সিসিনিউজ: পল্লী বিদ্যুতায়ন প্রকল্পে গাড়ি কেনার নামে অর্থ লুটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। একই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ৩৫টি গাড়ি থাকা সত্ত্বেও আরো ৭৫টি গাড়ি কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। বেশি দরে গাড়ি কেনার নামে এই অর্থ লুটপাটের আশঙ্কা করছে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সরকারি ক্রয়নীতিমালা-২০০৮ অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ের সম্পদের সাথে সমন্বয় করার বিধান থাকলেও কেন তা করা হচ্ছে না। এমনকি ওই সব যানবাহনের বিষয়গুলোকে দ্বিতীয় পর্যায়ে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পরামর্শক নিয়োগ খাতে বরাদ্দ রাখা ৫৫ কোটি টাকার কোনো ব্যাখ্যা প্রকল্প প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়নি।
পরিকল্পনা কমিশন ও আইএমইডি সূত্র জানায়, দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রতি বছরই সহস্রাধিক প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য নেয়া হয় বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। কোটি কোটি টাকা দিয়ে এসব যানবাহন কেনার পর সেগুলোর আর কোনো হদিস থাকে না। এমনকি একই ধরনের প্রকল্প বিভিন্ন পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হলেও প্রতিটি পর্যায়ের জন্য পৃথক যানবাহন কেনা হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ের তিনটি প্রকল্পে ৩৫টি যানবাহন থাকা সত্ত্বেও একই প্রকল্পের দ্বিতীয় ফেইজের জন্য ৭৫টি যান কেনার প্রস্তাবনা রাখা হয়েছে প্রকল্প প্রস্তাবনায় (পিপি)। ফলে রাষ্ট্র ও দাতাদের কাছ থেকে সুদে নেয়া ঋণের টাকার অপচয় হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) পল্লী বিদ্যুৎ সম্প্রসারণ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন সম্প্রসারণ রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ-১, পল্লী বিদ্যুতায়ন সম্প্রসারণ চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ-১ এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন সম্প্রসারণ ঢাকা ও সিলেট বিভাগ-১ কার্যক্রমের মেয়াদ বৃদ্ধির পর এখন চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা। এ প্রকল্পের জন্য কোটি টাকার বেশি দরে পাজেরো এবং কয়েক লাখ টাকা মূল্যের মাইক্রোবাস ও দুুই লাখ টাকা মূল্যের অর্ধশত মোটরসাইকেল কেনা হয়। চলতি ২০১৪ সালের জুনে প্রকল্পের প্রথম পর্যায় শেষ হলে দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হবে।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (পবিবো) এখন ওই তিনটি প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ হাতে নিচ্ছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য ব্যয় হবে চার হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা। আগের তিনটি প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে জিপ, পিকআপ, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেলসহ মোট ৩৫টি যানবাহন কেনা হয়। চলতি বছর ৩০ জুন প্রথম পর্যায় শেষ হওয়ার পর তা দ্বিতীয় পর্যায় নেয়া উচিত ছিল। তাহলে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত কয়েক শ’ কোটি টাকার অপচয় থেকে বাঁচত। কিন্তু সেটা না করে আরো ৭৫টি যানবাহনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ওই তিনটি প্রকল্পই গত ২০১০ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়; যা ২০১৩ সালের জুনে শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবায়নকারী সংস্থা তা করতে পারেনি। ফলে আরো এক বছর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
প্রকল্পগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিনটি প্রকল্পের জন্য নতুন করে ২০টি জিপ কেনা হচ্ছে। প্রতিটি জিপের মূল্য ধরা হয়েছে এক কোটি ২০ লাখ টাকা করে। প্রতিটি দুই লাখ টাকা দরে ৫৪টি মোটরসাইকেল কেনা হবে। ৫০ লাখ টাকা দরে তিনটি পিকআপ কেনা হবে। প্রকল্পের জন্য যেসব যানবাহন কেনা হয় সেগুলো প্রকল্প শেষ হলে আর খুঁজে পাওয়া যায় না বলেও আইএমইডি থেকে বলা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, পল্লী বিদ্যুতায়ন সম্প্রসারণ রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ-২ এর জন্য পরামর্শক খাতে ১৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা, পল্লী বিদ্যুতায়ন সম্প্রসারণ চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ-২ এ পরামর্শক খাতে ১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন সম্প্রসারণ ঢাকা বিভাগ-২ এর জন্য ১৯ কোটি টাকা পরামর্শক খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু এই পরামর্শক কত জনকে কত দিনের জন্য নিয়োগ দেয়া হবে তার কোনো ব্যাখ্যা প্রকল্প প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়নি।
প্রকল্পগুলো নিয়ে পর্যালোচনা সভায় পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, দ্বিতীয় পর্যায়ে যানবাহনের মূল্য অনেক বেশি ধরা হয়েছে। আগের পর্যায় যানবাহন যেসব আছে সেগুলোকে যোগ করে প্রয়োজনটা নির্ধারণ করা উচিত ছিল। যেহেতু প্রকল্পের প্রথম পর্যায় জুনেই শেষ হচ্ছে, তাই ওই সব যান দ্বিতীয় পরবর্তী পর্যায়ের কাজ নিয়ে আসা যায়। সরকারি ক্রয়নীতিমালা-২০০৮ অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ের সাথে সমন্বয় করে করা উচিত। অন্য দিকে পরামর্শক খাতে মোট ৫৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু এই অর্থ ব্যয়ের কোনো ব্যাখ্যা ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়নি। নয়াদিগন্ত