সিসি ডেস্ক: একের পর এক কূটনৈতিক সাফল্যে উচ্ছ্বসিত সরকার। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক একটি বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরে তারা এখন অনেকটাই ফুরফুরে। সর্বশেষ ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি এবং চীনের সঙ্গে ৬টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক বিনিময় হওয়ায় স্বস্তির পালে আরো হাওয়া লেগেছে
পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের পর অনেকটাই অস্বস্তিতে ছিল সরকার। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা পাত্তা না পেলেও চাপ ছিল আন্তর্জাতিক মহলের। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই একের পর এক কূটনৈতিক সাফল্যে উচ্ছ্বসিত সরকার। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক একটি বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরে তারা এখন অনেকটাই ফুরফুরে। সর্বশেষ ভারতের সঙ্গে স্থল সীমান্ত চুক্তি এবং চীনের সঙ্গে ৬টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক বিনিময় হওয়ায় স্বস্তির পালে আরো হাওয়া লেগেছে।
সরকার এবং আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মহল, বিশেষ করে দাতারাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক আগেও ছিল। তবে দীর্ঘ চার দশক পর প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে স্থল সীমান্ত চুক্তি এবং চীনের সঙ্গে বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ায় সম্পর্কে নতুন মাত্রা এসেছে। ক্ষমতাসীনদের আশা, আগামী ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকে কেন্দ্র করে ছিটমহল বিনিময়ের পাশাপাশি তিস্তা চুক্তিতে ইতিবাচক সাড়া মিললে দেশটির সঙ্গে আওয়ামী সরকারের সম্পর্কের নেতিবাচক সব বাধা অপসারিত হবে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্মোচন হবে নতুন অধ্যায়।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম যায়যায়দিনকে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে চুক্তি সম্পাদন আর তার কন্যা শেখ হাসিনার হাতে বাস্তবায়ন_ এ ধরনের ঐতিহাসিক সীমান্ত চুক্তি ইতিহাসে বিরল। শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বের কারণেই কয়েক দশক ধরে ঝুলে থাকা এই চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে। সময়ের ব্যবধানে তিস্তা চুক্তিও হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নাসিম দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সব সময়ই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। ক্ষমতায় থাকাকালে বঙ্গবন্ধু এটা করেছিলেন, বর্তমানে শেখ হাসিনাও করছেন। স্থল সীমান্ত বিনিময়ের পাশাপাশি চীনের সঙ্গে চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টির জন্যও শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত একতরফা নির্বাচন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোও নিন্দা ও হতাশা প্রকাশ করে। নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ না থাকায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের তাগিদ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। নির্বাচনে মানুষের আকাঙ্ক্ষার বিশ্বাসযোগ্য প্রতিফলন ঘটেনি উল্লেখ করে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে দ্রুত সংলাপে বসার আহ্বানও জানায় দেশটি। নির্বাচনে মানুষের ভোটের অধিকার রক্ষা হয়নি দাবি করে হতাশা প্রকাশ করেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনও। একই বক্তব্য দেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইউ), যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সুইডেন, ডেনমার্ক এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও ভোট পর্যবেক্ষক কমিটিগুলো। এতে ক্ষমতায় থেকেও অনেকটাই চাপে পড়ে ক্ষমতাসীনরা। অস্বস্তি সৃষ্টি হয় দল এবং সরকারের ভেতরে-বাইরে।
কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সম্পর্কের সেই অনাস্থার দেয়াল অনেকটাই সরিয়ে ফেলেছে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা শেখ হাসিনার সরকার। শুধু তা-ই নয়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবস্থা এতটাই পরিবর্তন হয়েছে যে, দশম জাতীয় নির্বাচন নিয়ে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানানো দেশগুলোও এখন সরকারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করতে সম্মত হচ্ছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বির্তকিত নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার প্রায় ৪ মাস পর রাষ্ট্রীয় প্রথম সফরে জাপানে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই সময় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে ৬০০ কোটি ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয় জাপান। এছাড়া বঙ্গোপসাগর ঘিরে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার ব্যাপারে সম্মত হয় দুই দেশ। পরে পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সরকারের প্রতি জাপানের দৃষ্টিভঙ্গি ও সমর্থন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো। ভবিষ্যতে তা আরো এগিয়ে যাবে।
শেখ হাসিনার ওই সফরের পর মাত্র সাড়ে তিন মাসের ব্যবধানে ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা সফরে আসেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। সেই সময় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্যপদের নির্বাচনে জাপানের সমর্থনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেয় বাংলাদেশ। অন্যদিকে, জাপানের প্রধানমন্ত্রী আগামী ৪-৫ বছরে বাংলাদেশকে ৬০০ কোটি ডলার সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপানি সহায়তা কোনো সুনির্দিষ্ট পরিমাণে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি জাপানি বিনিয়োগের লক্ষ্যে বাংলাদেশে শুধু জাপানের জন্য একটি পৃথক একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। পরে উভয় দেশের দেয়া যৌথ বিবৃতিতে দুই প্রধানমন্ত্রী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের উন্নয়নে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
জাপান সফরের পর মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ৮ জুন চীন সফরে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বাক্ষর করেন ৫টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক। ওই চুক্তিতেও জাপানের মতো চীনের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশে একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
তবে ভারতের সঙ্গে সরকারের ‘স্থল সীমান্ত চুক্তি’ কূটনৈতিক সাফল্য অর্জনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বিল ভারতীয় পার্লামেন্টে পাস হওয়ায় ক্ষমতাসীনরা জনগণের কাছে ঐতিহাসিক সাফল্য দেখানোর সুযোগও পেয়েছেন। অর্জন করেছেন প্রায় ৬০ হাজার ছিটমহলবাসীর আস্থা ও বিশ্বাস। আগামী ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে হাসিনা-মোদি স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে ছিটমহল বিনিময় এবং সীমান্ত প্রটোকল বাস্তবায়ন হবে। এছাড়া খুব শিগগিরই তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন করার দিকে এগোচ্ছে উভয় দেশ। ইতোমধ্যে কলকাতা প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, শিগগিরই তিস্তা চুক্তি সম্পাদিত হবে। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সহযোগিতা পাওয়া যাবে। ক্ষমতাসীনদের ভাষ্য, সীমান্ত ছিটমহল বিনিময় এবং তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে ইতিবাচক আশ্বাস পাওয়া গেলে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হতে কোনো বাধাই থাকবে না।
এসব বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন যায়যায়দিনকে জানান, সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন হলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সম্পর্ক অনেক ধাপ এগিয়ে যাবে, যদিও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনো কিছু বিষয় বাকি রয়েছে।
তিনি মনে করেন, বিগত সরকারের সময় এই বিজেপি স্থল সীমান্তের বিরোধিতা করেছিল। এখন সেই বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদি সরকারের সময় এই চুক্তি বাস্তবায়ন অনেকটাই অবিশ্বাস্য। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, বিজেপি আগের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক বজায় রাখতে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পালন করছে।
অন্যদিকে, শিক্ষা, গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি জোরদারে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ৬টি সমঝোতায় স্বাক্ষর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। গত ২৪ মে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী লিউ ইয়ানদংয়ের উপস্থিতিতে স্বাক্ষর হওয়া ওই চুক্তির মধ্যে তিনটি সমঝোতা স্মারক, দুটি সহযোগিতা চুক্তি এবং একটি সম্মতিপত্র রয়েছে। উভয় দেশের নিজ নিজ বিভাগের প্রধান ওই চুক্তি ও সমঝোতায় স্বাক্ষর করেন। দুই দেশের এই বোঝাপড়া শিক্ষা, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা।
এদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিশালী এই দেশগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সরকারের উত্তরোত্তর সম্পর্ক বৃদ্ধিতে আওয়ামী লীগ শিবিরে উচ্ছ্বাস বইছে। ফুরফুরে ও নিশ্চিন্ত মেজাজে রয়েছেন হাই কমান্ডসহ দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। দলীয় নেতারা বলছেন, সীমান্ত বিজয়ে প্রধানমন্ত্রীর কূটনৈতিক সাফল্যে শুধু আওয়ামী লীগ ও সমমনারা নয়, সারাদেশের মানুষ আজ উল্লসিত, যার বহিঃপ্রকাশ শুক্রবার রাজধানীর সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেয়ার মাধ্যমে ঘটানো হবে।