সিসিনিউজ: হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ হয়তো ভাবেননি, কিন্তু রাজনীতি এমনই। এখানে কখনও কখনও বাস্তবতা কল্পনাকেও হার মানায়। সাবেক এই স্বৈরশাসক সব সময়ই ছিলেন ফ্রন্টলাইনে। বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন ধুরন্ধর সেনাকর্মকর্তা আর রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিতি তার। অস্বীকার করার যো নেই যে পতনের দুই যুগ পরও তার পদের নাম প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। কিন্তু পদ সব সময় হয়তো সব কিছু বলে না। যেমন রাজনীতি তো দূরের কথা খোদ জাতীয় পার্টিতেও এরশাদ এখন আর ফ্রন্টলাইনে নেই। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, স্বামীকে সরিয়ে স্ত্রী রওশন এরশাদই এখন জাতীয় পার্টির ড্রাইভিং সিটে। কয়েক দিন আগেই এরশাদের ছোট ভাই ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদের এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যে কোন কারণেই হোক এরশাদ এখানে মূল খেলোয়াড় নন। বেগম রওশনই সেই অবস্থানে আছেন। নির্দিষ্টভাবে বললে এরশাদ নন, নামটি আসবে রওশনের। এ সাক্ষাৎকারের জন্য অবশ্য এরশাদ সতর্ক করে দেন জিএম কাদেরকে। তাকে শোকজও করা হয়। যদিও সর্বশেষ বুধবার জিএম কাদেরকে প্রশংসায় ভাসান এরশাদ। তবে এরশাদ ও রওশনের ক্ষমতার লড়াই পর্দার আড়াল ভেদ করে এখন অনেকটাই প্রকাশ্য। বাজেট প্রতিক্রিয়ায় স্বামী-স্ত্রীর রাজনৈতিক দূরত্বের বিষয়টি আবারও স্পষ্ট হয়েছে। গত ৭ই জুন জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বাজেট প্রতিক্রিয়া জানান এরশাদ। বাজেটকে স্বপ্নবিলাসী অভিহিত করেন তিনি। জাতীয় পার্টিকে ‘যেমনই হোক বিরোধী দল’ হিসেবে উল্লেখ করে মন্তব্য করায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতেরও সমালোচনা করেন তিনি। সংসদে ‘বিরোধীদলীয় নেতা’ রওশন এরশাদের পক্ষেই ওই সংবাদ সম্মেলন ছিল বলে দাবি করেছিলেন এরশাদ। কিন্তু তিন দিনের মধ্যে মঙ্গলবারই দেখা যায় ভিন্ন দৃশ্যপট। এ দিন সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য নিয়ে হাজির হন রওশন এরশাদ। তিনি জানান, তার পক্ষে নয়, এরশাদের সংবাদ সম্মেলন ছিল দলের পক্ষে। বাজেট এখনও বিশ্লেষণ করে দেখেননি বলেও জানান তিনি। এরশাদের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু রওশন এরশাদের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন না। যদিও রওশনপন্থি হিসেবে পরিচিত জিয়াউদ্দিন বাবলুকে সরকারের পরামর্শতেই জাতীয় পার্টির মহাসচিব করা হয় বলে চাউর রয়েছে। তবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, রওশনের গুলশানের বাসাই এখন জাতীয় পার্টির ক্ষমতার কেন্দ্র, এরশাদের প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসা নয়। স্বামী-স্ত্রীর আলাদা বাসায় থাকা অবশ্য নতুন কিছু নয়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আলাদা বাসাতেই থাকছেন তারা। গুলশানে এরশাদের উপহার দেয়া বাড়িটি বিক্রি করে নতুন বাড়ি কিনেছেন রওশন। অন্যদিকে, বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসায় থাকেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হন রওশন এরশাদ। জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হলেও রাজনীতিতে খুব বেশি সক্রিয় তাকে দেখা যায়নি। তবে এরশাদ যখন বিদিশাকে বিয়ে করেন তখন রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে একেবারেই হারিয়ে যান রওশন। যদিও তাকে বিএনপির সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষাকারী মনে করা হতো। এ কারণে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে আওয়ামী লীগবিরোধী হিসেবে পরিচিত নেতারা সব সময়ই রওশন এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। যদিও স্বামীকে চ্যালেঞ্জ করার মতো অবস্থানে তাকে কখনও দেখা যায়নি। কিন্তু ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের আগে আগে হঠাৎ করেই দেখা দেয় নাটকীয়তা। স্বামীর মতোই আনপ্রেডিক্টেবল চরিত্রে আবির্ভূত হন রওশন। মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও দলীয় প্রার্থীদের তা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন এরশাদ। নিজেও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু সরকারি প্ররোচনায় রওশন এরশাদের নেতৃত্বে বেঁকে বসেন জাতীয় পার্টির নেতাদের প্রভাবশালী একটি অংশ। এরশাদকে মাইনাস করেই নির্বাচনে থেকে যান তারা। আর এরশাদের স্থান হয় হাসপাতাল নামক ‘আধুনিক কারাগারে।’ নির্বাচনের পরই মুক্তি মেলে তার। সর্বশেষ বুধবার লালমনিরহাটে এক অনুষ্ঠানে এরশাদ নির্বাচনের সময়কার তার অবস্থানের কথা আবারও প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমি নির্বাচন করি নাই, আমার দল আমার নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচন করেছে। এ নির্বাচনের কোন মূল্য নেই। আমি ভোট করি নাই, অথচ লালমনিরহাট-১ আসনে আমাকে প্রার্থী বানিয়ে ৫০০০ ভোট দিয়ে অপমানিত করেছে। সময় এলে সব কিছুরই উত্তর বের হয়ে আসবে। এরশাদ আরও বলেন, তিনি অসুস্থ ছিলেন না, অথচ ভোটের সময় তাকে অসুস্থ বানিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার সঙ্গে কাউকে দেখা করতে দেয়া হয়নি। এমনকি ফোন পর্যন্ত ব্যবহার করতে দেয়া হয়নি। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর অবশ্য এরশাদ ও রওশন এরশাদের মধ্যে ফ্রন্টলাইনে থাকার লড়াই আরও জোরদার হয়। এরশাদকে অনেকটা অন্ধকারে রেখেই রওশন এরশাদকে নির্বাচিত করা হয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা। জাতীয় পার্টি থেকে কারা মন্ত্রী হবেন এ ব্যাপারে এরশাদের কোন মতামত নেয়া হয়নি। এরপর পাঁচ মাস কেটে গেছে। দুই-তিনটি সভায় এরশাদ ও রওশন পাশাপাশি অংশ নিয়েছেন। এক অনুষ্ঠানে রওশনের জন্য এরশাদকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষাও করতে হয়েছে। তারা বলেছেন, তাদের মধ্যে কোন মতবিরোধ বা দূরত্ব নেই। কিন্তু পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সংসদে পাশাপাশি আসনে বসলেও এরশাদ এবং রওশনের রাজনীতি যে আলাদা তা এখন একেবারেই স্পষ্ট। মূলত সরকারি দলের ইশারা অথবা ইঙ্গিতে চলছেন রওশনপন্থিরা। দলের বেশির ভাগ নেতা এখন এ পক্ষেই রয়েছেন। অন্যদিকে, এরশাদের নিজস্ব একটি রাজনীতি রয়েছে। সঙ্কটের সময় তিনি তার সেই রাজনীতি ব্যবহার করে অতীতে অনেকবারই বের হয়ে গেছেন। প্রায় ছয় মাস ধরে ফ্রন্টলাইন হারানো এরশাদ কি করেন এখন তাই দেখার বিষয়। উৎসঃ মানব জমিন