সিসি ডেস্ক: জামায়াতের সহিংস তৎপরতাকে সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করে জামায়াতের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীর অবস্থান এবং কর্মকা- কড়া নজরদারিতে আনছেন দেশের গোয়েন্দারা। জনকণ্ঠের অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে।
রাজনৈতিক ইসলাম প্রচার এবং সশস্ত্র প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সারা দেশে সহিংস ঘটনা ঘটিয়ে যেসব সংগঠন রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করে, চূড়ান্ত বিচারে তাদেরই জঙ্গী বলে মনে করেন এদেশের গোয়েন্দারা। এই তালিকায় সন্দেহের শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়ে গণহত্যা, ধর্র্ষণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে একাত্তরে
রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান নেয়। সেই অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কাজ চলছে সুনির্দিষ্ট অপরাধের তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। গোয়েন্দা তথ্যমতে, এই বিচার কাজ ঠেকাতে বার বার সহিংস পথ বেছে নিচ্ছে জামায়াত। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবি এবং হরকত-উল-জিহাদও চালিয়ে যাচ্ছে তাদের কার্যক্রম। তবে সাম্প্রতিক গোয়েন্দা নজরদারি অনেক আধুনিক এবং সক্রিয় হবার কারণে বড় ধরনের নাশকতা ঘটার কোন আশঙ্কা নেই বলে মনে করছেন দেশের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মর্কতারা। গোয়েন্দা বিশেষ শাখার অতিরিক্ত ডিআইজি মাহবুব হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, জঙ্গী দলগুলোর ওপর সরকারের কঠোর নজরদারি এবং নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে দেশে এই মুহূর্তে বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা নেই বলা যায়। তবে জামায়াতকে আমরা সবচেয়ে বড় জঙ্গী সংগঠন এবং দেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি মনে করছি।
গোয়েন্দা বিশেষ শাখার এসপি আইনুল বারী বলেন, ২০১০ সালের মধ্যে জিহাদী গণজাগরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পরিকল্পনা ছিল হিযবুত তাহরীরের,যা কার্যত ব্যর্থই হয়েছে। এছাড়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ভাবগুরু নেতা জসীমউদ্দিন রাহমানীকে গ্রেফতারের মাধ্যমে দেশের ইংরেজী মাধ্যম এবং অনলাইনভিত্তিক জঙ্গী তৎপরতায় উদ্বুদ্ধ তরুণদের কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। দেশের মাদ্রাসাগুলোতে ইসলামের ধর্মীয় দিক দীক্ষা না দিয়ে রাজনৈতিকভাবে ইসলাম, কোরান, হাদিস এবং শরীয়ার অপব্যাখ্যার মাধ্যমে কিশোর -তরুণদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে, যা দেশের জন্য আশঙ্কাজনক এমন তথ্য উঠে এসেছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। তবে যেখানেই লিফলেট বিলি হচ্ছে সেখানেই হিযবুত তাহরীরের কর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে এমন দাবি করলেন এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা। এছাড়া ২৯ জুুন রমনা বটমূলের মামলার রায়ে জঙ্গী দল হুজির ৮ জনকে মৃত্যুদন্ডে এবং ৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করার কারণে জঙ্গীরা অনেকে তাদের সন্ত্রাসী তৎপরতা থেকে পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করে গোয়েন্দা সংস্থা ।
২০১১ সালের শেষে গ্রেফতার হয় জেএমবির টপ কমান্ডার জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) এবং হরকত-উল-জিহাদ আল ইসলাম (হুজি)কে নিষিদ্ধ করার পর হুজির পক্ষ থেকে আদালতে রিট করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল বলে জানান দীর্ঘদিনের জঙ্গী অভিযানে অভিজ্ঞ গোয়েন্দা কর্মকর্তা আইনুল বারী।
তবে ২০১০ সালে হিজবুত তাহরীর নিষিদ্ধ হবার পর তাদের অস্ত্র এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রশিক্ষণ থেমেছে এমন নিশ্চয়তা দিতে পারেননি গোয়েন্দারা। বরং অন্যান্য নামে ছোট ছোট জঙ্গী দল গঠন করে তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে এসব জঙ্গী। এদের আর্থিক সহায়তা এসেছে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে। তবে জামায়াতের মালিকানাধীন ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে বিপুল অর্থের এসব ফান্ডে এতদিন সরকারী কোন মনিটরিং না থাকার কারণে জামায়াতসহ অন্যান্য জঙ্গী সংগঠন বাংলাদেশে তাদের সন্ত্রাসনির্ভর ইসলামী প্রচার অবাধে চালাতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করেন গোয়েন্দারা।
দেশের মাদ্রাসাগুলোতে র্যাডিকেল ইসলাম বা রাজনৈতিক ইসলাম প্রচারমূলক পাঠ্যসূচী নিয়ন্ত্রণে আনার সুপারিশ উঠে এসেছে গোয়েন্দাদের রিপোর্টে। এ প্রসঙ্গে আইনুল বারী জনকণ্ঠকে বলেন, ইসলাম ধর্ম এবং কোরানে ইসলাম ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই। দেশের তরুণ প্রজন্মকে ধর্মীয় বিভ্রান্তি এবং ধর্মকে ব্যবহার করে সহিংসতা থেকে দূরে রাখতে হলে ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার নিষিদ্ধ করা জরুরী।
দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে ২০১৩ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে জঙ্গী এবং নাশকতামূলক রাষ্ট্র্রদ্রোহী তৎপরতার অভিযোগে এ পর্যন্ত হিযবুত ত্ওাহীদের ৭০২ এবং জামায়াতের ৩২০ সদস্য গ্রেফতার রয়েছে। এর মধ্যে গত ১৮ জুন খিলগাঁও থানা পুলিশ নাশকতামূলক কর্মকান্ডের সন্দেহে একই বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে জামায়াতের ছাত্রী শাখা ইসলামী ছাত্রী সংস্থার ২৪ তরুণীকে। গ্রেফতারকৃত তানজিনা বিনতে খায়ের, ফারজানা আক্তার রুনা, শাসুন্নাহার, ফাতেমা জান্নাত, আতিয়ার জাহান, সুবাইতা সারা, মমতা হেনা, আয়েশা আক্তার, সালমা নাসরিন, ফাতিমা ফারহানা, ফারহানা আক্তার, ফারজানা বেগম, হাফিজা সিদ্দিকা, শামীমা আক্তার, উম্মে হাবিবা, সুমাইয়া আফরোজ, জাকিয়া খান মুন্নি, নূরজাহান আক্তার, মারজানা আক্তার, সুমাইয়া খাতুন, রওনক জাহান, মাহবুবা ইসলাম, ইসরাত জাহান ইমা বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী । এরা রাজধানীর মতিঝিল, লালবাগ, বনানী, গুলশানসহ বিভিন্ন জোনে রাজধানীকে ভাগ করে এসব জোনের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এবং আবাসিক এলাকায় মওদুদীবাদ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রচার চালিয়ে সাধারণ মানুষকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়। এদের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে তথ্য-প্রমাণসহ সাতদিন পর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন তদন্ত কর্মকর্তা কামরুজ্জামান। তিনি জনকণ্ঠকে জানান, গ্রেফতারকৃতদের কাছে ইসলামী জঙ্গগীবাদের বই পাওয়া গেছে, সেসব আদালতে উপস্থাপন করা হবে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পরিকল্পিতভাবে তারা জড়ো হয়েছিল সেই বাড়িতে যেখান থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ গ্রেফতার করে তাদের। জিহাদের নামে সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগ পেয়ে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে অভিযান করলে তারা পুলিশের কাজে বাধা দেয় বলে অভিযোগ আনা হয় চার্জশীটে।
কারাগারের ভেতর থেকে এবং আদালতে হাজিরার সময় জঙ্গী নেতাকর্মীরা তাদের দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এমন অভিযোগ পেয়ে কারাগারে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বললেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিআইডি কর্মকর্তা।
আইনুল বারী বলেন, জামায়াতের রাজনৈতিক স্যাবোটাজমূলক কর্মকা- এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বলে সারা দেশে তাদের কর্মতৎপরতা নজরদারিতে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। উৎসঃ
জনকন্ঠ