সাহিত্য ডেস্ক: ‘নীলক্ষেতে পুরোনো বই দেখতে গিয়ে একদিন হঠাৎ-ই আহমদ ছফার ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’ বইটা চোখে পড়ে। পাতা উল্টে দেখি, বইটা তিনি ১৯৯৬ সালে অটোগ্রাফসহ উপহার দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত একজন কবি ও সাংবাদিককে। সেই বই এখানে, আমি বিস্মিত হই! বইটা কিনে ফেলি। আমার ভেতরে চাপা উত্তেজনা বইতে থাকে, খুবই আনন্দিত হই। এরপর থেকে নীলক্ষেতে যাওয়ার অভ্যাসটা নিয়মিত হয়ে গেছে। ওদিকে গেলেই একবার পুরোনো বইয়ের দোকানে ঢুঁ মেরে আসি।’ বইয়ের পাতায় কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফার একটি জীবন্ত অটোগ্রাফ পেয়ে যাওয়ার গল্পটি ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জহুরুল ইসলামের।
এমন অনেক ইতিহাস এখনো খুঁজে পাবেন নীলক্ষেতের পুরোনো বইয়ের দোকানে। সতর্কতার সঙ্গে খুঁজলেই পাবেন সেসব রত্ন। যেগুলোর কোনটি বইয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করবে, কোনটি জ্ঞানকে করবে শাণিত।
ঢাকায় পুরোনো বই পাবেন মীরপুর ১০ নম্বর, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের বিপরীত পাশে, নিউ মার্কেট এলাকার নীলক্ষেত এবং বাংলাবাজারে। তবে, নীলক্ষেতের বাজারটাই সবচেয়ে জমজমাট। সিটি করপোরেশন মার্কেটের বিপরীত পাশে, নীলক্ষেত মোড় থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ’ পর্যন্ত বিস্তৃত নীলক্ষেতের পুরোনো এ বইয়ের বাজার। প্রায় ৭০ টির মতো দোকান আছে এখানে।
গত সোমবার ঘুরতে গিয়ে সেখানে কথা হয় নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী সাবিকুন নাহারের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘সাধারণত পাঠ্যবই কিনি। মাঝেমধ্যে গল্প, কবিতা, সাধারণ জ্ঞান এবং বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক বইও কিনি।’
নীলক্ষেতের পুরোনো বই ব্যবসায়ীরা জানালেন, বইগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। সবই যেহেতু পুরোনো বই, তাই এগুলো কেউ না কেউ বিক্রি করার পরই নীলক্ষেতের বাজারে আসে। সাধারণত ভাঙারির দোকান, বাংলাবাজার ও ফেরিওয়ালার কাছ থেকেই বইগুলো বাজারে ওঠে। মাঝেমধ্যে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গ্রন্থাগার থেকেও পুরোনো সংস্করণের বইগুলো আনা হয়। অনেকে আবার ব্যক্তিগত সংগ্রহের বইও বিক্রি করেন।
পুরোনো বই বিক্রেতা শাহাব উদ্দিন বললেন, ‘১৫ বছর হইয়া গেছে পুরান বই বেচতাছি। আমরা সব ধরনের বই-ই বেচি। এখানে পাওয়া যাইবো না এমন কোনো বই নাই। যেসব বই আর নতুন পাওয়া যাইবো না, সেগুলার পুরান সংস্করণও এইখানে আছে। তয়, খুঁজে নিতে হইবো।’
নীলক্ষেতের এ বাজারে মিলবে ইংরেজি মিডিয়াম এবং বাংলা মিডিয়ামের সকল বই। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যন্ত সকল বিভাগের সব ধরনের বইয়ের দেখা পাবেন এখানে। এমনকি গবেষণার ওপরও পাওয়া যাবে নানা রকম বিষয়ভিত্তিক বই। পাঠ্যবই ছাড়াও রয়েছে গল্প, কবিতা, কৌতুক, সাধারণ জ্ঞান, চাকরি ও ভর্তির প্রস্তুতিমূলক সহায়ক বই। পাঠ্যবইয়ের বাইরে বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন ইংরেজি বইও নজরে পড়বে এ বইয়ের বাজারে।
জাকির হোসেন নামে আরেকজন বিক্রেতা বলেন, ‘কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাই বেশি আসে। এখানে আইসা কেউ বই বেচে দেয়, কেউ কেনে। চাকরি, ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক বই আর পাঠ্যবই-ই বেশি বিক্রি হয়। গল্পের বইও বেশ চলে।’
ঘুরতে ঘুরতে একটি পুরোনো ইংরেজি বইয়ের দোকানে দেখা হলো বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর-পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক সারোয়ার জাহানের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘আগে খুব বেশি আসতাম, এখন সেরকম সুযোগ পাই না, তবে মাঝেমধ্যেই আসি। এমন অনেক বই আছে যেগুলো এখানে ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। মূলত বিষয়ভিত্তিক বই-ই কিনি। এই যেমন-পেশাগত পদ্ধতি, ধর্মীয় ইতিহাস, পরিসংখ্যান, পরিবহন ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং নগর-পরিকল্পনা। মনে ধরলে গল্প-কবিতার বইও কিনি।’
মঙ্গলবার বাদে সপ্তাহের সব দিনই খোলা থাকে নীলক্ষেতের পুরোনো এ বইয়ের বাজার। প্রতিদিন সকাল ৯ টা-১০টার মধ্যেই বাজার জমে ওঠে। খোলাও থাকে রাত ৯ টা-১০টা অবধি।