কিশোরগঞ্জ: প্রতিবছরের মতো এবারও উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে।
এবার অনুষ্ঠিত হবে ১৮৭তম ঈদুল ফিতরের জামাত। এরই মধ্যে ঈদ জামাতের জন্য সব ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। জামাত শুরু হবে সকাল ১০টায়। এতে ইমামতি করবেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলেম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ।এ জামাতে অংশ নিতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। আর মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য থাকছে শোলাকিয়া স্পেশাল নামে দুটি ট্রেন। এরই মধ্যে মাঠের সংস্কার কাজ শেষ হয়েছে। মাটের দাগ কাটা, বালু ফেলা, দেয়ালে রং করাসহ সব কাজই শেষ।
গত বছর শোলাকিয়ায় সাড়ে ৩ লাখের বেশি মুসল্লির সমাগম হয়েছিল। আর লাখো মুসল্লিদের সঙ্গে নামাজ আদায় করলে দোয়া কবুল হয়। সেই আশায় এবারও শোলাকিয়া মাঠে দেশ-বিদেশের লাখো-লাখো মানুষের ঢল নামবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জামাত নির্বিঘ্নে করতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মাঠের বিভিন্ন প্রবেশ পথে থাকছে ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা। মাঠের প্রতিটি প্রবেশ পথে থাকবে র্যাব-পুলিশের নিরাপত্তা চৌকি। নামাজ শুরুর আগে পুরো মাঠ তল্লাশি করা হবে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে। এরই মধ্যে মাঠের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন খান মাঠ পরিদর্শন করতে এসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘মুসল্লিরা যাতে, নির্ভয়ে এবং নিরাপদে এই শোলাকিয়া মাঠে নামাজ আদায় করতে পারেন সেজন্য ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। যেকোনো ধরনের নাশকতা এড়াতে গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশ মাঠে থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু এটি একটি ঐতিহাসিক মাঠ এবং লাখ লাখ মুসল্লির সমাগম ঘটে, সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। এছাড়াও গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে।’
ঈদ জামাতের জন্য শোলাকিয়া মাঠ পুরোপুরি প্রস্তুত জানিয়ে জেলা প্রশাসক ও মাঠ পরিচালনা কমিটির সভাপতি এসএম আলম বলেন, ‘মুসল্লিরা যেনো নিরাপদে নামাজ আদায় করতে পারে তারজন্য সব ধরণের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের জন্য ঈদের আগের রাতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
প্রতিবছরের মতো এবারও মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে থাকছে শোলাকিয়া স্পেশাল নামে দুটি বিশেষ ট্রেন। সকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে ময়মনসিংহ থেকে একটি ট্রেন ছেড়ে কিশোরগঞ্জ স্টেশানে পৌঁছাবে সকাল সাড়ে ৮টায়। এছাড়াও ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে কিশোরগঞ্জ স্টেশানে আসবে সকাল ৮টায়। দুটি ট্রেনেই দুপুর ১২টার দিকে ছেড়ে যাবে বলে জানিয়েছেন কিশোরগঞ্জ স্টেশান মাস্টার জয়ন্ত কুমার সাহা।
উল্লেখ্য, শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের অবস্থান কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পূর্বপ্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীরে। মসনদ-ঈ-আলা ঈশা খাঁর ৬ষ্ঠ বংশধর দেওয়ান হয়বত খানের উত্তরসুরী দেওয়ান মান্নান দাদ খান ১৯৫০ সালে ৪.৩৫ একর ভূমি শোলাকিয়া ঈদগাহকে ওয়াকফ করে দেন। এ মাঠের বর্তমান জমির পরিমাণ হয়েছে ৬.৬১ একর। অবশ্য অজু করার পুকুর, মাঠ ও স্যানিটেশনের জায়গা মিলিয়ে মাঠের সর্বমোট পরিমাণ প্রায় ৭ একর। মাঠে প্রবেশের মূল সড়কে একটি তোরণ ও একটি দোতলা মিম্বার রয়েছে।
শোলাকিয়া কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের একটি বৃহৎ ও পুরাতন জনবসতি এলাকা। বর্তমান শোলাকিয়া নামক স্থানটির পূর্বনাম ছিল রাজাবাড়িয়া। কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্ব উত্তরকোণে নরসুন্দা নদীর অববাহিকায় শোলাকিয়া এলাকাটির অবস্থান। জনশ্রুতি আছে যে শোলাকিয়া ঈদগাহের প্রথম বড় জামায়াতে সোয়ালাখ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেছিলেন। অন্যমতে, মুঘল আমলে এখানে অবস্থিত পরগনার রাজস্বের পরিমাণ ছিল সোয়ালাখ টাকা। উচ্চারণের বিবর্তনে সোয়ালাখ থেকে সোয়ালাখিয়া, সেখান থেকে বর্তমান শোলাকিয়া নামের উৎপত্তি।
দেওয়ান মান্নান দাদ খান যে জমি ১৯৫০ সালে ওয়াক্ফ করেছেন, সে নামায় ১৭৫০ সাল থেকে এ মাঠে ঈদের জামাত হয়ে আসছে বলে লিখা আছে। সে হিসেবে মাঠের বর্তমান বয়স ২৬২ বৎসর।
এছাড়া জানা যায়, ১৮২৮ সাল থেকে জঙ্গলবাড়ির জমিদার এ মাঠে নামাজ পড়তে শুরু করেন। তখন থেকে বড় জামাত শুরু হয়। সে হিসেবে শোলাকিয়া ঈদগাহে এবার ঈদুল ফিতরের ১৮৭তম বড় জামাত অনুষ্ঠিত হবে।১৯৫০ সন থেকে ওয়াক্ফের দলিল মূলে হয়বতনগর জমিদার বাড়ির দেওয়ান মান্নান দাদ খান থেকে বংশানুক্রমিক জৈষ্ঠ্য পুত্ররা শোলাকিয়া ঈদগাহের মোতাওয়ালির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে দেওয়ান ফাত্তাহ দাদ খান মঈন মোতাওয়ালি ও দেওয়ান মো. রউফ দাদ খান নায়েবে মোতাওয়ালির দায়িত্ব পালন করছেন। ১৮২৮ সনে অনুষ্ঠিত প্রথম বড় জামায়াতের ইমামতি করেন সুফি সৈয়দ আহমদ। বরকতময় শোলাকিয়া ঈদগাহে যুগে যুগে খ্যাতনামা আলেমগণ ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
২৬৫টি কাতার সম্বলিত শোলাকিয়া ঈদগাহে প্রতি বছর লাখ লাখ মুসল্লির সমাবেশ ঘটে। ঈদের নামাজ মাঠে পড়া সুন্নতে মোয়াক্কাদা এবং যে জামায়াতে মুসল্লি যতবেশি হয় ছওয়াব ও তত বেশি হয় ও গোনাহ মাফ হয়। এ বিশ্বাস থেকেই ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা নামাজ পড়তে আসেন। পবিত্র ঈদুল ফিতরের এ বিশাল জামায়াতে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য মুসল্লির সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মুসলমান নামাজে অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশসহ ভারত, মিশর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কিছু মুসল্লিও প্রতিবারই এ মাঠে নামাজ পড়তে আসেন। গত বছর প্রায় তিন লক্ষাধিক মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করেছিল।
বিশাল এই জামাত শুরুর ৫ মিনিট আগে বন্দুকের তিনটি গুলি ফুটিয়ে সতর্ক করা হয়। এরপর তিন মিনিট আগে ২টি এবং নামাজ শুরুর এক মিনিট আগে ১টি গুলি ফুটিয়ে নামাজের নিয়ত করা হয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই রীতি চলে আসছে শোলাকিয়া ঈদের মাঠে।
জামাতের সাথে সাথে ময়দানের পশ্চিম দিকে বসা ঈদ মেলাটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ওই মেলায় বেতের সুন্নতি লাঠিসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রির সাজানো পসরা মুসলিদের আকৃষ্ট করে থাকে। দীর্ঘদিন ধরেই শোলাকিয়া মাঠের এই মেলাটি বসে আসছে।
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত শোলাকিয়া ঈদগাহে অনুষ্ঠানের ফলে আজ এটি ঐতিহাসিক স্থানে পরিণত হয়েছে। ফলে এর গুরুত্ব বেড়ে গেছে বহুগুণ। তাই সবার দৃষ্টি আজও ময়দানের দিকে। এ কারণে সময়ের দাবি শোলাকিয়া ময়দানকে আরো আকর্ষণীয় ও উপযোগী করে গড়ে তোলার। বাংলামেইল



