সিসি ডেস্ক: বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন ব্যবসায়ী ইউসুফ হাওলাদার। দলটির তৃণমূল নেতা-কর্মীরা বলছেন, হাওলাদার আগে বিএনপির রাজনীতি করলেও মাস দুয়েক আগে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন পেলেন। এ ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের কথা শোনা যাচ্ছে।
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে ওটরা, শোলক ও হারতা ইউনিয়নেও। আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ, এই চার ইউনিয়নে যাঁরা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন, তাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিএনপির রাজনীতি করতেন। টাকার বিনিময়ে তাঁরা চেয়ারম্যান পদ কিনে নিয়েছেন। এখন আবার তাঁরা ওয়ার্ডের মেম্বারদের দলীয়ভাবে প্যানেলভুক্ত করার কথা বলে টাকা নিচ্ছেন। উজিরপুরে মনোনয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হাফিজুর রহমানসহ উপজেলার নেতাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে।
বামরাইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি গৌরাঙ্গ লাল কর্মকার বলেন, ‘এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন ইউসুফ হাওলাদার। তিনি জিয়া পরিষদের উপজেলা সাংস্কৃতিক সম্পাদক। ২০১১ সালেও তিনি বিএনপির সমর্থনে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হন। কয়েক মাস আগে উপজেলা চেয়ারম্যানের মাধ্যমে তাঁকে আওয়ামী লীগে যোগদান করানো হয়। এবার তাঁর কাছ থেকে ৫৫ লাখ টাকা নিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আমি ঢাকায় গিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সব নেতাকে লিখিতভাবে এ অভিযোগ দিয়েছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউসুফ হাওলাদার বলেন, ‘অর্থ দিয়ে মনোনয়ন কেনার অভিযোগ সঠিক নয়। আমি বিএনপির রাজনীতি করতাম না। আমি আসলে কোনো দলই করতাম না। আমার পেশা ব্যবসা। ২০১১ সালে আমি কোনো দলের পক্ষে নির্বাচিত হইনি।’
তবে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মাজেদ তালুকদার বলেন, ‘ইউসুফ আমাদের দলের রাজনীতি করতেন। ২০১১ সালের নির্বাচনে আমাদের সমর্থনেই চেয়ারম্যান হয়েছেন। কিন্তু কয়েক মাস আগে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। কারণ, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেই তো চেয়ারম্যান।’
উজিরপুরের শোলক ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন কবীর কাজী। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি শিল্পপতি এস সরফুদ্দিন আহম্মেদ ওরফে সান্টুর একান্ত সহযোগী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু তারপরও উপজেলা চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান তাঁকেই মনোনয়ন দিয়েছেন। কারণ তিনি নিজেও সরফুদ্দিনের পক্ষে কাজ করেছেন।
শোলক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হালিম বলেন, ‘কবীর কাজী বিএনপির নেতা সান্টুর টাকা-পয়সা ব্যবসা-বাণিজ্য দেখভাল করেন। অথচ অর্থের বিনিময়ে তাঁকেই দল মনোনয়ন দিয়েছে। আমি আওয়ামী লীগের জেলা ও উপজেলা নেতাদের জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা এটা কী করলেন? তাঁরা চুপ থাকতে বলেছেন। আমিও এখন চুপ হয়ে গেছি। এসব নিয়ে আর কথা বলতে চাই না।’
কবীর কাজী বলেন, ‘সান্টু ভাই তো একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল। কারণ, ২০০৮ সালে এখানে আওয়ামী লীগ যাকে মনোনয়ন দিয়েছিল, তিনি ন্যাপ করতেন। আমি তাঁর পক্ষে কাজ করিনি। তবে আমাদের পরিবার অনেক আগে থেকে আওয়ামী লীগ করে। আমি উপজেলা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি। উজিরপুরে যে কয়টা পরিবার আওয়ামী লীগ করে, আমরা তাদের অন্যতম।’
হারতা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির নেতা হরেন রায়। ২০১১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। তবে এবার হঠাৎ করেই তাঁকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
হারতা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সুনীল বিশ্বাস বলেন, ‘থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক আর মেয়র—এই তিনজন মিলে তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছেন। অথচ হরেনের বাবা শান্তি কমিটিতে ছিলেন। একাত্তরে তাঁর বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধারা। হরেন নিজেও বিএনপি করেন। কিন্তু তাঁকেই দল মনোনয়ন দিল। আমি জেলার নেতাদের কাছে প্রতিবাদ করেছিলাম। কিন্তু আমাদের কথা কেউ শোনেননি।’
তবে হরেন রায় এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন উল্লেখ করে বলেছেন, ‘আমরা যদি আওয়ামী লীগ না-ই করি, তাহলে দল আমাকে মনোনয়ন দেবে কেন? এগুলো শয়তানদের কথা। তবে এটা ঠিক, আমি রাজনীতিতে খুব অ্যাকটিভ ছিলাম না।’
উজিরপুরের ওটরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে দল থেকে পদত্যাগের ঘটনাও ঘটেছে। এখানে বর্তমান চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক রাঢ়ি দল থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে শাহাদাত হোসেনকে। ঘটনার প্রতিবাদে খালেক স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। কিন্তু মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে দলের চাপে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন সভাপতির পদ থেকেও পদত্যাগ করেন তিনি।
খালেক রাঢ়ি বলেন, ‘উজিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল খন্দকার অর্থের বিনিময়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মনোনয়ন দিয়ে পকেট কমিটি করেছেন। তিনি নিজেও এখানকার বিএনপির নেতা সান্টুর ঘনিষ্ঠ। তাই তিনি শাহাদাতকে মনোনয়ন দিয়েছেন। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে চাইলেও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুসের অনুরোধে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াই। কিন্তু আমি তাঁদের বলেছি, আপনারা দলটাকে ধ্বংস করে দিলেন। সারাজীবন আওয়ামী লীগ করে ৭৫ বছর বয়সে যে রাজনীতি দেখলাম, সেটা মানতে পারছি না বলেই দল থেকে পদত্যাগ করলাম।’
তৃণমূলের নেতাদের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উজিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মজিদ শিকদার বলেন, ‘আমরা যাঁদের মনোনয়ন দিয়েছি, খোঁজখবর করেই দিয়েছি। যাঁদের দিলে দল জিততে পারবে, সেটিই বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ঠিক নয়।’