সিসি নিউজ: স্বাধীনতার ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সঠিক জরিপ করতে পারেনি সরকার। স্বাধীনতার দুইদিন আগে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের মাধ্যমে এ নারকীয় হত্যাকাণ্ডে কতজন শহীদ হয়েছিলেন, সরকার এখনও তার হিসাব সম্পন্ন করতে পারেনি।
মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রণালয়েও এ-সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তালিকা নেই। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি হিসেবের মধ্যে গরমিল দেখা যায়। এসব তথ্যে শহিদ বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা ২৩২ থেকে এক হাজার ১১১। স্বাধীনতাযুদ্ধ-বিষয়ক গবেষকরা এক হাজার ১১১ জনের তালিকাকে সঠিক নয় বলে মনে করেন।
বাংলা একাডেমির ‘শহীদ বুদ্ধিজীবীকোষ’ গ্রন্থে লেখক, বিজ্ঞানী, শিল্পী, গায়ক, প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি ও বেসরকারি স্টাফদের বুদ্ধিজীবী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে বলে জানান চলচ্চিত্র তদন্ত সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান খান।
তৎকালীন পুলিশের তথ্য উদ্ধৃত করে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহারিয়ার কবির বলেন, ‘১৯৭২ সালের ২৮ মার্চ সারা দেশে শহীদদের পরিবারের সদস্যরা ৪২টি মামলা করেন। কিছু দিনের মধ্যেই এ মামলার সংখ্যা বেড়ে প্রায় শতাধিক হয়। আমাদের দুর্ভাগ্য, এখনও বুদ্ধিজীবী হত্যায় দায়ের করা মামলা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, চৌধুরী মইনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানকে বুদ্ধিজীবী হত্যার অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়। ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্ত চারজনই ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা ছিলেন। ট্রাইব্যুনাল আলবদর বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়ে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতার প্রমাণ পেয়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন। ইসলামি ছাত্রসংঘকে ট্রাইব্যুনাল আলবদর হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
স্বাধীনতার দুই দিন আগে পাকিস্তানি সেনারা দেশকে মেধাশূন্য করতে বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করেন। তাদের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করে এ দেশীয় দোসররা। ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি ঘাতকরা লেখক, বিজ্ঞানী, শিল্পী, গায়ক, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, স্থপতি, ভাস্করসহ দেশের খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে জাতিকে মেধাশূন্য করে দেয়।
ট্রাইব্যুনাল-১ আলবদর বাহিনীর প্রধান নিজামীকে গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ট্রাইব্যুনাল-২ মুজাহিদকে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়। অন্যদিকে ঢাকায় ঘাতক বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য আশরাফকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। অপারেশন ইনচার্জ মইনুদ্দিনকে পেশাজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসকসহ ঢাকায় ১৮ জনকে হত্যা করার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
নিজামী ও মুজাহিদের রায়ের বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। আশরাফ ও মইনুদ্দিন পলাতক। রাজাকার, আলবদর ও আল-সামস সদস্যদের বিচারের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার ১৯৭২ সালের ২৪ ডিসেম্বর নির্বাহী আদেশে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে বিচার কার্যক্রম শুরু করে। সারা দেশের অপরাধীদের বিচার করতে সে সময় ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। ঢাকায় ১১টি আর বাকিগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপন করা হয়।
শাহরিয়ার কবির বলেন, সরকারের উচিত জরিপের মাধ্যমে দ্রুত সারা দেশের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের একটি তালিকা করা। শহীদ পরিবারগুলোর সুবিচার নিশ্চিত করারও দাবি জানান তিনি। -নিউএজ