• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৮ অপরাহ্ন |
শিরোনাম :

র‌্যাবকে বাঁচাতে হবে

Tuhinতুহিন মালিক: র‌্যাব কোনো দল বা ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রতিষ্ঠান এটা। আমাদের রাজনীতির ক্রমবর্ধমান দুর্বৃত্তায়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জনপ্রশাসন ও পুলিশের ব্যর্থতা এবং আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতের ব্যর্থতার কারণে ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ এই বাহিনীর জন্ম হয়। জন্মের পরপরই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ পরিণতি ঠেকাতে সন্ত্রাস এবং জঙ্গি দমনে অসাধারণ দক্ষতার জন্য খুব তাড়াতাড়ি ফ্রন্ট লাইনে চলে আসে র‌্যাব। সে সময় গোটা দেশ অনেকটা চোখ বুজেই অকুণ্ঠ সমর্থন দেয় এই বাহিনীকে। সাধারণ মানুষের এত আস্থা রাষ্ট্রের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি এতটা আগে কখনো দেখা যায়নি। একে একে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দেশ ছেড়ে পালানো আর বাকিদের টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব করে তোলে তখনকার র‌্যাব।

র‌্যাবের সাফল্যের অন্যতম কারণ ছিল তাদের পেশাদারিত্ব তুলনামূলক আধুনিক ও গতিশীল। সে সঙ্গে দুর্নীতিমুক্ত ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদারিত্ব তাদের জনমানুষের শ্রদ্ধার জায়গায় নিয়ে যায়। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত সুবিধা সংবলিত বড় বড় অভিযান তারা পরিচালনা একেবারেই নির্মোহভাবে। প্রতিদিনের পত্রিকার সংবাদে মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে থাকে প্রতিনিয়ত।

হরকাতুল জিহাদ, মুফতি হান্নান, মাদক চোরাচালান ও সন্ত্রাস দমন, চরমপন্থি গ্রেফতার, বোমা উদ্ধার, চরমপন্থিদের অপতৎপরতা রোধ, ভিডিও পাইরেসি ভেজালবিরোধী এবং অবৈধ ভিওআইপি অভিযানসহ সব জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কাজে পুরো জাতি র‌্যাবকে সমর্থন দিয়েছে। অনেক সময় অনেক সৎ কর্মকর্তাকে পর্যন্ত বড় ধরনের মাশুল দিতে হয়েছে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অপরাধে। এমনকি র‌্যাবের চৌকস অফিসাররা পর্যন্ত জীবন দিয়েছেন জনগণের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে। কিন্তু হঠাৎ করে কেন এই মহানায়ক খলনায়কে পরিণত হলো? কেন র‌্যাবের বিলুপ্তি চাওয়া হচ্ছে? যাদের নামের আগে দেশপ্রেমিক উপাধি লাগানো হয়, জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তান আমাদের সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি নিয়ে কেন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে? দেশপ্রেমিক সেনারা কেন দলপ্রেমিকের মতো কাজ করবে? র‌্যাব বিলুপ্ত হলে সুবিধাভোগী কারা? ব্যক্তির স্খলনে প্রতিষ্ঠান অপরাধী হতে পারে কিনা? র‌্যাব কেন ভাড়ায় চালিত যানবাহনের মতো ভাড়ায় চলবে? র‌্যাব কেন রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রতিরোধে মাঠে থাকবে? ছেলে-জামাই-শ্বশুরের রাজনৈতিক বাণিজ্যে র‌্যাব কেন একা অভিযুক্ত হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে জাতীয় প্রয়োজনে। গত ১৬ জানুয়ারি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিতর্কে বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠানে র‌্যাবের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অভিযোগ ওঠে। এর পর ১২ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাবের সব প্রশিক্ষণ প্রদান স্থগিত করে। সর্বশেষ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এ অভিযোগে র‌্যাবের বিলুপ্তি দাবি করে। কেন আমরা জনগণের এ প্রতিষ্ঠানটিকে রাজনীতির হাতিয়ার বানালাম? র‌্যাব কেন রক্ষীবাহিনী হবে?- এ প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সমস্ত কিছুর উত্তর। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে র‌্যাবের ব্যবহার এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে র‌্যাবের বিলুপ্তি কোনোটাই আমাদের কাম্য নয়। একটা দক্ষ প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে জাতীয় জীবনে কিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়। সর্বাগ্রে প্রয়োজন এ বাহিনী থেকে রাজনীতির ব্যবচ্ছেদ ঘটানো। ক্রসফায়ার ছাড়া র‌্যাবের বিরুদ্ধে বড় কোনো অভিযোগ যেহেতু নেই, সেক্ষেত্রে এ বিষয়ে একটি আইনি রক্ষাকবচ তৈরি করলেই আর কোনো বিতর্ক থাকে না। প্রায় সব ক্রসফায়ারের ঘটনা গভীর রাতে সংঘটিত হয়। তাই সন্ধ্যার পর ধৃত আসামিকে লকআপের বাইরে না নিলেই হয়। র‌্যাবের আইনেই আছে সশস্ত্র বাহিনী থেকে আসা কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ এক বছর ও সৈনিকরা সর্বোচ্চ ছয় মাস র‌্যাবে থাকতে পারবে- এটা আজ অবধি কেন মানা হয়নি? রাজনীতিগ্রস্ত বা দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ আমরা কেন সৃষ্টি করে দিব? মূল সমস্যা হচ্ছে রিক্রুটমেন্টে। দলীয় ক্যাডার বা রাজনৈতিক দল বা তাদের পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা যাতে দায়িত্বশীল পদে না থাকে সেটা মিলিটারি ও র‌্যাব প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত র‌্যাবের প্রশাসনিক কাঠামো। সেটা পুলিশ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলে সম্ভবপর নয়। আমাদের মিলিটারি প্রশাসনকেও একটি ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’ দ্বারা সুসংহত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ কাউন্সিলের অধীনেই থাকবে এলিট ফোর্স র‌্যাব।

এ কথা সত্য যে, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই র‌্যাবের কোনো শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়নি। ১৯৭৯ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স সংশোধন করে র‌্যাবকে পুলিশের একটি পৃথক বাহিনী হিসেবে সৃষ্টি করা হয়। শুরু থেকেই সিভিল ও মিলিটারি পেশার মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে এর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অর্গানোগ্রাম, নিয়োগ ও চাকরিবিধি পূর্ণতা অর্জন করেনি। স্থায়ী কাঠামোর অভাবে বিভিন্ন বাহিনী থেকে স্বল্পকালীন লোক দিয়ে চালানো হয়েছে এটা। একদিকে পুলিশের সদস্যরা মিলিটারি প্রশাসনের অধীনে থাকা এবং সীমিত আয়ের কারণে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারেনি। অন্যদিকে তরুণ ক্যাপ্টেন ও মেজর সাহেবরা অতি দম্ভে থানার ওসিকে পর্যন্ত যথাযথ সম্মান দিতে পারেনি। তাই গোঁজামিলের বাহিনী দিয়ে র‌্যাব সংস্কার সার্থকতা হারাবে। সম্পূর্ণভাবে পুলিশবিহীন একটি জরুরি ও আপদকালীন জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট এলিট কমান্ডো হিসেবে র‌্যাবকে ঢেলে সাজাতে হবে। পুলিশের কাজ অবশ্যই পুলিশকে করতে দিতে হবে। সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে এলিট ফোর্সকে যত্রতত্র ব্যবহার করলে তার পরিণাম শুভ হবে না। র‌্যাবের প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সংস্কারে একটি নিজস্ব মনিটরিং ও ভিজিলেন্স উইং থাকা জরুরি। সে সঙ্গে এই বাহিনীর পৃথক ইনভেস্টিগেশন ও প্রসিকিউশন উইং থাকতে হবে। উইটনেস প্রটেকশন বা সাক্ষী সুরক্ষার ব্যবস্থা না থাকলে অপরাধীরা কিন্তু আইনের ফাঁক গলে ঠিকই বের হয়ে আসবে। তিন বাহিনীর জাজ অ্যাডভোকেট জেনারেল বিভাগ থেকে সরাসরি রিক্রুট দিয়ে এই উইংগুলো সাজানো যেতে পারে। তাছাড়া সরকারের কাছ থেকে লিয়েনে সৎ, বলিষ্ঠ কর্মকর্তাদের চাওয়া যেতে পারে। এ সংস্কার প্রক্রিয়াটি পার্লামেন্টে পাসকৃত পৃথক একটি আইন তৈরি করে তার আওতায় একটি কমিশন দিয়ে তার সুপারিশের ভিত্তিতে সম্পন্ন করতে হবে। তবে এ সংস্কার যেন পুলিশ সংস্কার অধ্যাদেশের মতো ভাগ্যবিড়ম্বিত না হয় সেদিকে জোর দিতে হবে। কেননা সেই ১৮৬০ সাল থেকে পুলিশ নিজেই তার সংশোধন চাইলেও শাসকদের নিয়ন্ত্রণহীনতার ভয়ে আজও পুলিশের সংস্কার হলো না। সর্বশেষ ২০০৭ সালে কেয়ারটেকার সরকার পুলিশ সংস্কার অধ্যাদেশ করলেও পুলিশকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি। আজও হিমঘরে পড়ে আছে পুলিশের সংস্কার আইন আর তাদের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। র‌্যাবের বর্তমান সংকট কেটে গেলে তাদের অবস্থাও যে পুলিশের মতো হবে না সেটাও বলা দুরূহ। তাই এখনই এটা করার শ্রেষ্ঠ সময়।

র‌্যাবকে বিলুপ্ত করে নয় বরং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত জনকল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলাই হবে এ মুহূর্তের জনদাবি। সে সঙ্গে কেউ যাতে আমাদের সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তিকে কদর্য করতে না পারে সেই প্রত্যাশাও রয়েছে জনগণের। কারণ দিন শেষে এই পুলিশ আর এই র‌্যাবই জনগণের পাশে দাঁড়াবে তাদের রক্ষাকবচ হয়ে। তাই এদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে আমাদের নিজেদের বাঁচার স্বার্থেই।লেখক : আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ।
(বাংলাদেশ প্রতিদিন)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ