• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৬ অপরাহ্ন |

ময়মনসিংহে সিনেমা হলে বোমা হামলার বিচার এক যুগেও শেষ হয়নি

image_109270_0সিসি ডেস্ক: আজ ৭ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ বোমা হামলা ট্রাজেডি দিবস। ২০০২ সালের এই দিনে ময়মনসিংহ শহরের ছায়াবাণী, অজন্তা, পূরবী ও অলকা- এই ৪টি সিনেমা হলে জেএমবি’র জঙ্গিদের সিরিজ বোমা হামলায় শিশু ও মহিলাসহ ১৮ জন নিহত হয়। আহত হয় শতাধিক দর্শক, যাদের বেশির ভাগই এখন পঙ্গু।

বোমা হামলায় হতাহতদের পরিবারগুলো বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। খেয়ে না খেয়ে কোনোরকমে দিন পার করলেও কেউ তাদের খোঁজ নেয় না। সাংবাদিকরা বছরে একবার তাদের খবর সংগ্রহ করতে গেলে এখন আর কথা বলতে চান না তারা। এদিকে দীর্ঘ একযুগেও বিচার কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় চরম ক্ষুব্ধ আহত ও নিহতদের স্বজনরা। তবে সম্প্রতি বোমা হামলার সবগুলো মামলা ময়মনসিংহের বিশেষ আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে আদালত সুত্রে জানা গেছে।

পুলিশ ও মামলা সুত্রে জানা যায়, ২০০২ সালের ৭ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ শহরের চারটি সিনেমা হলে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। বোমা হামলায় শিশু ও মহিলাসহ ১৮ জন নিহত এবং শতাধিক দর্শক আহত হয়। নিহতরা হলেন- সদর উপজেলার বয়রা পশ্চিম পাড়ার ইমরান (১৮), কালীবাড়ীর চরের নইম উদ্দিন (৩৫), মোফাজ্জল হোসেন(১৭) ও কামাল (২১), কৃষ্টপুর এলাকার শফিকুল ইসলাম (১৮), মাসকান্দা এলাকার তপন(১৯), দূর্গাপুর বিরিশিরির মলয় দারিং মঙ্গল (১৮), পাটগুদাম এলাকার হযরত(১৪), হালুয়াঘাটের সাকুয়াই গ্রামের নিখিল সরকার((৩৫), ঢাকার হাজারীবাগের জাহাঙ্গীর (১৮), বাঘমারা এলাকার জুয়েল(২১), আকুয়া’র মাহ্মুদা (২১), সুমন (১৫), ও সজীব (১৭), সেহড়ার মিন্টু (৩৫), ত্রিশালের দিলীপ (১৮), বাশবাড়ী কলোনী নতুন এলাকার নিলা (৮) এবং ব্রাহ্মনবাড়ীয়ার আইয়ুবপুর গ্রামের মাসুদ (২০)। প্রতি বছর ৭ ডিসেম্বর এলেই প্রিয়জন হারানোর শোকে কাতর হয়ে উঠে সিরিজ বোমা হামলায় হতাহতদের পরিবারগুলো। আজও চোখে ভেসে ওঠে সেদিনের দৃশ্য, বোমার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হাত-পায়ের চিহ্ন আর রক্তে রঞ্জিত সিনেমা হল-হাসপাতালের আঙ্গিনা। নিহতদের পরিবারে এখনো শোকের আহাজারি।

এদিকে বোমা হামলার ঘটনায় হতাহতদের পরিবার দূর্বিসহ জীবনৎযাপন করছে।  সরকারি-বেসরকারিভাবে অনেকেই নিহতদের পরিবার ও আহতদের পূনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

শহরের ভাটিকাশর গোরস্থানের খাদেম মোসলেম উদ্দিনের ছেলে রাজিব সেদিন অলকা হলে সিনেমা দেখতে গিয়ে বোমা হামলার শিকার হন। পঙ্গু রাজিব জানান, ‘‘ঈদের পর দিন অলকা  সিনেমা  হলে ছবি দেখতে গিয়ে বোমা হামলার শিকার হই। একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। একটি হাত দিয়ে কিছু করতে পারি না। কোনমতে বেঁচে আছি। ’’

অজন্তা সিনেমা হলে অপারেটর ফজল মিয়া পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বোমা হামলা তিনি দু’টি পা হারিয়ে এখন পঙ্গু ও নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘আমার আয়ে সংসার চলত। কতজন কত আশ্বাস দিয়েছে কিছুই পাই নি। আওয়ামী লীগ-বিএনপির কত নেতানেত্রী এসে আমাদের সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু কেউ কথা রাখেন নি। এখন খেয়ে না খেয়ে কোনো রকমে দিন পার করছি।”

বোমা হামলায় স্বামীকে হারিয়ে শহরের চামড়া গুদাম এলাকার মন্টু মিয়ার স্ত্রী প্রতিবন্ধী এক ছেলেসহ তিন সন্তান নিয়ে টিউশনি করে অতিকষ্টে সংসার চালান। তিনি বলেন, আমি একজন শিক্ষিত মহিলা। আমার একটা চাকরির ব্যবস্থা হলেও কোনোরকমে চলতে পারতাম। ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও আমার স্বামীর হত্যাকারীদের এখনো বিচার হলো না।

বোমা হামলায় অজন্তা সিনেমা হলের কর্মচারী শাহীন আলমের দুইটি পা উড়ে যায়। পাচঁ সদস্যের সংসাসের একমাত্র উপার্জনক্ষম হওয়ার জীবিকার তাগিদে কিছুদিন শহরের একটি প্রতিবন্ধী কমিউনিটি সেন্টারে সামান্য টাকা বেতনে হস্তশিল্পের কাজ করলেও এখন অটোরিকশা চালান। শাহীন জানান, ‘‘২০০২ সালেই আমার জীবন শেষ হয়ে গেছে। এখন খোলসটা বয়ে বেড়াচ্ছি। এতদিন গেল এখনো বিচারটাই হইলো না।’’

এদিকে বোমা হামলায় হতাহতদের পরিবারকে সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান। তিনি বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেককেই সহায়তা করেছি। এখন মন্ত্রী হয়েছি। আমার ফান্ড আছে। সামনে ফান্ড আসলে সবাইকে সহায়তা দেয়া হবে।”

এছাড়া মামলার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে মহামান্য আদালতের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, “বোমা হামলা করেছে জঙ্গিরা। আর বিএনপি সরকার আমাকে গ্রেফতার করে নির্যাতন করেছে। আমার দলীয় লোকজনকে অন্যায়ভাবে মামলায় জড়িয়ে গ্রেফতার ও হয়রানি করেছে। খালেদা জিয়ার নির্দেশে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন ও তৎকালীন সংসদ সদস্য দেলোয়ার হোসেন খান দুলু অন্যায়ভাবে মামলা দিয়ে আমাদের হয়রানি করেন।”

বোমা হামলার জন্য জেএমবিকে দায়ী করে ময়মনসিংহ জোনের সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম ২০০৭ সালের ৮ অক্টোবর আটটি মামলার তদন্ত শেষে জেএমবি’র আঞ্চলিক কমান্ডার নারায়ণগঞ্জের সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন ওরফে সজীব ওরফে সোহেল ওরফে তাওহীদ, জামালপুরের জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমন ওরফে মিজান ওরফে বোমা মিজান এবং ঠাকুরগাঁওয়ের আনোয়ার হোসেন ওরফে খোকা ওরফে শহীদ ওরফে ভাগিনা শহীদসহ বেশকয়েকজন জেএমবি সদস্যকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এ সময় এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক রাজনৈতিক সচিব সাবের হোসেন চৌধুরী, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যক্ষ মতিউর রহমান ও রয়টারের তৎকালীন সাংবাদিক এনামূল হক চৌধুরী, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুনতাসির মামুনসহ ৪৩ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

ময়মনসিংহ জজকোর্টের পিপি মো. ওয়াজেদুল ইসলাম জানান, ময়মনসিংহের আদালত থেকে বেশকয়েকটি মামলা ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানন্তর করা হয়েছিল। বোমা হামলার ঘটনায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল এবং জজকোর্টে চলমান সবগুলো মামলা গতমাসে ময়মনসিংহের বিশেষ আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এখন মামলা গতি পাবে। বেশ কয়েকজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “সাক্ষী না আসায় মামলার কার্যক্রমে ধীর গতি এসেছে। আদালতের ছূটি শেষ হলে আরো কিছু সাক্ষী করানো সম্ভব হবে। আশা করা হচ্ছে খুব দ্রুত বিচার কাজ শেষ হবে।”

নতুন বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ