মাহবুবুল হক খান, দিনাজপুর: দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার পাল্টাপুর ইউনিয়নের ভোগডমা আশ্রয়ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খোলা আকাশের নীচে ক্লাস করছে। অথচ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবই আছে। কিন্তু নেই ভবন। তাই তারা খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করছে।
দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বেতন-ভাতা না পেয়েও শিক্ষাদান অব্যাহত রেখেছেন বিদ্যালয়ের ৪ শিক্ষক। এতদিন হতাশায় দিন কাটালেও সম্প্রতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণের ঘোষণা দিলে আশায় বুক বাঁধেন তাঁরা।
স্থানীয় এলাকাবাসি জানায়, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর প্রয়াত সাবেক সংসদ সদস্য এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী আব্দুর রউফ চোধুরী ১৯৯৯ সালে বীরগঞ্জ উপজেলার পাল্টাপুর ইউনিয়নের ভোগডোমা আশ্রয়ণটি উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি জানতে পারেন ভোগডোমা এলাকায় শিক্ষার হার ২০ ভাগের নিচে এবং এই এলাকার ৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। তখন এলাকাবাসী মন্ত্রীর কাছে পশ্চিম ভোগডোমা গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। এলাকাবাসির দাবীর পেক্ষিতে মরহুম আব্দুর রউফ চৌধুরী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে শিক্ষা অফিসকে তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যালয় নির্মাণের নির্দেশ দেন। নির্দেশ মোতাবেক উপজেলা শিক্ষা অফিসের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ভোগডোমা গ্রামের শিক্ষানুরাগী মোঃ নুর ইসলাম দশমিক ৩৩ একর জমি দান করেন।
গ্রামবাসির আর্থিক সহযোগিতায় এবং শিক্ষানুরাগী মোঃ মছির উদ্দিন, ইদ্রিস আলী, সায়েদ আলী, আবু বক্কর সিদ্দিক, মোবারক আলী ও নূর ইসলামের প্রচেষ্টায় খড়ের ঘর নির্মাণ করা হয়। এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবক নূর মোহাম্মদ প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেন। তার সঙ্গে মোছাঃ নাসিমা খাতুন, নূরজাহান বেগম ও আল্পনা রানী সরকার সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে স্বেচ্ছাশ্রম শুরু করেন এলাকার শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের আলোকিত করার কাজ। শিক্ষার পরিবেশ ও শতভাগ পাসের ফলে বিদ্যালয়টিকে নিবন্ধন দেয়া হয়। নানা প্রতিকূলতা ও অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটি আঁকড়ে ধরেন শিক্ষক ও এলাকাবাসী। এরপর সরকারের ঘোষণায় বিদ্যালয়টি নতুন স্বপ্ন দেখে। বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের ঘোষণা দেয়া হয়।
কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে চলতি বছরের ৫ জুলাই কালবৈশাখী ঝড়ের আঘাতে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় বিদ্যালয়টি। বিদ্যালয়ের একমাত্র টিনের ঘরটি এক কিলোমিটার দূরে গিয়ে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। কিন্তু তার পরও থেমে থাকেনি ভোগডোমাবাসির স্বপ্ন দেখা। জুলাই মাস থেকে বিদ্যালয়ের মেঝেতে বসে খোলা আকাশের নিচে পাঠদান অব্যাহত রাখেন শিক্ষকরা। পরবর্তীতে এলাকাবাসির সহযোগিতায় ২০-২৫ জোড়া বেঞ্চ সংগ্রহ করে ৫ মাস ধরে শতাধিক শিক্ষার্থীর খোলা আকাশের নিচে পাঠদান চলছে।
খোলা আকাশের নিচে পড়ালেখা করতে কেমন লাগছে এমন প্রশ্নের উত্তরে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী মোছাঃ শাহানাজ পারভীন বলেন, পড়তে মন বসে না। কখন যে পাখির মল গায়ে পড়ে, সারাক্ষণ সেই চিন্তাই মাথায় কাজ করে। আর মেঘ জমলেই তো স্কুল ছুটি হয়ে যায়। শিক্ষার্থী শাহানাজ প্রতিবেদককে পাল্টা প্রশ্ন করে জানতে চান- ‘সব স্কুলই কি এমন হয়’?
পূর্ব ভোগডোমা আশ্রয়ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সভাপতি মছির উদ্দিন জানান, এই এলাকায় বেশিরভাগ গরিব মানুষের বসবাস। তাদের সন্তানদের পড়ালেখা শেখানোর মতো প্রয়োজনীয় অর্থ নেই। তারপরেও এলাকার লোকজনের প্রচেষ্টায় অসহায় পরিবারগুলোর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে কাজ করে যাচ্ছেন তারা।
প্রধান শিক্ষক নূর মোহাম্মদ জানান, ভবন নির্মাণের জন্য দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপালের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরে আবেদন করা হয়েছে। আমরা আশা করছি, মানবিক বিষয় বিবেচনা করে সরকার দ্রুত এই বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের যাবতীয় ব্যবস্থা করবে।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার আলাওল হাদী জানান, বিদ্যালয়টি দ্বিতীয় ফেজের হওয়ায় এই মুহুর্তে কোনো পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে অবিলম্বে বিদ্যালয়টির অবকাঠামো নির্মাণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।