সিসি ডেস্ক: জিএম কাদের। পুরো নাম গোলাম মুহম্মদ কাদের। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য। মহাজোট সরকারের সাবেক মন্ত্রী। জাতীয় সংসদের সাবেক তিনবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছোট ভাই। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মজীবন শুরু হলেও ভাই এরশাদের ক্ষমতা ছাড়ার পরই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনে পরিচালক থাকা অবস্থায় ওএসডি হন। পরে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে ১৯৯৬ সালে লালমনিরহাট-৩ আসন থেকে জাপা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সেই থেকে রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। জাতীয় পার্টির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি, পৌর নির্বাচন, পার্টির চেয়ারম্যান, জঙ্গিবাদ, স্বৈরতন্ত্র ইত্যাদি বিষয় নিয়ে রাজধানীর উত্তরা বাসায় বাংলামেইল২৪ডটকম এর স্টাফ করেসপন্ডেন্ট কামাল মোশারেফের সঙ্গে তার দীর্ঘ আলাপের চুম্বক অংশ পাঠকের সামনে তুলে ধরা হলো :
এবার পৌর নির্বাচনে সবগুলো এলাকায় প্রার্থী দিতে পারলেন না, এ অবস্থায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপনাদের একক নির্বাচন করা কি সম্ভব?
সামনের বছর বা কোনো বছর একটা নির্বাচন হবে কিংবা ১৭, ১৮ কিংবা ১৯ সালে কোনো বছরে একটা নির্বাচন হবে। সেখানে কিন্তু জাতীয় পার্টির ক্যান্ডিডেট পাওয়া কঠিন হবে- এই রাজনীতি যদি কনটিউনিউ করে। প্রার্থীরা বলে আমাদের রাজনীতি কী? আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র স্পষ্ট রাজনীতি আছে। ভালো হোক, খারাপ হোক। আমাদের স্পষ্ট কোনো রাজনীতি নেই। অস্পষ্ট রাজনীতি।
জিএম কাদের, জাতীয় পার্টি, জাপাআমরা আমাদের কথা বলি, আমাদের আমলে সুশাসন ছিল। আরো সুশাসন দিব। এই সব কথা ভোটারদের বলা হয়, ৮০ পার্সেন্ট ভোটার সুশাসন দেখেনি। আর যারা দেখেছে, তারাও বিশ্বাস করে না, এখন দিতে পারবো। কারণ আমাদের সেই রকম ক্যারেক্টার নাই, বা সেই রকম শক্তি আছে বলে মানুষের মধ্যে ধারণা নাই। ন্যাশনাল ইলেকশনে আমরা যদি কারো সাথে অ্যালায়েন্স করি, এরশাদ সাহেবের পারসোনাল কারণে বা আমাদের দলটা যেহেতু আমাদের জাতীয় দল; সব জায়গাতেই লোক আছে, ১০-১৫ জন লোক আছে, ২-৪ শ লোক হলেও আছে। কাজেই অনেকে হয়তো অ্যালায়েন্স করতে পারে। সব জায়গাতেই লোক আছে। বা একটা নাম আছে। কারণ যেহেতু জাতীয় জাতীয় চারটা দলের মধ্যে একটা। জামায়াত এখন বাদ হয়ে গেছে। এখন তিনটি দল। তার মধ্যে আমরা যেইটা থকবো, ওইটা একটা ভাগ হবে। সেই হিসেবে আমাদের কিছু ক্যানডিডেট আসতে পারে। না হলে আমরা যে এককভাবে নির্বাচনে প্রথম যে, দুই বার পাস করেছিলাম, সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। কারণ এখন জাতীয় পার্টি যে অবস্থা, তাতে প্রার্থীই পাওয়া যাবে না।
পার্টির চেয়ারম্যান বিভিন্ন সমাবেশে বলেন আমরা একক নির্বাচন করবো এবং ৩০০ আসনেই প্রার্থী দিবো। এটা কীভাবে বলেন? আওয়ামী লীগ কি চায় না আপনারা তাদের সাথে থাকেন?
প্র্যাকটিকাল ভাবে জাতীয় পার্টি ৩০০ আসনে নির্বাচন করা ইম্পসিবল। তোমাকে এর আগে এই কারণটা বললাম। আমি মনে করি, এরশাদ সাহেবের একক নির্বাচনের বিষয়টি সরকারের স্ট্যাটাস। উনি যেটা বলেন, হয়তো আওয়ামী লীগ যেভাবে চায়, সেভাবেই বলেন। আওয়ামী লীগ চায় না, আমরা বিএনপির সাথে যাই। আবার আওয়ামী লীগ এটাও চায় না তাদের সঙ্গে জোট করি। আমার ধারণা, আমাকে কেউ বলেনি। দেখুন, আমি যদি আওয়ামী লীগ নেতা হইতাম, আমিও চাইতাম জাতীয় পার্টি আমাদের সঙ্গে না থাকুক। কারণ জাতীয় পার্টি থাকলে, জাতীয় পার্টিকে একটা শেয়ার দিতে হয়, এখন তুলনামূলকভাবে জাতীয় পার্টিকে যেই শেয়ারটা দেয়া হবে, তাদেরকে পাস করে আনা খুব কঠিন হবে। এটা তাদের জন্য লস হবে। জাতীয় পার্টি যদি কারো সাথে যায়, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সাথে যায়, তাহলে আওয়ামী লীগের ক্যানডিডেটকে দিলে যতটুকু ভোট পাবে জাতীয় পার্টির ক্যানডিডেট তত ভোট পাবে না। সেখানে তাদের জন্য একটা রিস্ক দাঁড়ায়।
এবারের পৌর নির্বাচনে চার ভাগের একভাগও প্রার্থী দিতে পারলেন না কেন?
জাতীয় পার্টি এখন যেভাবে চলছে, তাতে অনেকেই প্রার্থী হতে চায় না। আমি আগেই বলে দিয়েছি, কেন তারা প্রার্থী হতে চায় না। এই মুহূতে যদি জাতীয় নির্বাচন হয় এবং ইনডিপেন্ডেন্ট নির্বাচনে যায়, এর চেয়েও (পৌর নির্বাচনের চেয়ে) অবস্থা আরো খারাপ হবে। মানে, মনোনয়ন নিতেই চাইবে না কেউই। যদি কাউকে ডেকে এনে দেওয়া হয়। যেমনটা এবারের পৌর নির্বাচনের বেলায় হয়েছে। এখন কারো সাথে যদি জোট করে সেই ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা।
তবে আমার ধারণা, আওয়ামী লীগ চাচ্ছে না, আমরা বিএনপির সঙ্গে যাই। আবার একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ এটাও চায় না তাদের সঙ্গে জোট করি। পরবর্তীতে তাদের স্ট্যান্ড চেঞ্জ হতে পারে। জাতীয় পার্টি কোনোখানে না থাকলেই তাদের জন্য ভালো। কারণ তাদের ধারণা ক্যানডিডেট তারা সব জায়গায় সেট করবে, ফাইট হবে বিএনপির সঙ্গে। কারণ সেইটা তাদের জন্য অনেকটা লাভজনক। তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো হয়, জাতীয় পার্টি ইনডিপেন্ডন্ট থাকুক। তাহলে বিএনপির ভোট কাটবে। হয়তো এসব চিন্তা করেই এরশাদ সাহেব বলছে, আমরা ইনডিপেন্ডন্ট নির্বাচন করবো। এটা অ্যাকচুয়ালি সরকারের স্ট্র্যাটেজি। এ ধরনের রাজনীতি করলে জাতীয় পার্টি ভেনিশ হয়ে যাবে।
তবে আরেকটা বিষয় আপনাকে বলতে চাই, স্থাীয় নির্বাচনে সব কিছু বিবেচনায় আসবে না। ওই হিসাব করলেতো দেশ বিএনপির হাতছাড়া হয়ে গেছে। বিএনপি এতো বড় একটা দল, ব্যাপক জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও এখন তাদের কোথাও প্রতিনিধি নেই। হাতছাড়া হয়ে গেছে। স্থানীয় নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলে হবে না। আগেই বলছি গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন আছে। তারপরও বলি স্থানীয় নির্বাচন দিয়ে জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল বিবেচনা করা আমার মনে হয় সঠিক হবে না।
তাহলে জাতীয় পার্টি এখন কোন অবস্থায় আছে?
বর্তমানে যে ধারায় জাতীয় পার্টি রাজনীতি করছে, এভাবে এ ধারার রাজনীতি যদি চলতে থাকে তাহলে জাতীয় পার্টি ভেনিশ হয়ে যাবে। এরশাদ সাহেবের পক্ষে এই রাজনীতির ধারা চেঞ্জ করা, এই খারাপ পথ থেকে ফেরানো, যেটা কষ্টকর পথে নিয়ে যাওয়া, এটা ওনার পক্ষে কতটুকু সম্ভব বা কতটুকু তিনি ইচ্ছুক এটা নিয়ে সন্দেহ আছে। এভাবে চলতে থাকলে ডেফিনেটলি জাতীয় পার্টি একটি সময় এসে গর্তে পড়ে শেষ হয়ে যাবে।
অনেকেই মনে করে, জাতীয় পার্টির রংপুর ছাড়া কোনো অবস্থান নেই।
যদিও এরশাদ সাহেবের ভোট আছে। তবে রংপুর ছাড়া কোথাও তেমন আছে কি না জানি না। কিন্তু তবুও এরশাদ সাহেব বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটা ফ্যাক্টর। ওনার একটা ভ্যালু আছে। ধরেন, এরশাদ সাহেব আছে বলেই এই কোম্পানির শেয়ার ১০০ টাকা। এরশাদ সাহেব কাল মারা গেলে এই কোম্পানির শেয়ার ১০ টাকায় নেমে আসবে। মূল্য একদিনেই ৯০ টাকা কমে যাবে। উনি এখনও বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটা ফ্যাক্টর। এরশাদ সাহেব যাই হোক, খারাপ হোক, ভালো হোক, চরিত্রহীন হোক, চরিত্রবান হোক, ডাজ নট ম্যাটার। হি ইজ ফ্যাক্টর। ওনার নামেই অনেক কিছু চলে। ওনার রাজনীতি থাক আর না থাক। উনি এখনও একটা ফ্যাক্টর।
সাক্ষাৎকার, জিএম কাদের, জাপা
ওনার তিনটি পয়েন্ট আছে :
একটি হলো- উনার সাড়ে ৯ বছর শাসন আমল যারা দেখেছেন। তারা নটঅনলি সিটিজেন, যারা স্বভাবিক চিন্তা করতে পারে তাদের মনে হয়, ওনার শাসন আমলটা পরবর্তী শাসন আমলেরর যেকোনোটার চেয়েও ভালো ছিল। ওনার যতই দোষটুকু থাকুক না কেন, পরবর্তীতে দোষটুকু কমেনি বরং বেড়েছে। ফলে সেই সব দিক দিয়ে চিন্তা করলে উনি ভালো অ্যাডমিনিস্টার ছিলেন। এটার কোনো সন্দেহ নাই। এটার সম্পর্কে প্র্যাকটিকালি কোনো দ্বিমত নাই।
তবে কউ যদি বায়াস্ট থাকে, কারো প্রতি বায়াস্ট থাকে। ভিতরে যাই থাকুক না কেন বাইরে বলবে জয়বাংলা, আর এরা বলবে জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ। ওইসব দলের ছাড়া বাকি সবাই এটাই স্বীকার করবে। ওরা লাইন করে ভোট দিবে। চোখবন্ধ করে ওই খানে ওরা ভোট দিবে।
দ্বিতীয় হলো- যেহেতু জাতীয় পার্টি গতবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনে গেছে। আর বিএনপি এই নির্বাচনে যায়নি। জাতীয় পার্টি নির্বাচনে গিয়ে আওয়ামী লীগকে বাঁচাইছে বলতে পারো। কাজেই আওয়ামী লীগের লোকেরা ওনার প্রতি কিছুটা কৃতজ্ঞ। কারণ ওনার দলটা থাকার কারণে আমরা বৈধতা পাইছি। বৈধভাবে আমরা বেশ কিছু লুটতরাজ করতে পারছি। মানে সুযোগ সুবিধা পাইছি। ….হা হা।
তৃতীয় হলো- যেহেতু আমরা নির্বাচন করি নাই, তার কারণে মোটামুটি একটা জাতীয় পার্টির দিকে অন্যান্য যারা অ্যান্টি গভর্নমেন্ট তাদেরও একটা সহানুভূতি আছে। উনি নির্বাচন করতে চাননি। চাইনি। কাজেই উনি তো আমাদের সঙ্গেই থাকতে চেয়েছিলেন। কাজেই ওইসব লোকগুলোও ওনার প্রতি এখন আর খারাপভাবে দেখে না। সব মিলিয়ে ওনার একটা গ্রহণযোগ্যতা আছে, ওনার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগত্যতা আছে। এখন বাড়ছে বলে আমার মনে হয়। ওনার রাজনীতি থাক আর না থাক। ফলে উনি একটা ফ্যাক্টর। এখনও বাংলাদেশে উনি যে দিকে ঘাড় ঠেকাবেন, বড় ধরনের সমর্থন আসবে জনগণের। জনগণের মধ্যে একটা সাইকোলজি আছে।
আপনার ভাই, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানকে এখন স্বৈরশাসক বলা হয়। এই বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?
এরশাদ সাহেবকে স্বৈরাচার কয়েকটা কারণে বলা হয়। যেমন : তুমি ধরো, উনি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী জনগণের প্রাতিষ্ঠানিক ইচ্ছা অনুযায়ী ক্ষমতা গ্রহণ করেননি। এমনি জনগণ চাইছিল। জনগণ খুশি হয়েছিল। যেমন ওয়ান ইলেভেন। মানুষ সরকার পরিবর্তনের জন্য পরিবর্তন চাচ্ছিল। সেই হিসেবে উনি আসছিলেন। উনি অফিসিয়ালি জনগণের ম্যান্ডেট নেননি। এটা হলো একনম্বর।
সেকেন্ড হলো, উনি দেশ চালিয়েছেন এবং যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিলেন, ওইগুলো ডিক্রির মাধ্যমে আইন করে। উনি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কন্ট্রোল করেছেন, হয়তো ইলেকশনকেও কিছুটা কন্টোল করেছেন। পার্লামেন্ট কন্ট্রোল করেছেন। নিজের ইচ্ছামত পার্লামেন্ট সাজিয়েছেন। কাজেই এগুলো স্বেচ্ছাচারী কায়দায়।
এই দুইটি কারণে ওনাকে স্বৈরাচার বা স্বৈরশাসক বলা হয়।
আরেকটা হলো, জনগণের ইচ্ছামাফিক দেশ চালানোর সকলের সামাজিক দায়বদ্ধতা যেটা বিচার বিভাগীয় মাধ্যমে হয়। এইটা উনি কন্ট্রোল করার চেষ্টা করেননি। বাকিগুলোর ব্যাপারে যেটা করেছেন উনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আসেননি। নিজের ইচ্ছামত দেশ চালিয়েছেন। উনি যেটা ভালো মনে করেছেন, সেটাই করেছেন। হয়তো দেশের ভালোর জন্যই করেছেন।
এরশাদতো প্রধান মন্ত্রীর বিশেষ দূত…
দেখুন, আমি যেটা মনে করি সেটা হলো, ১৯৮৬ সালে যখন জাতীয় পার্টি গঠিত হয়, বেশিরভাগ জনগণ, সচেতন মহল, সবার মনে মোটামুটি বিশ্বাস ছিল, বা সবাই মনে করতো এইটা সরকারি সংগঠন। এটা কোনো রাজনৈতিক দল নয়। সরকারকে বৈধতা দেয়া, সরকারকে দীর্ঘস্থায়ী, ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম। এটা জনগণের জন্য দল নয়। এখন আবার ২০১৪ এরপর পরে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, একই ধরনের ধারণা হয়েছে। সরকারের নিয়ন্ত্রণে এটা চলছে। সেই কারণে এর আগে সরকার প্রধান ছিলেন এরশাদ সাহেব। এখন সরকার প্রধান যে আছে, তার নিয়ন্ত্রণেই আছে বলা যায়। সরাসরি বা ইনডিরেক্টলি যাই বলুন।
নব্বই সালের পরবর্তী কালে এরশাদ সাহেবের জেলে যাওয়া, পরপর দুইবার সংসদ নির্বাচনে পাঁচ পাঁচটি আসনে নিরঙ্কুষ বিজয় লাভ করা, বিভিন্ন জায়গায় জাতীয় পার্টির বিজয় হওয়া, তার পরবর্তী বিভিন্ন কার্যক্রম, জাতীয় পার্টি আন্দোলন সংগ্রামে সম্পৃক্ততার কারণে মানুষের মনে ধারণা হয়েছে, নব্বইয়ের পরে এটা একটা রাজনৈতিক দল। এই যে একটা ইমেজ তৈরি হয়েছিল জনগণের মধ্যে, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর বর্তমানে আবার মানুষের মনে আস্থাহীনতা এসে গেছে। আগে জাতীয় পার্টির প্রধান ছিলেন সরকার প্রধান, ছিলেন জাতীয় পার্টির প্রধান এবং সরকার প্রধানের পার্থক্য আছে, এখন সরকার প্রধানই এর নিয়ন্ত্রক এইটাই হলো জনগণের ধারণা।
তাহলে আপনি মনে করছেন বর্তমানে জাতীয় পার্টির নিজস্ব কোনো রাজনীতি নেই?
জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয়তা বলতে যা বুঝায় তা নেই। জাতীয় পার্টির নিজস্ব কোনো রাজনীতি নাই। এটা বর্তমানে নাই। কোনো পার্টির নিজস্ব রাজনীতি থাকে না, সেটাকে বিশেষ করে রাজনৈতিক দল বলা যায় না। জাতীয় পার্টির কাজকর্মে জনগণের মাঝে একটা বিষয় প্রতীয়মান হচ্ছে, তাদের কাজ হলো প্রকাশ্যভাবে বা অপ্রকাশ্যভাবে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারকে, সরকারের লোকজনকে বিভিন্নভাবে সমর্থন দেয়াই জাতীয় পার্টির কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমর্থনটা অফিসিয়ালি আমরা যদি তাদের একটা পার্টনার হতাম বা অ্যালায়েন্স পার্টনার হতাম। তাহলে হয়তো এটা স্বাভাবিক হতো। এরপরও আমি বলবে, আমাদের নিজস্ব একটা প্লাটফর্ম দরকার ছিল। সব সময়ে নিজস্ব একটা বক্তব্য থাকা উচিৎ ছিল। সমর্থন দিলেও একটা নিজস্ব ভঙ্গিতে দেয়া উচিৎ ছিল।
এরশাদ পরবর্তী জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে কী আপনি আসছেন?
কথা হলো আমি নেতৃত্ব দিব, সেটা আমি বলতে পারি না, এটা কেউ বলতে পারে না, সাধারণভাবে গণতান্ত্রিক নিয়মে নেতাকর্মীরা যেখানে চাইবে, যেভাবে চাইবে, সেভাবেই নেতৃত্ব ঠিক হওয়া উচিৎ। আমি এটা বিশ্বাস করি। কথা হলো, কেউ কেউ নেতৃত্ব নেয়ার জন্য ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং যেমন করে, তেমনভাবে পার্টির মধ্যেও এধরনের কাজ করার সুযোগ আছে এবং করার জন্য চেষ্টা করা হয় অনেক সময়। আমাদের দলের মধ্যে অনেকেই এ ধরনের আশঙ্কা করছে যে, বিভিন্নভাবে নির্বাচনটা যেন তাদের ফেবারে যায়, যেইভাবে ভোটার তালিকা তৈরি করা, সেইভাবে কমিটি তৈরি করা, এই ধরনের একটা কাজ কর্ম চলছে বলে অনেকে আশঙ্কা করছে। এটা যদি হয় এটা পার্টির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। এটা যাতে না হয় জাতীয় পার্টির বিপদের দিনে যারা ছিলাম, বিপদের সময়ে যারা জাতীয় পার্টিকে একটি সংস্থা থেকে একটি রাজনৈতিক দলে রূপান্তর করার কাজে যারা সম্পৃক্ত ছিল, তারা সবাই এগিয়ে আসবে, ভূমিকা রাখবে। এটা যাতে করতে না পারে ভূমিকা রাখবে আমার ধারণা।
আপনার কথায় মনে হচ্ছে, জাতীয় পার্টি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত?
না, জাতীয় পার্টি অফিসিয়ালি একটি ভাগেই আছে। তবে পার্টির মধ্যে মতবিরোধ আছে। যথেষ্ট মতবিরোধ আছে। পার্টির বর্তমান রোল নিয়ে মাঠ পর্যায়ের সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম হতাশ, উদ্বেগ ও ক্ষোভ লক্ষ্য করা গেছে। এখন বর্তমানে তো গত নির্বাচনতো অনেক প্রশ্নবিদ্ধ।
আইনগতভাবে যেইটাই বলি না কেন ডেমোক্রেটিক প্রিন্সিপালে এই সরকারের বৈধতা নিয়ে অনেক বির্তক আছে। পরবর্তীতে যে পার্লামেন্ট গঠন করা হয়েছে যে পার্লামেন্ট বলতে গেলে বিরোধী দল অফিসিয়িালি আছে বাস্তবে নাই। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী কোনো রাজনৈতিক দল সংসদে অবস্থান নিতে হবে একটাই। হয় সরকারের সমর্থন করলে সরকারের সমর্থক, আর সরকারের বিপক্ষে করলে বিপক্ষে।
সরকারের অফিসিয়ালি গেজেটে আমরা বিরোধীদল। কিন্তু আমরা সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকছি। ফলে এটা সংবিধানের যে স্পিরিট সেটাকে ভায়োলেশন করা হয়েছে। ফলে তারা যখন সরকারের কোনো প্রস্তাব আসে সংসদে হ্যাঁ ভোট দিচ্ছে বলে গণ্য হবে। বিরোধিতা করে এটা না ভোট দেয়ার কথা। কিন্তু সেটা তারা দিতে পারছেন না। ফলে জাতীয় পার্টির অবস্থা আইনগতভাবে সরকারি দলে। সেই হিসেবে সংসদতো একদলীয় সংসদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার প্রধান, আবার উনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। পার্টির প্রধান। পালামেন্টারি প্রধান। আবার দেখা যায় সংসদের মেজোরিটি ওনার কন্ট্রোলে এবং বিরোধী দলও ওনার কন্ট্রোলে মানে ইনডাইরেকলি বা কিছুটা সরাসরি ওনার কন্ট্রোলে। কাজেই একদলীয় সংসদ। ফলে সংসদেও এখন জনগণ এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছে। এইটা হলো স্বৈরতন্ত্র।
এই কারণে আমাদের বিচার বিভাগ সম্পর্কে মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। আগের তুলনায় জনগণের আস্থা কমে যাচ্ছে। সার্বিক চিন্তা করলে সবকিছু একজনের হাতে চলে চলে গেছে। এটাইকেই বলা হয় স্বৈরশাসন, এরশাদ সাহেবের স্বৈরশাসনের চেয়েও বেশি। এখনকার স্বৈরশাসন আগের স্বৈরশাসনের চেয়ে একটু বেশি মাত্রার স্বৈরশাসক।
আসন্ন পৌর নির্বাচন নিয়েও বিরোধী রাজনৈতিক দলে সংশয় আছে…
নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার আগে নির্বাচনী বিধিমালায় ব্যাপক পরিবর্তন করেছে। ব্যাপক, রেডিকেল। দুই একটা ছোট খাটো নয়। মূল প্রিন্সিপাল চেঞ্জ করা হয়েছে। সেটা একতরফা করা হয়েছে। একপেশে বলা যায়। সমস্ত কিছু একটা কারণেই করা হয়েছে বলে আমার মনে হয়। সরকারি দল বা সরকারের সঙ্গে আছে, আওয়ামী লীগ। তাদেরকে কোথায় সুবিধা করতে হবে। কী করলে সুবিধা হবে। এই বিবেচনা করেই বিধিমালা পরিবর্তন করেছে।
দেখুন ইলেকশনের আগ মুহূর্তে হঠাৎ করে বিএনপি-জামায়াতের হাজার হাজার নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদেরকে জামিনও দেয়া হয়নি। এটা নির্বাচনের মাঠ খালি করার জন্য করা হয়েছে। আইন তৈরি করা হয়েছে। এটা করা হচ্ছে তাদের (সরকার সমর্থকদের) সুযোগ সুবিধার জন্য। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। প্রার্থীদের হুমকিও দেয়া হচ্ছে। প্রচারণা চালাতে বাধা দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ শুনা যাচ্ছে। তবে নির্বাচনের আগের রাতে কী হয় বলা যায় না।
দেশের সার্বিক পরিস্থিতির সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।
দেশের স্থিতিশীল পরিস্থিতি নেই। অনেকে বলে এক সরকার অনেকবার ক্ষমতায় থাকলে যেইটা স্থিতিশীল সরকার। এটা হলো সম্পূর্ণ ভুল তথ্য। এক সরকার একবারের পরিবর্তে দুই তিন চার পাঁচবার ক্ষমতায় থাকলে স্থিতিশীল সরকার হয়, উন্নয়ন হয়। আওয়ামী লীগের অনেক লোক বলে। এটা সঠিক নয়। সিস্টেম বা পিলারগুলো যদি ঠিক থাকে তাহলে সরকার পরিবর্তন এমনকি দিনে দিনে, এক সপ্তাহে, ২ সপ্তাহে, দুইমাসে পরিবর্তন হলেও দেশ স্বাভাবিক ভাবে চলে। এটা হলো আসল স্থিতিশীল অবস্থা। যেটা জাপানসহ বিভিন্ন দেশে আছে।
আজ আমরা যতই বক্তব্য দেই আমাদের দেশ স্থিতিশীল। বিদেশিরা দেখছে আমাদের দেশ অস্থিতিশীল। তারাতো এই দেশে একদিনের জন্য বিনিয়োগ করবে না। বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার ব্যাপক অভাব। বাংলাদেশ অত্যন্ত অস্থিতিশীল হিসেবে পরিচিত। প্রাইভেট বিজনেসম্যানরা এই দেশে আসতে চাচ্ছে না।
বিদেশিরা বলছে এই দেশে আইএস আছে, সরকার বলছে আইএস নাই…
গণতন্ত্র যেখানে না থাকে, সেখানে সুশাসন থাকে না, সামাজিক ন্যায় বিচার থাকে না সেখানে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ, আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়, বেকারত্ব সৃষ্টি হয়, মানুষ বঞ্চিত হয় তখন তারা রেডিক্যাল হয়, সেই সময় জঙ্গিবাদের উত্থান হয়। যেমন একসময় সাউথ আমেরিকায় লেফটিস্টদের উত্থান ঘটেছিল। আমাদের দেশ মুসলিম প্রধান সুতরাং এখানে রাইটিস্টদের উত্থান ঘটবে এটাই স্বাভাবিক।
কাজী জাফরের জানাজায় অংশগ্রহণ না করার বিষয়টি যদি বলতেন
দেখুন, কাজী জাফরকে এরশাদ প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। আমাদের সঙ্গে উনি বেঈমানি করেছেন, বিশ্বাঘাতকতা করেছে। কিন্তু মৃত্যুর পর কোনো শত্রুতা থাকে না। ওনার জানাজায় অংশ নেয়ার জন্য আমরা ভাই এরশাদ সাহেব এবং আমি যাওয়ার জন্য রেডি হয়েছিলাম। আমাদের কয়েকজন নেতা এরশাদ সাহেবকে বললেন, সরকার চায় না আপনি কাজী জাফরের জানাজায় যান। পরে আর উনি জানাজায় যাননি। এটা উনি ঠিক করেননি। পার্টির নেতাকর্মীরা মনে করে, এরশাদ সাহেবের জানাজায় যাওয়া উচিৎ ছিল।
আমাদের দলের কয়েকজন ব্যক্তি সরকারের দোহাই দিয়ে দলটার বারোটা বাজাচ্ছে। এরশাদ সাহেব সঠিক বিষয়টি বুঝতে পারলেও ওনার পাশে থাকা লোকজন ওনাকে বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত করে আটকিয়ে রাখে। এখন এরশাদ সাহেবকে নিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি ব্যবসা করছেন। এরা পার্টিকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করছেন। এখন শুধু এই পণ্যের পজিশনটুকু দেয়া বাকি আছে।
দেশ এখন জনগণের দেশ নাই। পাবলিকের দেশ নাই। এই দেশে এখন গণতন্ত্র নাই। দেশে এখন জনগণের হাতছাড়া। একনায়কতন্ত্র চলছে। এটাকে স্বৈরতন্ত্র, স্বৈরাশাসনের চেয়ে বেশি। জিয়ার, এরশাদের আর্মি শাসনের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে।