• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২১ অপরাহ্ন |

মাকে বস্তায় ভরে ছুঁড়ে ফেলা হল রাস্তায়

84977_1সিসি ডেস্ক: হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন আশি ঊর্ধ্ব এক বৃদ্ধা। কেউ কাছে গেলেই অস্পষ্ট কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেন, তার ছেলে তাকে নিতে পাঠিয়েছে কিনা। হাতে মোবাইল ফোন দেখতে পেলেই তার ছেলেকে ফোন দিতে অনুরোধ করেন। যদি কখনও তার ছেলের সঙ্গে দেখা হয়, তখন যেন বলে দেয়া হয় তার মা হাসপাতালের বিছানায়। তাকে যেন নিতে আসে।

পরক্ষণেই আবার উপর দিকে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, যেন তার দেহ থেকে রুহুটা বের করে নিয়ে যায়।

এ দৃশ্যটি নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের তৃতীয় তলার মেডিসিন বিভাগের ৩০৯ নম্বর ওয়ার্ডের। সেখানে ১৬ নম্বর বেডে শুয়ে আছেন হাসনা নামের ওই বৃদ্ধাটি। গত পাঁচদিন আগে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গাউছুল আজম নিজ উদ্যোগে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করান।

বৃদ্ধাটির ছেলে আর ছেলের বউ মিলে তাকে বস্তায় ভরে রাস্তায় ফেলে দিয়ে যায়। এরপর দুদিন তিনি রাস্তায় শুয়েছিলেন। দৃশ্যটি নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার পর ইউএনও গাউছুল আজম বৃদ্ধা হাসিনাকে খুঁজে বের করে নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করে দেন। কিন্তু সে সময় নিজের নামসহ পরিচয় সম্পর্কে কিছুই বলতে পারছিলেন না তিনি।

শনিবার সকালে সরেজমিনে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ৩০৯নং ওয়ার্ডে গিয়ে ওই বৃদ্ধাকে শুয়ে থাকতে দেখা গেছে। ভেতরে ঢুকে ওই বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি ভেবে বসেন হয়তো ছেলে তাকে নিতে পাঠিয়েছেন। কিন্তু না সূচক উত্তর পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন বৃদ্ধা। এরপর দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে পানি।

এক পর্যায়ে তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার কথা ছিল জড়ানো অস্পষ্ট। যেটুকু বোঝা যাচ্ছিল তাতে জানা গেল, বৃদ্ধার নাম হাসিনা। তার দুই ছেলে। বড় ছেলের নাম হোটন মিয়া আর ছোট ছেলের নাম লাল মিয়া। ছেলের স্ত্রীরা তাকে দুবেলা ভাত খাওয়াতে রাজি ছিলনা। পুত্রবধূদের সাফ কথা, তাকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানো যাবেনা। অন্যের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার চেয়ে এনে খেতে হবে। তার বড় ছেলে হোটন ও তার স্ত্রী তাকে একটি বস্তায় ভরে নারায়ণগঞ্জের রাস্তায় ফেলে দিয়ে গেছে। কিন্তু কীভাবে তাকে বস্তায় ভরে আনা হয়েছে তার কিছুই বলতে পারেন নি তিনি।

বৃদ্ধা হাসিনা আরো জানান, তার স্বামীর নাম আবদুর করিম। তিনি গাছ পরিষ্কার করার কাজ করতেন। গ্রামের বাড়ি বেগনাবাদ। তবে ইউনিয়ন, থানা বা জেলা কোনটিরই নাম বলতে পারেননি। তার বোনের নাম বেগন।

কথা বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে হাঁপিয়ে ওঠেন। উপর দিকে দুহাত তুলে বলেন, ‘হে আল্লাহ রুহুটা নিয়ে যাও।’

মোবাইল ফোনে ছবি তুলতে গেলে বৃদ্ধা হাসিনা কিছুটা আপত্তি করে বলেন, ‘আমি কথা বলতে পারি। আমার পোলার সঙ্গে কথা কমু, আমার পোলাক ফোন দেও। ছেলের মোবাইল নাম্বার চাইলে তিনি জানান, একটি ছোট কাগজে পোলার মোবাইল নম্বর লেখা ছিল। সেইটে হারিয়ে গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার পোলার সঙ্গে দেখা হলে বলিও আমি হাসপাতালে। আমাকে যেন নিয়ে যায়। কাল সকালে আমি বাড়ি যাব।’

গত পাঁচদিন ধরে বৃদ্ধা হাসিনাকে হাসপাতালে দেখাশুনা করছেন রাশেদা বেগম। তার গ্রামের বাড়ি বগুড়া জেলার বাগবাড়ি। শহরের জিমখানা এলাকায় হোসেন মিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকেন তিনি। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে তিনি কাগজ কুড়ান। ১০০ শয্যা হাসপাতালে কাগজ কুড়াতে গেলে ডা. কামরুজ্জামান তাকে বৃদ্ধা হাসিনার দেখাশোনার দায়িত্ব দেন। এরপর থেকেই তিনি বৃদ্ধা হাসিনার দেখাশুনা করছেন। সাথে তার ছোট্ট মেয়ে তানজিলা রয়েছে। মা কাগজ কুড়ালেও তানজিলা স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে পড়ালেখা করছেন।

রাশেদা বেগম জানান, রাতভর বৃদ্ধা হাসিনা তার ছেলেদের নাম ধরে এবং তার বোন বেগন এর নাম ধরে ডাকাডাকি করে। আর বলে বোন আমি তোর কাছে টাকা রাখছি। আমার টাকাগুলো এইভাবে খরচ করিছ না। আমারে নিয়া যা।

১০০ শয্যা হাসপাতালের চিকিৎসক কামরুজ্জামান জানান, বৃদ্ধার কোমড়ের হাড় ভেঙে গেছে। যার ফলে তিনি একটি পা নড়াচড়া করতে পারছেন না। ইতোমধ্যে আমরা উনার সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। যতটুকু আমাদের সাধ্যে ছিলো। কিন্তু আমাদের হাসপাতালে যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা না থাকায় উনাকে পঙ্গু হাসপাতালে পাঠাতে হবে।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গাউছুল আজম জানান, পত্রিকায় ছবি দেখে আমি তাকে খুঁজে বের করে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। উনার চিকিৎসা করানো হচ্ছে। সুস্থ হওয়ার পর যদি উনার সন্তানদের খুঁজে না পাওয়া যায় তবে সরকারিভাবে উনার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। কেউ ব্যক্তিগত ভাবে উনাকে সহযোগিতা করতে চাইলে হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন।

উৎসঃ   বাংলামেইল২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ