• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৯ অপরাহ্ন |
শিরোনাম :

রাজনীতির বাতাসে সংলাপের ধোঁয়া

Hasina+Khaladaসিসিনিউজ: প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের চাপা পরে থাকা ইস্যু দু’দলের ‘সংলাপ’ নিয়ে রাজনীতিকদের মুখে আবারো আলোচনা শোনা যাচ্ছে। তবে এই সংলাপ শুধু দুর থেকে বক্তব্য ছুঁড়ে দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। রোববার রাতে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন, বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনের জন্য বিএনপি যেকোনো সময় সংলাপে রাজি।
বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দল বেগম জিয়ার কাছে জানতে চান নির্বাচনের জন্য সংলাপে বসতে বিএনপি রাজি আছে কি-না। জবাবে বেগম জিয়া বলেছেন, ‘প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনের জন্য বিএনপি যেকোনো সময় সংলাপে রাজি।’ অর্থাৎ এখানে সংলাপের শর্ত থাকছে নির্বাচন।
খালেদা জিয়ার সংলাপের আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সোমবার বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ সব সময় আলোচনায় বিশ্বাসী। সংবিধান মেনে যেকোনো স্থানে সংলাপ হতে পারে। তবে খালেদা জিয়াকে সংবিধান মেনে কখন কোথায় কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন সেটা আগে নির্ধারণ করতে হবে।’ তবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনি সংলাপে বসতে রাজি, ভালো কথা। কিন্তু এ জন্য আপনাকে সংঘাতের রাজনীতি পরিহার করতে হবে। কারণ অতীতে আপনি সংলাপকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে সংঘাতের রাজনীতি করেছেন।’ অর্থাৎ সংলাপের শর্ত হিসেবে থাকছে সংঘাতর রাজনীতি পরিহার।
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যখন তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তখন তিনি গোঁ ধরে না থাকলে দেশে এই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হতো না। বঙ্গবন্ধু কন্যা সব সময় গণতন্ত্র ও আলোচনায় বিশ্বাসী। আওয়ামী লীগ কখনো আলোচনার পথ বন্ধ করেনি, করবে না। সাংবিধানিক প্রক্রিয়া মেনে নিলে, সংলাপের পথে কোনো বাধা নেই।’
তবে সুরঞ্জিতের বিপরিত বক্তব্য দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুল আলম হানিফ ও ওবায়দুল কাদের। বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে তারা বলেছেন, কোনও সংলাপ হবে না। তাদের বক্তব্য একটাই, যদি ৫ জানুয়ারী নির্বাচনের পর এই সরকার অবৈধই হয় তাহলে অবৈধ সরকারের সাথে আর আলোচনা কেন।
আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আগামী ২০১৯ সালের আগে বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়। তাদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করতে যখন রাজি ছিলাম তখন তারা আসেনি, বরং তারা তখন সহিংসতা করেছিল।’
এদিকে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন অনেকে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ বলেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক সংকট কাটাতে বড় দু’দলের মধ্যে সংলাপ হওয়াটা দরকার। তবে তিনি মনে করেন, সংলাপ প্রসঙ্গে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ অতীতেও আন্তরিক ছিল না এখনো নেই। তার মতে সংলাপের কথাবার্তা কয়েক দিনের মধ্যেই ফের হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে।
রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলায় সংলাপের কোন বিকল্প নেই বলে মনে করেন, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি- জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের চেয়ারম্যান ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ।
সংলাপ-সমঝোতা বা মধ্যবর্তী নির্বাচনের চিন্তা বাদ দিয়ে আপাতত আপন গতিতেই চলছে সরকার। ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহল থেকে নতুন করে ‘অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের চাপ এলেও তা কোনো রকম আমলে নিচ্ছে না তারা। এখন দশম সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার বাস্তবায়ন করে দলের ইমেজ পুনরুদ্ধারে ব্যস্ত। টার্গেট পাঁচ বছরের পূর্ণ মেয়াদ। আর পদ্মা সেতুসহ বড় বড় বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকা- দৃশ্যমান হলে আরো পরে একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে রাজপথের বিরোধী দলের সাথে কথা বলতে চাইবে তারা। এর আগে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এশিয়ার জায়ান্ট দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টায় ব্যস্ত থাকবে তারা। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ‘ব্যাকফুটে’ অবস্থানের বিষয়টি নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরাও।
নির্বাচনকেন্দ্রিক উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সফলভাবে সামাল দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি জোট আন্দোলনের চিন্তা বাদ রেখে এখন আত্মসমালোচনায় মগ্ন। তাই খুব শিগগিরই তারা সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে না। এ ছাড়া দেশে বড় ধরনের তেমন কোনো সঙ্কটও নেই। সে জন্য বিএনপি জোটের শীর্ষ নেতাদের সংলাপ-সমঝোতার আহ্বানে আপাতত আর সাড়া দিচ্ছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জোট। এ নিয়ে কোনো রকম আগ্রহ নেই সরকারের নীতিনির্ধারকদের। তবে বিরোধী দল যদি নিজ থেকে সরকারের সাথে সংলাপে বসার উদ্যোগ নেয় তাকে নানা শর্তের বেড়াজালে ফেলে সময় পার করবে আওয়ামী লীগ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দশম সংসদ নির্বাচনের আগে দেশী-বিদেশী চাপে পড়ে আওয়ামী লীগ সংলাপের নামে পরিস্থিতি সামলে নেয়ার চেষ্টা করে। এটি ছিল মূলত তাদের রাজনৈতিক কৌশল। এখন বিএনপি সংলাপের তাগিদ দিলেও প্রতিদিনই নতুন নতুন শর্ত জুড়ে দিচ্ছে আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, আওয়ামী লীগ সব সময় সংলাপে বিশ্বাসী। দশম সংসদ নির্বাচনের আগে অনেকবার তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপিকে সংলাপের আহ্বান জানানো হয়েছিল। আমাদের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী নিজে ফোনও করেছিলেন। তখন তারা সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছিল। নির্বাচন হয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতি স্থিতিশীল। পরবর্তী একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা বলার সময় এখনো আসেনি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন কূটনীতিকের আবার দুই দলের মধ্যে সংলাপ আয়োজনের দৌড়ঝাঁপের বিষয়ে তিনি বলেন, বিদেশী রাষ্ট্রদূতেরা আমাদের অতিথি। যেকোনো সময় তারা আমাদের সাথে কথা বলতে পারেন। তবে আমাদের সিদ্ধান্তগুলো আমরা নিজেরাই নিতে চাই। সেটাই জনগণ পছন্দ করবে।
সংলাপে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আগ্রহের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক এ বিশেষ সহকারী আরো বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ এখন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করে না। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মনে করলে করতে পারেন। কখনো এর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে তখনই এসব বিষয় নিয়ে কথা বলা যাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা জানান, সরকার বিএনপিকে আরো চাপে ফেলে ভঙ্গুর অবস্থায় নিতে চাচ্ছে। এ জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং তার ছেলে তারেক রহমানসহ বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো সক্রিয় করা হচ্ছে। আন্দোলনে নামলেই তাদের এসব মামলায় অভিযুক্ত করা হবে। ফলে তাদের মধ্যবর্তী নির্বাচন দাবির আন্দোলন পারিবারিক আন্দোলনে পরিণত হবে। আর সরকারও জনগণকে বলতে পারবে বিএনপি জনসম্পৃক্ত বিষয়ে আন্দোলন করছে না। এতে বিএনপির প্রগতিশীল অংশ ও তাদের শরিকরাও আন্দোলন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচন বা সংলাপ নিয়ে তারা তেমন দর কষাকষিরও সুযোগ পাবে না। আর বিএনপি নেত্রী যখন তার পারিবারিক মামলার জালে জড়িয়ে অসহায় হয়ে পড়বেন, তখন দলও গুছাতে পারবেন না। এভাবে সরকার তার নির্দিষ্ট মেয়াদ পূরণের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে চায়। তাই সংলাপ নিয়ে আপাতত সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি বলেন, আমরা বিএনপির সাথে যখন আলোচনা করতে চেয়েছিলাম তখন তারা আসেনি। বরং তারা সহিংসতা করেছিল। তাই ২০১৯ সালের আগে বিএনপির সাথে আর কোনো সংলাপ নয়।
সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এক দিকে বিএনপি জোটকে নানাভাবে চাপে রাখা আর অন্য দিকে পররাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করবে। বিশেষত করে ভারতের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের সাথে বোঝাপড়াকে অতি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অন্য একটি সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ অবগত রয়েছে যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিঘিœত করতে প্রভাবশালী অনেক দেশই সরকারের ওপর নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে।
সরকার বিষয়টি বুঝতে পেরে নতুন মিত্রের সন্ধানে রয়েছে। এই মিত্রদের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন করে বোঝাপড়া করতে চাইছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী সফলভাবে জাপান সফর করেছেন। বর্তমানে তিনি চীন সফরে রয়েছেন। সেখানে পাঁচটি চুক্তিও সম্পাদিত হয়েছে। এ ছাড়া শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে এ বছরই রাশিয়ার রাষ্ট্রনায়ক ভøাদিমির পুতিন ঢাকা সফর করতে পারেন। তবে সবার আগে ‘মোদি’ বোঝাপড়াকেই সরকার সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানা গেছে। আর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ মোদীর পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ নিয়ে বাংলাদেশে এলে তাতে সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করতে পারেন।
তবে সরকার নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে দেশ চালাতে তার পশ্চিমামুখী কূটনীতিতে পরিবর্তন আনছে।
তবে সংলাপের ব্যাপারে অন্য নেতাদের সাথে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সব সময় আলোচনায় বিশ্বাসী। সংবিধান মেনে যেকোনো স্থানে সংলাপ হতে পারে। তবে সংলাপের জন্য তাকে সংঘাতের রাজনীতি পরিহার করতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ