মাহবুবুল হক খান, দিনাজপুর: সাগর নয়, তবে রামসাগরের নামে বিশাল এক দিঘী রয়েছে দিনাজপুর সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নে। চাষের সুবাদে রয়েছে ওই দিঘীতে বিশাল সাইজের রুই কাতল মৃগেল এবং বিগহেডকাপসহ অন্যান্য জাতের মাছ।
গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) দিবাগত রাতে ওই সাগরে হানা দিয়ে রাতারাতি বাছাই করে তুলে নেয়া হয় তিন শতাধিক বিভিন্ন সাইজের মাছ। এদের একেকটির ওজন ২০ থেকে ৪০ কেজির মধ্যে। তুলে আনা মাছের ফ্রাইয়ের সাথে রসনা বিলাসে মাছ বিক্রির টাকায় ২টি খাসি কিনে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের সাথে ভুরিভোজ করেছেন জেলা প্রশাসনের সরকারি কর্মকর্তারা।
অনেকের মতে অর্ধকোটি টাকার মাছ দুইটি ট্রাকে করে জেলার বাইরে পাঠানো হয়েছে। এই মাছের টাকা কোথায় এবং কোন তহবিলে জমা হয়েছে কেউ জানেনা। প্রশাসনিকভাবে ৫ লাখ টাকার মাছ বিক্রি দেখানো হয়েছে। বন বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তা বলছেন, মাছ ধরার বিষয়ে তারা কিছুই জানেননা। তবে বিস্তারিত বিষয়ে মুখ খুলতে চাইছেননা সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় দিঘীতে জাল ফেলে মাছ ধরা শুরু করে পেশাদার একদল জেলে। চলে শুক্রবার (৮ মে) ভোর রাত পর্যন্ত। উঠানো হয় রুই কাতল বিগহেডসহ বিভিন্ন সাইজের তিন শতাধিক মাছ। দুই ট্রাক মাছ জেলার বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে সকালে শুরু হয় মাছ ভাগাভাগি। ভাগ পৌঁছানো হয়েছে জেলার আওয়ামীলীগসহ অঙ্গ সংগঠনের প্রথম সারির নেতাদের বাসায়। পরিস্থিতি আচ করে নিজে না গিয়ে লোক পাঠিয়ে বাড়ীতে মাছ আনান বেশ কয়েকজন আলোচিত নেতা। বাদ পড়েনি উল্লেখযোগ্য সরকারি কর্মকর্তার হাড়ি-বাড়ীও। এছাড়াও বেশ কয়েকটি মাছে ভাগ পান আওয়ামীলীগের স্থানীয় ইউনিয়ন এবং উপজেলা কমিটির নেতারা।
সাইজে সেরার (বড়) মধ্যে ১৮টি মাছ একাই গ্রহন করেন সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাহী অফিসার আব্দুর রহমান। কিছু মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে অবশিষ্ট মাছের টাকায় কেনা হয় দুইটি খাসি। মাছের সাথে খাসির মাংস দিয়ে রামসাগর স্পটে ভুরিভোজে মেতে উঠেন দলের নেতাকর্মীসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। খালি পেটে ফিরেনি কেউ। খাবারে অংশ গ্রহণকারী পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একজন কর্মী জানান, দলের অনুগত নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে খাবারে শরিক হয়েছিলেন আওয়ামীলীগের কোতয়ালী কমিটির সভাপতি ইমদাদ সরকার, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ফরিদুল ইসলাম এবং সহদোর জয়ন্ত মিশ্র এবং সুশান্ত মিশ্র, রেজাউর রহমান, নুরুল ইসলাম, মোমিনুল ইসলামসহ প্রথমসারির নেতাকমীরা। এছাড়াও জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রেজাউল করিম, একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, ৫জন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট, সদরের সহকারি ভূমি কর্মকর্তা (এসিল্যান্ড), জেলা স্যাটেলম্যান কর্মকর্তা এবং বন বিভাগের দুইজন কর্মকর্তাসহ আরো অনেকে।
মাছ ধরা, বিক্রি এবং ভোজের অনুষ্ঠান সম্পর্কে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. এনামুল হক জানান, সদরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাছ ধরা এবং বিক্রি কমিটির আহবায়ক। তবে তিনি ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেননা বলে জানান।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুর রহমান জানান, মাছ তুলে শুক্রবার ভোরে প্রকাশ্যে নিলামে ৬ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। টাকার অংক সঠিক বলে দাবি করলেও মাছের পরিমাপ জানাননি তিনি। কেউ যাতে মাছ নিয়ে যেতে না পারে এজন্য ৫জন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের পাশাপাশি কোতয়ালী থানার পুলিশও উপস্থিত ছিল। এর মধ্যে হয়তঃ দুই একটা চুরি হয়ে যেতে পারে। চুরি ঠেকানোর দায়িত্ব ছিল পুলিশের।
এ ব্যাপারে কোতয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) আবুল হাসনাত খান সাংবাদিককে জানান, রামসাগরে মাছ ধরার বিষয়ে কোতয়ালী পুলিশকে কিছুই জানানো হয়নি। নিয়মিত অংশ হিসেবে ওই এলাকায় টহল দেয়া ছাড়া কিছু জানা নেই তার।
মাছ ধরার বিষয়টি স্বীকার করে জেলা প্রশাসক আহমেদ শামীম আল রাজী জানান, প্রকাশ্য নিলামে প্রায় ৭ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করা হয়েছে। এর মধ্যে হয়তঃ আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা কিছু মাছ কিনে নিয়ে গেছে।
জানা যায়, দেশের ও প্রত্নতাত্তিক নিদর্শনের তালিকায় রয়েছে রামসাগরের নাম। ১৭৫০ সালের দিকে বিশাল ওই দিঘী খনন করেন তৎকালিন রাজা রামনাথ। মাঝে নানা চড়াই উত্তরাই পেরিয়ে আবারো রামসাগরের তত্তাবধানে রয়েছে সামাজ্যিক বন বিভাগ। বর্তমানে দিঘীর পাড়ে গড়ে উঠেছে জাতীয় উদ্যান। আগে প্রতিবছর রমজানে রামসাগরে মাছ তুলে রোজাদারদের কাছে তুলনামূলক দামে বিক্রি করতো বন বিভাগ।
সামাজ্যিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আলী কবির জানান, রামসাগর বন বিভাগের অধীনে থাকলেও তারা শুধু পাড়ের গাছগাছালির তদারককারি করেন। খাস খতিয়ানভুক্ত বলে জলাধার জেলা প্রশাসনের অধীনে। মাছ ধরার বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
এদিকে রাম সাগরের মাছ নিয়ে হরিলুটের ঘটনা সমগ্র শহরে চলছে সমালোচনা ঝড়। দিনাজপুরের মানুষ এই ঐতিহ্যবাহী রাম সাগরের মাছ হরিলুটের ঘটনাটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানিয়েছেন।