখন হলো, তখন রেডিও সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলাম। অনেক বড় বড় রেডিও সাংবাদিক ও ব্রডকাস্টারদের সঙ্গে কাজের সুযোগ হলো। রেডিও যে সমাজে কী প্রভাব ফেলতে পারে তা জানলাম। তবে আমি যখন রেডিওতে কাজ শুরু করলাম, তত দিনে আমাদের দেশের মানুষ বাংলাদেশ বেতার শোনা প্রায় বাদই দিয়ে দিয়েছে। এ সময়ই বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা এবং অন্যান্য রেডিওর দিকে সবাই ঝঁকে পড়ে। আর যখন স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলগুলো এল, রেডিও তো একেবারেই হারিয়ে গেল।

তবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে কয়েকজন ব্যবসায়ীর উদ্যোগে এফএম রেডিও স্টেশনগুলো এলো খুব ঝটপট, আর এসেই তারা খুব তাড়াতাড়ি শ্রোতাদের নজর কাড়তে সক্ষম হলো। ঠিক এ সময় থেকেই বাংলাদেশের রেডিওর ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লেখা শুরু হলো। শুরুতে সবগুলো এফএম রেডিওই সংগীতনির্ভর ছিল। এবং সে থেকেই বাংলাদেশের গানপ্রে্রমিকদের জন্য এক নতুন অধ্যায়। এ দেশের সংগীতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই রেডিও স্টেশনগুলো বেশ চোখে পড়ার মতো ভূমিকা রাখতে শুরু করল। নতুন নতুন শিল্পীদের শ্রোতাদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিল। বলতে গেলে এফএম রেডিওগুলো হয়ে উঠল এ দেশের সংগীতশিল্পীদের জন্য একধরনের মঞ্চ।

তবে এই রেডিওগুলো বিশ্লেষকদের সমালোচনার বাইরে যেতে পারেনি। তাদের উপস্থাপকদের বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলা, বাংলা শব্দ ইংরেজির মতো করে উচ্চারণ করা এবং শ্রুতিমধুর নয় এমন গান প্রচার করা-এ বিষয়গুলো অনেকদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছে। তবে দিন শেষে বলতেই হয় এই রেডিওগুলো তাদের গান, কথা ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের তরুণ শ্রোতাদের ধরে রেখেছে। নতুন প্রজন্মের ব্রডকাস্টার তৈরি হয়েছে, যাঁরা মিডিয়াজগতে তারকা-খ্যাতিও পেয়েছেন। এই পেশা এখন অনেক মানুষ বেছে নিতে চায়।

একই সঙ্গে অনেক নতুন পেশাজীবীও তৈরি হয়েছে, যারা সারাক্ষণ গবেষণা করছেন, নানা ধরনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রোতাদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। গবেষণায় পাওয়া গেল যে রহস্য গল্প শ্রোতাদের টানে, তারা মন দিয়ে শুনছেন। এভাবেই অন-এয়ারে এল ‘পোকা’, ‘ভূত’, ‘কুয়াশা’, ‘পাপ’, থারসডে নাইট সাগা’, ‘ছায়া’ এবং সবশেষে ‘ডর’। সংগীতের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের এফএম রেডিওতে গল্প বলা শুরু হলো। গল্প বলা শ্রোতাদের কাছে খুবই সমাদৃত হলো।

তারপর, ভয়ের গল্প ছাপিয়ে, যখন মনে হলো একই ধরনের অনুষ্ঠানের মধ্যে বাঁধা পড়ে যাবে, তখন এই রেডিওগুলো মানুষের মনের আরও কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করল। জীবনধর্মী অনুষ্ঠান নিয়ে তারা শ্রোতাদের আরও কাছে যাওয়ার চেষ্টা করল। এই ধারাবাহিকতায় এল ‘যাহা বলিব, সত্য বলিব’, ‘জীবনের গল্প’, ‘লাভ গুরু’, ‘প্রেমরোগ’, ‘ইটস কমপ্লিকেটেড’ ইত্যাদি অনুষ্ঠান অন-এয়ারে এল এবং এগুলো মানুষের মন জয় করল।
‘যাহা বলিব, সত্য বলিব’ অনুষ্ঠানে শ্রোতারাই রেডিওতে এসে তাদের জীবনের গুরুতর অপরাধ এবং দোষ স্বীকার করেন। ‘জীবনের গল্প’ অনুষ্ঠানও শ্রোতাদের নিয়েই। তারা এসে তাদের জীবন-সংগ্রামের গল্প সবাইকে শোনান। এফএম রেডিওর মূল শ্রোতা অল্পবয়সী হলেও বড়রাও এই অনুষ্ঠানগুলো খুব পছন্দ করছেন।

‘লাভ গুরু’, ‘প্রেমরোগ’, ‘ইটস কমপ্লিকেটেড’ অনুষ্ঠানগুলো মানুষে-মানুষে ভালোবাসা ও সম্পর্কের কথা বলে শ্রোতাদের মনের কাছাকাছি যেতে পেরেছে।

এই অনুষ্ঠানগুলো শ্রোতাদের আনন্দ দিতেও খুবই সার্থক। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে কৌতুক-নির্ভর অনুষ্ঠানের স্বল্পতা আছে, যা কিছুটা হলেও এগুলোর মাধ্যমে পূরণ করা গেছে। শ্রোতাদের অংশগ্রহণ দেখে তাই-ই মনে হয়।
এভাবেই প্রতিনিয়ত নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের এফএম রেডিও, চেষ্টা করছে শ্রোতাদের তাদের কাছে টানতে, অনুষ্ঠানে শ্রোতাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে। সংগীতের পাশাপাশি শ্রোতাদের প্রতিদিনের কথা নিয়ে অনুষ্ঠানমালা দিন দিন আরও বাড়বে। এবং একই সঙ্গে শ্রোতার সংখ্যাও অনেক বাড়বে।

সৌজন্যে: দৈনিক প্রথম আলো


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ