আন্তর্জাতিক ডেস্ক: করাচির জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে ইসলামিক মুভমেন্ট অব উজবেকিস্তান (আইএমইউ)। এ কথা তারা নিজেরাই স্বীকার করেছে। কিন্তু আইএমইউ কারা? কি করছে তারা পাকিস্তানে?
আইএমইউ দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক সস্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদা ও কট্টরপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠী তালেবানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। পাকিস্তানের উত্তর ওয়াজিরিস্তানে অবস্থানরত বিদেশি জঙ্গিদের অনেকেই আইএমইউ-এর সদস্য। ১৯৯৮ সালের আগস্টে উজবেক জঙ্গি গ্রুপটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাদের মূল লক্ষ্য উজবেকিস্তানে প্রেসিডেন্ট ইসলাম কারিমভের ধর্ম নিরপেক্ষ সরকার উৎখাত করে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট কারিমভের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের এক পর্যায়ে আইএমইউ সদস্যরা নিজেরাই উৎখাত হয়ে চলে আসে আফগানিস্তানে। এর পর থেকে আল-কায়েদা ও তালেবান জঙ্গিদের মিত্র হিসেবে আইএমইউ পা রাখে আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী পাকিস্তানের দুর্গম পার্বত্য এলাকা উত্তর ওয়াজিরিস্তানে। উপজাতি অধ্যুষিত পাকিস্তানের এই পার্বত্য এলাকায় উজবেক যোদ্ধার সঠিক সংখ্যা কত তা কেউ বলতে পারে না। আনুমান করা হয়, কয়েক হাজার।
তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমানে আইএমইউ-এর ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি রয়েছে পাকিস্তানে।
আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলে গ্রুপটি বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে ১৯৯৯ সালে। সেখান থেকে তারা কিরগিজস্তানের দক্ষিণাঞ্চল ও উজবেকিস্তানে ঢুকে নানা ধরনের নাশকতামূলক তৎপরতা চালায় ১৯৯৯ ও ২০০০ সালে।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তানে হামলা চালায় ২০০১ সালে। মূলত, তখন আইএমইউ যোদ্ধারা তালেবান জঙ্গিদের সমর্থন দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত বিমান হামলায় কোনো রকমে টিকে যায় এই উজবেক গ্রুপটি। কিন্তু দুর্বল হয়ে পড়ে মারাত্মকভাবে।
কিন্তু গত কয়েক বছরে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে তারা আবারও সংগঠিত হয় পাকিস্তানের উত্তর ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে। আইএমইউ’র সাবেক এক সদস্য জানান, ২০০১ সালের শেষদিকে এই দুটি উপজাতীয় এলাকায় এক শ’রও বেশি উজবেক পরিবার ছিল। তাদের বেশির ভাগই ছিল শিশু ও মহিলা। এছাড়া ছিল কয়েক শ’ আইএমইউ সদস্য।
দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে আস্তানা গড়ার পর আইএমইউ নেতা তাহির ইউলদাশেভ স্থানীয় মসজিদে তারকা বক্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এরই মধ্যে তিনি গ্রহণ করেন আল-কায়েদার এজেন্ডা। সেই সঙ্গে আইএমইউকে রূপান্তর করেন আল-কায়েদার শক্তিশালী অ-আরব মিত্র হিসেবে।
পাকিস্তানি তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে আইএমইউ। গ্রুপের জঙ্গিদের অনেককে পরে তালেবান ও আল-কায়েদার শীর্ষ নেতাদের দেহরক্ষী করা হয়।
এই উজবেক জঙ্গিরা তালেবান ও আল-কায়েদা জঙ্গিদের চেয়ে শিক্ষায় ছিল এগিয়ে। সেই সঙ্গে ছিল সাবেক সোভিয়েত প্রশিক্ষণ। স্বাভাবিকভাবে রণকৌশলে তারা ছিল অন্য জঙ্গিদের চেয়ে খনিকটা এগিয়ে। ২০০৬ সাল থেকে আইএমইউ জঙ্গিরা পকিস্তানি সামরিক বাহিনীর উপর বেশ কয়েকটি হামলা চালায়। তাদের হামলা থেকে রেহাই পায়নি বেসামরিক লোকজনও।
এই পর্যায়ে আইএমইউ’র জনবল সংগ্রহের পরিধি বেড়ে যায়। আগে তারা লোক নিত কেবল উজবেক, তাজিক ও কিরগিজদের মধ্য থেকে। পরে তা সম্প্রসারিত হয় আরব, আফগানিস্তান ও চেচনিয়ায়। পশ্চিমা দেশগুলোর কিছু কিছু কট্টরপন্থী লোকও আইএমইউ-এ যোগ দেয়।
মার্কিন চালকবিহীন বিমান হামলায় ২০০৮ সালে নিহত হন আইএমইউ নেতা তাহির ইউলদাশেভ। একই ধরনের হামলায় উসমান আদিল নামে আরেক নেতা ২০১২ সালে নিহত হন। এতে গ্রুপটি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
এ অবস্থায় গ্রুপটির হাল ধরেন নতুন নেতা উসমান গাজি। তিনি গ্রুপটিকে ধরে রাখার জন্য কঠিন কিছু পদক্ষেপ নেন। জঙ্গি নেটওয়ার্ক থেকে তার অনুসারীদের তিনি পৃথক করে ফেলেন।
মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশের সরকার আইএমইউকে ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করলেও কয়েকজন বিশ্লেষক বলেন, ‘পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের কিছু কিছু অঞ্চলের বাইরে তারা খুব একটা কার্যকরী শক্তি নয়।’
কিন্তু পাকিস্তানে সেনাবাহিনীকে মুখোমুখি হতে হয় বড় ধরনের একটি শক্তির। ধারণা করা হয়, তারা কোনো না কোনোভাবে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের লোকজনের সঙ্গে মিশে যেতে সক্ষম হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উজবেক জঙ্গিরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উপর প্রথম হামলা চালায় ২০০৭ সালের মার্চে। মূলত সেই থেকে শুরু হয় পকিস্তানি সৈন্য ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের উপর হামলা। বেশ কয়েকটি আত্মঘাতী হামলাও চালায় উজবেক জঙ্গিরা। এছাড়া কয়েক বছরে তারা অনেক উপজাতীয় নেতাকেও হত্যা করে।
২০০৭ সালের রেড মসজিদ অবরোধে উজবেক জঙ্গিরা অংশ নিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ২০১২ সালে তারা পেশোয়ার বিমানবন্দরে হামলা চালায়। এছাড়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করেও বেশ কয়েকটি আত্মঘাতী হামলা চালায়।
বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে আইএমইউ শুধু উপজাতীয় এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না, তারা হামলা চালাচ্ছে আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলে ন্যাটো ও আফগান বাহিনীর উপরও। কেননা, উত্তরাঞ্চলের তালেবান নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের সখ্য রয়েছে।
ন্যাটো সৈন্যদের আফগানিস্তান থেকে ২০১৪ সালে প্রত্যাহার করা হলে তা প্রকারান্তরে আইএমইউকে সহায়তা করা হবে বলে মনে করেন কয়েকজন বিশ্লেষক। তাদের মতে, উজবেক জঙ্গিরা তাদের অঞ্চলে আবারো মথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে উজবেকিস্তানকে অনেক কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে।
তথ্যসূত্র: আইএইচটি, বিবিসি, ফক্স নিউজ, আইএসডব্লিউ।