রুকুনুজ্জামান বাবুল, পার্বতীপুর (দিনাজপুর): লালমনিরহাট ডিভিশনের দিনাজপুরের পার্বতীপুর সেকশনের আন্তঃনগর ট্রেনের পাওয়ারকার থেকে সু-কৌশলে পাচার করা হচ্ছে লাখ লাখ টাকার ডিজেল তেল। সম্প্রতি রেলওয়ের অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা ও হিসাবরক্ষন কর্মকর্তা পার্বতীপুর মিটার গেজ সেকশনের ইলেকট্রেক অফিসে তদন্তে এমন তথ্য মিলেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১২ সালের জুলাই হতে ৬ জানুয়ারী’১৩ পর্যন্ত ২৫ হাজার ৩০০ লিটার ডিজেল তেল ইলেকট্রিক অফিসে দেওয়া নেওয়ার সময় মজুদে তেলের কোন হিসেব পাওয়া যায়নি। তেল সরবরাহের জন্য ইস্যু নোট বা চালান কোনটিই ব্যবহার করেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। এতে রেলের প্রতি লিটার তেলের দাম ৭০ টাকা হিসেবে ১৭ লাখ ৭১হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে এসএম আক্তারুজ্জামান মজুমদার স্বাক্ষরিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে।
তবে রেলওয়ের একটি সূত্র মতে কাগজে কলমে ১৭লাখ টাকার তেলের হদিস পাওয়া না গেলেও বাস্তবে বছরে পাওয়ারকারের (বিদ্যুৎ সরবরাহ কোচ) ভিতরে রাখা ব্যারেল ও জারকিনে ভরে বছরে রেলওয়ের পার্বতীপুর সেকশন থেকে প্রায় ৬০ হাজার লিটারেরও বেশি ডিজেল চুরি হয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগ আছে, পার্বতীপুর মিটার গেজ সেকশনের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) রফিকুল ইসলাম ট্রেনের পাওয়ারকারের দায়িত্ব পালনকারী কিছু ড্রাইভারের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে দীর্ঘ দিন থেকে ডিজেল পাচারের এ কাজটি চালিয়ে আসছেন। পাওয়ারকারে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ডিজেল ধারনের ক্ষমতা থাকার পরেও সেখানে (পাওয়ারকারে) খালি ব্যারেল রাখা হয়েছে। এ ব্যারেল রাখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোন সদোত্তর দিতে পারেননি পার্বতীপুরে কর্মরত উপ-সহকারী প্রকৌশলী এবং লালমনিরহাট ডিভিশনাল বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী উভয়ে। তবে প্রধান প্রকৌশলী বলেন, পাওয়ার কারে খালি ব্যারেল ও জারকিন রাখার কোন নিয়ম নেই।
সংশিষ্ট একটি সূত্র জানায়, পার্বতীপুর রেলওয়ের মিটারগেজ সেকশনের ইলেকট্রিক অফিস থেকে প্রতিদিন ৩টি আন্তঃনগর ট্রেন দ্রুতযান, একতা এবং দোলনচাপার পাওয়ারকারে ডিজেল সরবরাহ করা হয়। একতা ও দ্রুতযান ট্রেন চলে ঢাকা-দিনাজপুর ও দোলনচাঁপা চলে দিনাজপুর-সান্তাহারের মধ্যে। ওই ৩টি ট্রেনে ৮জন ড্রাইভার পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। পার্বতীপুর থেকে ট্রেনগুলির পাওয়ারকারে ডিজেল দেওয়া হয়। ট্রেনের সংরক্ষনাগারে (ট্যাংকি) প্রয়োজনেরও কয়েকগুণ বেশি ধারন ক্ষমতা থাকলেও পাওয়ারকারে সু-কৌশলে খালি ব্যারেল রাখা হয়েছে। প্লাটফর্ম থেকে পাম্পের সাহায্যে পাওয়ার ট্যাংকে ডিজেল ওঠানোর সময় কিছু তেল ওই খালি ব্যারেলেও রেখে দেওয়া হয়। এছাড়াও প্রতিদিনের সেভিং তেল জমা রাখা হয় খালি ব্যারেল ও জারকিনে। একেকটি ট্রেনে তিন চার দিনের মধ্যে ব্যারেল পূর্ণ হলে সুবিধামত স্টেশনে ব্যারেল অথবা জারকিন নামিয়ে দেওয়া হয় পাচারকারীদের কাছে। ট্রেন ফিরে আসার সময় আবার খালি ব্যারেল পাওয়ারকারে তুলে নেওয়া হয়। এ হিসেবে ৩ ট্রেন হতে বছরে প্রায় ২৭৩ ব্যারেলে ৬০ হাজার ৬০ লিটার ডিজেল চলে যায় পাচারকারীদের হাতে। এক ব্যারেল ডিজেল (২২০লিটার) বিক্রি করা হয় প্রায় ৯ হাজার টাকায়। চোরাই এসব ডিজেল মাত্র ৪০ টাকা করে লিটার বিক্রি করে বছরে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে ২৪ লাখ ২ হাজার ৪শ টাকা। কিন্তু সরকারী হিসাবে এসব ডিজেলের দাম হচ্ছে ৪০ লাখ ৮৪ হাজার ৮০ টাকা।
সূত্র জানায়, গ্রীষ্মকালে একতা, দ্রুতযান ও দোলনচাঁপা ট্রেনে তেল প্রয়োজন ১২০ থেকে ১৩০ লিটার। শীতকালে প্রয়োজন ৫০থেকে ৬০ লিটার। অথচ ইঞ্জিনের ট্যাংকিতে ধারন ক্ষমতা ৪০০ লিটার। এছাড়া রয়েছে রিজার্ভ ট্যাংকি। এরপরেও ডিজেল নেওয়ার জন্য ইঞ্জিনে রাখা হয়েছে খালি ব্যারেল।
লালমনিরহাট ডিভিশনের ৫টি আন্তঃনগর ট্রেন অনুসন্ধানে দেখা যায় শুধু মাত্র একতা, দ্রুতযান ও দোলনচাঁপা ট্রেনের ভিতর খালি ব্যারেল রাখা হয়েছে। লাল রংয়ের ব্যারেলের গায়ে কোন কিছু লেখা নেই। সাধারণ মানুষ যাতে বুঝতে না পারে, সে কারনে ব্যারেল ও জারকিন ইঞ্জিন রুমের ভিতর রাখা হয়। দিনাজপুর থেকে ঢাকাগামী একতা ট্রেনের ৮৩৫৬ নং পাওয়ারকার এবং ঢাকা থেকে দিনাজপুরগামী দ্রুতযান ট্রেনের ৭৩৫৬ নং পাওয়ারকারের ভিতর খালি ব্যারেল দেখা যায়। পাওয়ার কারের ড্রাইভার মাহতাব উদ্দিন বলেন, ট্রেন লেট হলে অতিরিক্ত ডিজেল লাগে, এ কারনে উপ-সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) রফিকুল ইসলামের নির্দেশে পাওয়ারকারে ব্যারেল রাখা হয়। একতা পাওয়ারকারের ড্রাইভার আবুল হোসেন বলেন, একটি ট্যাংকি ছিদ্র থাকায় ব্যারেলে ডিজেল রাখা হয়। আর অন্য ট্রেন দু’টির ব্যাপারে তিনি জানেননা বলেও জানান।
তবে পার্বতীপুর জংশনের হেড টিএক্সয়ার আব্দুল জব্বার বলেন, ট্যাংকি ছিদ্রের ঘটনা তার জানা নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাওয়ারকারের এক সহকারী ড্রাইভার বলেন, একতা ও দ্রুতযান ট্রেনের ব্যারেলে রাখা ডিজেল সাধারণত যমুনা বাইপাস, পাঁচবিবি অথবা জয়পুরহাট এবং দোলনচাঁপার তেল খোলাহাটি অথবা কাউনিয়া স্টেশনে নামিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া ট্রেনের খাওয়ার গাড়িতেও জ্বালানী হিসেবে স্বল্প মুল্যে এসব ডিজেল বিক্রি করা হয়। আবার কখনও অফিস থেকেও তেল জারকিনে ভরে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
এ ব্যাপারে জানতে পার্বতীপুরের উর্দ্ধতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) রফিকুল ইসলাম বলেন, ড্রাইভারদের চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হয়। জনবল সংকটের কারনে ৩-৪ দিনের তেল একদিনে লোড দেওয়া হয়। তাই ব্যারেল ব্যবহার করা হচ্ছে। তার পরে কোন ড্রাইভার ডিজেল পাচার করলে তিনি নিজেই দায়ি থাকবেন। তবে ব্যারেল রাখার কোন অনুমতিপত্র তিনি দেখাতে পারেননি। একটি বিশ্বস্ত সুত্র জানায়, সাধারণত ব্যারেল রাখার নিয়ম নয়, বিশেষ কোন কারণে রাখতে হলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে। বিষয়টি তিনি দেখবেন বলেও জানান।