ঢাকা: ‘বাংলাদেশকে হত্যা-সন্ত্রাস ও ঘৃণার চোরাবালিতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ভয়ের রাজত্ব ঠেকাতে আরো বেশি কথা প্রতিবাদ হতে হবে।’ কবি-লেখক-শিল্পী সমাবেশে এসব কথা বলেছেন আলোচকরা। এই সমাবেশে দ্বিদলীয় চক্রের রাজনৈতিক খেলায় দেশ ও জনগণকে বলি করা হচ্ছে বলে জনগণকে সতর্ক করা হয়। শুক্রবার বিকাল চারটায় রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। একের পর এক লেখক-প্রকাশকদের নৃশংসভাবে হত্যা ও হামলার প্রেক্ষিতে গঠিত কবি-লেখক-শিল্পী সমাবেশ এই আয়োজন করে। সমাবেশ শেষে এক বিবৃতিতে এসব জানানো হয়।
সমাবেশে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আজ চাপাতির আক্রমণে ও সরকারি নিপীড়নে মুক্তস্বরকে রূদ্ধ করা হচ্ছে। সরকার এগুলো হতে দিচ্ছে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার স্বার্থে। পাশাপাশি, দেশি ও বিদেশি শক্তি ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বাংলাদেশকে বিপদের সুড়ঙ্গের দিকে টেনে নিচ্ছে। বিরোধী দলের ভূমিকাও কোনো অংশে কম ভয়াবহ নয়।’ তিনি এই ভয়ের পরিস্থিতি মোকাবেলায় লেখক-শিল্পীদের আরো সরব ও সোচ্চার থাকার আহবান জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের নীরবতা অপশক্তিকে আরো উৎসাহিত করতে হবে। তাই আমাদের কলম ও কণ্ঠ সবভাবে আরো জোরদার করবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘একদিকে সুন্দরবনসহ দেশের খনিজ ও কৌশলগত সম্পদকে পরাশক্তির কাছে বিকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে এর বিরুদ্ধে যাতে আন্দোলন না হয় তার জন্য জনগণকে হত্যা-সন্ত্রাস ও ঘৃণার চোরাবালিতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।’ অধ্যাপক ফাহমিদুল হক বলেন, ‘বিভেদ আমাদের কোথাও এগিয়ে নেবে না। এই সময়ে ঐক্যবদ্ধ না হলে চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন থাকবে না, তেমনি জাতীয় অস্তিত্বও ঝুঁকিতে পড়বে।’ ফারুক ওয়াসিফ বলেন, ‘দ্বিদলীয় দোনলা বন্দুক আজ কেবল দেশের দিকেই তাক করা নাই, দুই দল দেশ ও জনগণের দায়িত্ব ছেড়ে সর্বনাশের রাজনীতিকেই আরো শান দিচ্ছে। দেশের বিবেক হিসেবে পরিচিত খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই আত্মবিক্রয় করে বসে আছেন। যারা আস্তিক-নাস্তিকে তরুণদের বিভক্ত করছেন, তারা বাংলাদেশের বিপক্ষেই কাজ করছেন। আজকের তরুণদের এই সর্বনাশা বিভেদের খেলাকে রুখে দিতে হবে।’ কবি আহমেদ স্বপন মাহমুদ বলেন, ‘বুদ্ধিবৃত্তি কিংবা রাজনীতি কোনোভাবেই জনগণের বিপক্ষে পরিচালিত হতে পারে না। জনগণের কণ্ঠস্বর হওয়ার দায়িত্ব আজ তরুণতর নিষ্ঠাবান লেখক-শিল্পীদের সামনে। বিচারহীনতা, পারস্পরিক অভিযোগের বিষাক্ত হাওয়ায় জনগণের দমবন্ধ হয়ে আসছে।’ কবি অনিকেত শামীম বলেন, ‘সময়ের ডাকে লেখক-শিল্পীদের নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে আসা জরুরি। আশা করি সারা দেশের এই প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়বে এবং আমাদের অগ্রজ লেখকেরা সুবিধাবাদ থেকে বেরিয়ে এসে ভারতের লেখক-শিল্পীদের মতো রাষ্ট্রীয় পুরস্কার বর্জন করে জনগণের কাতারে নেমে আসবেন।’ রাখাল রাহা বলেন, ‘আমরা আমাদের গ্রন্থ পুড়িয়ে সকল মানুষের শুভবুদ্ধির আলো জ্বালাতে চাই। আমাদের এই প্রতিবাদ চলবে জমায়েত, মতবিনিময় এবং প্রকাশনার মাধ্যমে।’ প্রতিবাদ সমাবেশে আগতরা লেখক-কবি-শিল্পীরা। ছবি: বাংলার চোখ সমাবেশ শেষে লেখকেরা নিজেদের বই পুড়িয়ে ‘গ্রন্থবহ্নি প্রতিবাদ’ জানান। আরো বক্তব্য রাখেন প্রাবন্ধিক ও প্রকাশক ফিরোজ আহমেদ, শিল্পী অরূপ রাহী প্রমুখ। এছাড়া সংহতি জানিয়ে উপস্থিতি ছিলেন অর্থনীতিবিদ সুজিৎ চৌধুরী, কথাসাহিত্যিক পারভেজ হোসেন, কবি জুয়েল মাজহার, কবি মুজিব মেহদী, কবি কামরুজ্জামান কামু, সাহিত্যিক শাহনাজ নাসরীন, কবি মামুন খান, কবি রহিমা আফরোজ মুন্নী, কবি রওশন আরা মুক্তা, রুহুল বাশার চঞ্চল এবং সাংবাদিক যিশু মোহাম্মদ। এছাড়া নৃবিজ্ঞানী নাসরিন সিরাজ ও অভিনেত্রী রীতু সাত্তারসহ তরুণ লেখক ও সংস্কৃতিদের উল্লেখযোগ্য অংশ সমাবেশে যোগ দেন।