প্রযুক্তি ডেক্স: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমা হচ্ছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিঅারসিতে। অভিযোগের ৭৫ শতাংশই ফেসবুকের বিরুদ্ধে। এর পরেই রয়েছে ভিডিও পোর্টাল ইউটিউব, বিভিন্ন ব্লগ ও পর্নো সাইট।
ইউটিউবে ভিডিও যুক্ত করা যায় বলে দিনে দিনে এটিও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। এর ব্যবহারকারী বাড়লে এবং নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ইউটিউব আরও বড় দুর্ভোগ ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টরদের।
জনসাধারণের ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং জাতীয় যে কোনও সাইবার অপরাধের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বিটিঅারসির অধীনে গঠিত বাংলাদেশ কম্পিউটার সিকিউরিটি ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম (বিডিসার্ট) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। দেশে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ২০১২ সালের ২৫ জানুয়ারি গঠন করা হয় বিডিসার্ট।
বিডিসার্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা হওয়ার হার অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বিডিসার্টে ৬০টি অভিযোগ জমা পড়ে যার ৭০-৭২ শতাংশই ফেসবুকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ জমা পড়ার হার গত বছর এই সময়ের তুলনায় বেশি। মে এবং জুন মাসের ডাটাবেজ এখনও তৈরি না হলেও ধারণা করা যায় চলতি বছরের শেষ নাগাদ তা অন্যান্য যে কোন সময়ের রেকর্ড ভেঙে ফেলবে।
সূত্র অারও জানায়, গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিডিসার্টে দেশের নাগরিকরা ৮০টি অভিযোগ করেন। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ ছিল ফেসবুকের বিরুদ্ধে। অবশিষ্ট অভিযোগগুলো ছিল ইউটিউব, ব্লগ এবং পর্নো সাইটের বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিসার্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিটিঅারসির এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ (মোট অভিযোগের) অভিযোগ এসেছে সরকার সংশ্লিষ্ট, ধর্মভিত্তিক প্রচার-প্রচারণা, পর্নোগ্রাফি এবং ব্লগে ধর্ম নিয়ে উস্কানিমূলক লেখালেখি নিয়ে।
বিডিসার্টের কাছে শুরু থেকে ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তথ্য চাইলে (জমা পড়া অভিযোগ) বাংলা ট্রিবিউনকে জানানো হয়, ওই সময়ের কোনও ডাটাবেজ বিডিসার্টে সংরক্ষিত নেই। এ বিষয়ে দায়িত্ব প্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বদলি হয়ে গেলে পরে অার ডাটাবেজ অাপডেট করা হয়নি। তবে বিভিন্ন পর্যায়ে খোঁজ খবর করে এই প্রতিবেদক জানতে পেরেছেন, বিটিসার্ট গঠন হওয়ার পর থেকে গত ২০১৩ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত (১৫ মাসে) কমিশনে ৭ শতাধিক অভিযোগ জমা পড়ে। সেখানেও শীর্ষে ছিল ফেসবুক।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ফেসবুকের বিরুদ্ধে ভুয়া অাইডি খোলা, বাজে পোস্ট দেওয়া, বিকৃত ছবি অাপলোড করা, অনৈতিক প্রচার চালানো এবং প্রতারণার অভিযোগ এসেছে সবচেয়ে বেশি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিঅারসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগের পরিচালক সারোয়ার অালম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ফেসবুক, ইউটিউব বা ওয়েবসাইট সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ অাসে সেসব মূলত তথ্যপ্রযুক্তি অাইনের অধীনে পড়ে। টেলিযোগাযোগ অাইনে তা কাভার করে না। এজন্য কমিশনের সেরকম কিছু করার থাকে না। তিনি বলেন, তবে ভিকটিমকে এসব থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য বিডিসার্ট বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিয়ে থাকে। প্রযুক্তিগত কৌশল শেখানো হয়ে থাকে যাতে পরে অার এ ধরনের সমস্যা তৈরি না হয়।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষ করে অনলাইন মাধ্যমের কারণে দুর্ভোগের শিকার ভুক্তভোগীদের অনেকেই বিডিসার্টে অভিযোগ করেন না। কোথায় অভিযোগ করতে হবে তা জানা না থাকা, প্রতিকার পাওয়ার উপায় সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং ঝক্কি ঝামেলা মনে করে অনেকেই বিষয়টি এড়িয়ে যান। ফলে এ সংক্রান্ত হয়রানির শিকার মানুষের প্রকৃত সংখ্যা জানা যায় না। সংশ্লিষ্টদের অভিমত, বিডিসার্টে যে পরিমাণ অভিযোগ জমা পড়ছে তার চেয়ে বেশি ঘটনা দেশে ঘটছে।
ডিজিটাল বা অনলাইন মাধ্যমের ওপর সরকারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় রাজনৈতিক সহিংসতা, অশ্লীল ভিডিও, গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা কারও একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি-ভিডিওর ভারে এখন জর্জরিত ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সাইট বা পোর্টাল।
ফেসবুকের অপব্যবহারে সামাজিকভাবে নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে অনেককে। ইউটিউবে শিক্ষণীয় বিষয় থাকার পাশাপাশি পর্নোও যুক্ত হচ্ছে। ফলে কোনও কিছুই অার নিরাপদ থাকছে না। ফেসবুকের কারণে সৃষ্ট রামু সহিংসতা, ইউটিউবের কারণে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো ঘটনা ঘটেছে এ দেশে।
কারও ক্ষতি করার জন্য ইউটিউবে কোনও ভিডিও অাপলোড করা হলে তা সরানোর কোনও উপায় না থাকায় এ সংক্রান্ত সমস্যা দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। কেবলমাত্র ভিডিওটি ব্লক করার জন্য ইন্টারনেট গেটওয়েগুলো লিংকটি অাটকানোর ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু তা ব্যাপক জটিল একটি প্রক্রিয়া এবং সময় সাপেক্ষও বটে। এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুরোধও রাখছে না ইউটিউব।
এ প্রসঙ্গে গুগলের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রধান সার্জিও সালভাদর বলেন, ইউটিউবে কোনও ভিডিও আপলোড হলে আমরা তা সরাই না। এটাই আমাদের নীতি। যে দেশ বা ব্যক্তি কোন ভিডিওকে সমস্যা মনে করলে সেই দেশ সেটি ব্লক করে দিতে পারে।
বিটিআরসির সহকারী পরিচালক জাকির হোসাইন খান বলেন, আমাদের কাছে কোনও বিষয় অভিযোগ আকারে এলে বা বিটিআরসির নজরে এলে তা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হয়। তবে অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট সাইটে গিয়েও বিটিআরসি ব্যবস্থা নিয়ে থাকে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের (বিডিওএসএন) সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান প্রযুক্তিকে একটি টুলস হিসেবে দেখার আহবান জানিয়ে বলেন, অনলাইন গণমাধ্যম আর সামাজিক মাধ্যমকে আলাদা করে দেখা ঠিক হবে না। এটা হয় বলেই যত সমস্যার উদ্ভব। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যমগুলোর ব্যবহার বেশি। ফলে এটাকে হেলাফেলা করা যাবে না