সিসি নিউজ: পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাঙালি মুসলমানশূন্য করার এক জঘন্য ষড়যন্ত্রের নীলনকশা বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০১৩ সংশোধনী প্রস্তাবকে ঘিরে এরই মধ্যে বর্তমান সময়ে পার্বত্য অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি আরও জটিলতার দিকে ধাবিত হতে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই আইনের সংশোধনীটি কার্যকর করা হলে এর অ-উপজাতি তথা ৮ লাখেরও বেশি বাঙালি মুসলমান বাসিন্দাদের সমূলে উচ্ছেদ করা এবং সেখানকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে নিয়ে ‘জুমল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আরো বেগবান হবে, যার জন্য পহাড়িরা দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র আন্দোলন করে আসছিলো। ইতিমধ্যেই বর্তমান সরকারের আমলে পার্বত্য শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে মিশনারি গ্রুপগুলো তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে পৃথক একটি খ্রিস্টান অঞ্চল গড়ে তোলার বাসনায়। এই আইনটি পাস ও কার্যকর করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত আদিবাসী বা ভূমিপুত্র বাঙালি নাগরিকরা ভূমিস্বত্ব, বাসস্থান, জানমালের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, জীবন-জীবিকাসহ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হবে। শুধু তাই নয়, সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে ফের অশান্তির দাবানল জ্বলে উঠবে। সংবিধানের সাথে বিরোধপূর্ণ বা সাংঘর্ষিক এই ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০১৩ বাঙালি উপজাতি সম্প্রীতি, নিরাপত্তা এমনকি দেশের সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করে তুলবে। পার্বত্য জনপদের বিভিন্ন পেশার উপজাতিদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাদের প্রায় সবারই অভিমত, বাঙালিদের সঙ্গে তারা এক সঙ্গে আছে বটে, তবে তারা সবসময়ই একটি আলাদা রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত এক যুগে ভূমির বিরোধ নামে অসংখ্য ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৩টি বড় সংঘর্ষে মারা গেছে অন্তত শতাধিক বাঙালি মুসলিম। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। সর্বশেষ গত মার্চের সংঘর্ষেই কেবল আহত হয়েছেন প্রায় ৭৫০ জন। দেড় হাজারের বেশি মুসলিমদের বাড়িঘরে আগুন লাগানো হয়েছে। গোটা পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি মুসলমানরা নিজদেশে পরবাসীর মতো এক দুঃসহ জীবনযাপন করছেন। নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত প্রত্যন্ত ও দুর্গম পার্বত্য এলাকায় গুচ্ছগ্রামগুলোর বাসিন্দাসহ আভ্যন্তরীণ শরণার্থী বা আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে বিবেচিত প্রায় ১ লাখ বাঙালি মুসলিম সপরিবারে দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের দুঃখ-দুর্দশা দেখারও কেউ নেই। পার্বত্যাঞ্চলের সাধারণ বাসিন্দাদের জীবন জীবিকার তেমন কোনো অবলম্বন নেই। জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ ছাড়াও বিভিন্ন অবৈধ সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, অত্যাচার-নিপীড়নে প্রতিনিয়তই বাঙালিদের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ অবস্থায় কাটছে।
অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১১টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপজাতীয় গোষ্ঠী বিশেষ করে সংখ্যাধিক্যে ও অনেকেই অপরিমেয় জৌলুসপূর্ণ জীবনযাত্রায় থাকা চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা উপজাতি গোষ্ঠীয় যে কেউ চাইলেই রাজধানী ঢাকার গুলশান, বারিধারা, উত্তরা, বনানী, ধানমন্ডি, বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের খুলশী, নাসিরাবাদ, পাচলাইশে জমি, প্লট, ফ্ল্যাট, এপার্টমেন্ট ইত্যাদির মালিক হতে পারছেন অনায়াসেই। এছাড়া চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলাতেও অনেক উপজাতি নাগরিক স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। অথচ কোনো অ-উপজাতি তথা বাঙালি মুসলমান পার্বত্য চট্টগ্রামের কোথাও জমি কিনতে কিংবা বসতি স্থাপন করতে পারছেন না। তারা সবদিক থেকেই মৌলিক মানবাধিকার বঞ্চিত।
তাছাড়া সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও বিশেষ উপজাতি কোটায় চাকরি লাভের সুযোগ রাখা হয়েছে অবারিত। এতে করে চাকরিতে যথেষ্ট হারে উপজাতি গোষ্ঠীর লোক সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু বাঙালি মুসলমান নাগরিকরা এক্ষেত্রে সকল সুযোগ থেকে বঞ্চিত। শিক্ষিত এমনকি উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে সাধারণ বাঙালিদের মাঝে। চাকরি শুধু নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা ক্ষুদ্র ব্যবসা বাণিজ্য, ঠিকাদারি, কৃষিখামার, পোলট্রি থেকে শুরু করে কর্ণফুলী হ্রদে মাছ শিকারের মতো যে কোনো পেশা নিয়েও জীবনধারণ করতে পদে পদে বাধ্যগ্রস্ত হচ্ছে। কেননা এ ধরনের যে কোনো কাজে নিয়োজিত থাকতে গিয়ে পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মোটা অংকের চাঁদা বা ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। জনসংহতি সমিতি, ইউপিডিপি এবং আরও বিভিন্ন সশস্ত্র উপজাতি গোষ্ঠীর লোকজনকে তাদের চাঁদার দাবি মেটাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন বাঙালি নাগরিকরা। পরিবার পরিজন নিয়ে তাদের জীবনধারণ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার চাঁদার দাবি না মেটালে যে কোনো সময়ই জীবননাশের হুমকি নেমে আসে।
অনেকেই মনে করছেন, এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই ভারতে আশ্রিত চাকমাদের সম্প্রতি দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং সরকার তাদের এককালীন টাকা দিয়ে পুনর্বাসিত করেছে। কিন্তু দিনদিন পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে মনে হয় পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ব তিমুর কিংবা দক্ষিণ সুদানের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে আর বেশি দেরি নেই। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব তিমুর প্রদেশকে এভাবেই প্রথমে খ্রিস্টান অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। তারপর একসময় পশ্চিমা বিশ্বের চাপে পড়ে পূর্ব তিমুরকে স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয় ইন্দোনেশীয় মুসলিম সরকার। একই ঘটনা ঘটে দক্ষিণ সুদানেও। বিশ্লেষকরা মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে তেমন শঙ্কাটাও অমূলক নয়। গত ২০১১ সালে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সপ্তম সভায়ও এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হেেয়ছে। সেখানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের ঘন ঘন সফর, ইউএনডিপির ইদানিংকালের কর্মকা-ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে কী হারে উপজাতিরা খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে, তা একটা পরিসংখ্যান নিলেই জানা যাবে। উপজাতিদের দারিদ্রকে পুঁজি করে খ্রিস্টান ধর্মের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে। শুধু তাই নয়, ইউএনডিপির বিভিন্ন প্রজেক্টে পাহাড়ি ধর্মান্তরিত লোকদের চাকরি দেয়া হচ্ছে, যেখানে বাঙালিরা প্রবেশ করার অনুমতি পর্যন্ত পাচ্ছে না। পাহাড়ি অঞ্চলে একজন উপজাতীয় ড্রাইভার যে বেতন পান, অনেক বাঙালি কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও সেই বেতন পান না। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, তথাকথিত সুশীল সমাজ কোনোদিনও এ প্রশ্নে মুখ খোলেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতিদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে তারা মানববন্ধন করলেও, ওখানে বসবাসকারী মুসলিম বাঙালিরা যে ষড়যন্ত্র ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, সে ব্যাপারে একবারও তারা কথা বলেননি। বিদেশিরা পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানকে মূল রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন করেছিল। স্থানীয় লোকদের ব্যাপক ধর্মান্তরিত করে তারা তাদের উদ্দেশ্য সাধন করেছিল। আজ পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়েও ওই একই ধরনের ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের জোর দাবি।