সিসি ডেস্ক: ৯২ ভাগ মুসলমান অধ্যুষিত বাংলাদেশের মাদরাসা ও ইসলামি শিক্ষার উন্নয়ন-গবেষণায় সৃষ্টি হলো ঐতিহাসিক মাইলফলক। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে শুরু হলো ইসলামি উচ্চশিক্ষার নতুন যাত্রা। এ দেশের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ ও ইসলাম প্রিয় মানুষ এই প্রত্যাশায় ছিল বছরের পর বছর অপেক্ষা-প্রতীক্ষা। আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলো স্বপ্নের ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরুর নির্দেশনা জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন থেকে মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন, ফাজিল/স্নাতক, কামিল/স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষাক্রম/পাঠ্যপুস্তক অনুমোদন, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, মাদরাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষাঙ্গনগুলোর তদারকি ও পরিবীক্ষণ এবং পরীক্ষা পরিচালনাসহ সবকিছু তত্ত্বাবধান করবে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী এখন থেকে মাদরাসা শিক্ষার ফাজিল (পাস), ফাজিল (সম্মান) এবং কামিল (এমএ) মাদরাসাসমূহের যাবতীয় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হবে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। এ বছর থেকেই মাদরাসা শিক্ষা ধারার ফাজিল/স্নাতক ও কামিল/স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ডিগ্রি প্রদান করবে এই বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা-২ থেকে গতকাল (মঙ্গলবার) উপ-সচিব লায়লা আরজুমান্দ বানু স্বাক্ষরিত জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার অধীনে পরিচালিত ফাজিল পাস ও সম্মান এবং কামিল মাদরাসাসমূহের ভর্তি ও পরীক্ষা গ্রহণসহ যাবতীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যস্ত ও পরিচালনা করার ইসলামি শিক্ষায় মাইলফলক নির্দেশনা প্রদান করা হলো। ফলে ২০১৫-১৬ (চলতি) শিক্ষাবর্ষের ফাজিল, কামিলের ভর্তি ও পরীক্ষা আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেয়া হবে। এর আগে গত ২৩ আগস্ট ধানমন্ডিতে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। যাদের আন্দোলনের ফলে এই ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ লাভ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরুর ঘোষণায় মাদরাসা শিক্ষকদের সেই একক সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সকল নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে উৎসবের আবহ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরুর নির্দেশনা দেয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সম্পৃক্ত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক মোবারকবাদ জানিয়েছেন এ দেশের আলেম-ওলামা ও পীর-মাশায়েখগণ এবং জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি ও দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক আলহাজ এ এম এম বাহাউদ্দীন ও মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা শাব্বীর আহমদ মোমতাজী। মাদরাসা শিক্ষকদের এই নেতৃদ্বয় বলেন, দেশের পীর-মাশায়েখ ও আলেম-ওলামাদের শত বছরের প্রতীক্ষিত ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন ও সার্বিক দায়িত্ব অর্পণ করে বর্তমান সরকার ইসলামপ্রীতি বিশেষ করে মাদরাসা শিক্ষার প্রতি আন্তরিকতার দৃষ্টান্ত পুনঃস্থাপন করল। আমরা আশাবাদী বিগত দিনের ন্যায় বর্তমান সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সর্বদাই মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাবে।মাদরাসা শিক্ষার ফাজিল ও কামিলের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম এতদিন কুষ্টিয়ার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হতো। এখন থেকে এর সকল কার্যক্রম পরিচালিত হবে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। দেশে বর্তমানে ২০৫টি কামিল মাদরাসা, ৩১টি ফাজিল (সম্মান), এক হাজার ৪৯টি ফাজিল (অনার্স/পাস) মাদরাসা এবং তিনটি সরকারি মাদরাসা রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫ লাখ ৯৮ হাজার ৩১ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত রয়েছে। যার মধ্যে এক লাখ ৯৭ হাজার ৩৮৫ জন ছাত্রী। এসব মাদরাসায় শিক্ষাদান করছেন ২২ হাজার ৯২১ জন শিক্ষক। শত বছর ধরে এ দেশের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ এবং ইসলাম প্রিয় মানুষ ইসলামি শিক্ষার উন্নয়নের জন্য ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা দাবি জানিয়ে আসছিলেন। মাদরাসা শিক্ষকদের সর্ববৃহৎ সংগঠন জমিয়াতুল মোদার্রেছীন বহু বছর যাবৎ মাদরাসা শিক্ষার জন্য পৃথক একটি অ্যাফিলিয়েটিং ক্ষমতাসম্পন্ন ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মাদরাসা শিক্ষা আধুনিকায়নের ঘোষণা দেয়। শিক্ষানীতিতে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে দ্রুত এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের নেতৃবৃন্দ। প্রধানমন্ত্রী তাদের দাবির প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেন। গত ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের নেতৃবৃন্দ এক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের নেতৃবৃন্দসহ উপস্থিত আলেম-ওলামাদের সাথে আলোচনার পর এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী গত ৬ আগস্ট ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১২ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা কমিটি। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর ২০১৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয় ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ বিল-২০১৩। বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। কোনো ধরনের বিরোধিতা ছাড়াই বিলটি অনুমোদন করেন জাতীয় সংসদের সদস্যগণ। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, দীর্ঘদিন থেকে দেশের আলেম সমাজের আন্দোলন ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে দেশের আলেম সমাজের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে। তিনি বলেন, ব্রিটিশ সরকার, পাকিস্তান সরকার এমনকি বিগত দিনে বাংলাদেশের কোনো সরকারও তাদের এই দাবি বাস্তাবায়ন করেনি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আলেমদের সাথে কথা বলে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা জানান। মন্ত্রী বলেন, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর মাধ্যমে এ দেশের আলেম-ওলামাদের স্বপ্ন, আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন থেকে মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন, ফাজিল/স্নাতক, কামিল/স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষাক্রম/পাঠ্যপুস্তক অনুমোদন, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, মাদরাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষাঙ্গনগুলোর তদারকি ও পরিবীক্ষণ এবং পরীক্ষা পরিচালনাসহ সার্বিক তত্ত্বাবধান করবে।জানতে চাইলে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আহসান উল্লাহ বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতি তাকিয়ে ছিল সারাদেশের শিক্ষক, শিক্ষার্থী তথা গোটা আলেম সমাজ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। তাদের মাধ্যমেই এ দেশের মাদরাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে সূচিত হলো এক নতুন যুগের। অবসান হলো এ দেশের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখদের শত বছরের অপেক্ষার। যারা এতদিন পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছিলেন। তিনি বলেন, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে এ দেশে প্রকৃত আলেম ও ধর্মতত্ত্ববিদ তৈরি হবে। একইসাথে বিশ্বমানের মুফাস্সির, মুহাদ্দিস ও ফকিহ্ বের হয়ে আসবে। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর দিনে মাদরাসা শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি আলহাজ এ এম এম বাহাউদ্দীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খানকে আন্তরিক মুবারকবাদ জানিয়েছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে অগ্রণী ও সংগ্রামী ভূমিকার জন্য গভীরভাবে স্মরণ করেছেন জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সাবেক মন্ত্রী, দৈনিক ইনকিলাবের প্রতিষ্ঠাতা প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ আলহাজ মাওলানা এম এ মান্নান (রহ.)কে। এছাড়া ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে দিন-রাত নিরলস পরিশ্রম করার জন্য অভিনন্দন ও মুবারকবাদ জানিয়েছেন জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা শাব্বীর আহমেদ মোমতাজী এবং জমিয়াতের সকল স্তরের নেতা-কর্মীকে। জমিয়াত সভাপতি বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত আন্তরিক ও নিরলস প্রচেষ্টা ছিল। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে একাই প্রতিটা স্তরে কাজ করেছেন। বিশেষ করে জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সাথে একাগ্রচিত্তে কাজ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। মন্ত্রীকে সহযোগিতা করেছেন শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান। এ এম এম বাহাউদ্দীন বলেন, সমাজে এখন নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। সবক্ষেত্রে সৎ, ঈমানদার, দক্ষ ও যোগ্য মানুষের অভাব। আর এর মধ্যে ইসলাম নিয়ে যারা কথা বলে তাদের অধিকাংশই রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৬ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদেরকে নিয়ে যথাযথভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারলে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ইসলামি শিক্ষা নয়, সমাজে নৈতিকতার যে অবক্ষয় তৈরি হয়েছে তা পূরণ করতে সক্ষম হবে। একই সাথে সৎ, ঈমানদার, দক্ষ ও যোগ্য মানুষ তৈরির মাধ্যমে শান্তির ধর্ম ইসলামকে এগিয়ে নিতে পারবে। সরকার ও জমিয়াতুল মোদার্রেছীন একত্রে কাজ করলে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বে অন্যতম মডেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা সম্ভব হবে।