ঢাকা: বাণিজ্যিকভাবে গরু মোটাতাজাকরণ অত্যন্ত লাভজনক। গ্রামের ছোট খামারিরা কম পুঁজিতে বেশি লাভ করতে চাইলে এ পদ্ধতি নিতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারও নানা প্রণোদনা দিয়ে থাকে। এমনকি পুরো প্রক্রিয়া বর্ণনা করে মাধ্যমিকের কৃষিবিজ্ঞান বইয়ে একটি অধ্যায়ও সংযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ইদানীং অসাধু ব্যবসায়ীরা দ্রুত মোটাতাজা করার জন্য ক্ষতিকর ওষুধ, স্টেরয়েড ও ইনজেকশন প্রয়োগ করে যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি।
তবে নিয়ম মেনে গরু মোটাতাজা করলে সেগুলোর মাংসে কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা নেই।
প্রাণি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোটাতাজাকরণের জন্য পুষ্ট দেশি জাতের ষাঁড় সবচেয়ে ভালো। ভালোভাবে যত্ন নিতে পারলে এতে শতভাগ লাভ করা যায়। গমের ভূষি, খেসারি, মসুর ডাল, ছোলা, ঝোলাগুড়, বিট লবণ, খড় ও পরিমিত ইউরিয়া মিলিয়ে প্রতিটি গরুর জন্য দিনে প্রায় ১০০-১৫০ টাকা ব্যয় হয়। এ-সলভেট, ভিটামিন এডি এবং ইক্যাটাসল, ক্যাটাফস, মেটাফস, মেগাভিট ডিভি, অ্যানারেকসন বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত ও স্বীকৃত বিভিন্ন ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করলে তিন মাসেই গরু মোটা করা সম্ভব। ওষুধগুলো মানবদেহ বা গরুর জন্য ক্ষতিকর নয়। এগুলো হজম এবং পশুর পেশি গঠনে সহায়তা করে।
গরু মোটাতাজাকরণে কৃত্রিম উপায়টি একনজরে
প্রথমে একটি প্রাপ্তবয়স্ক গরুকে মোটাতাজাকরণ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর কৃমিনাশক রেনাডেক্স, এলটিবেট, অ্যান্টিওয়ার্ম জাতীয় ওষুধ থেকে যে কোনো একটি পরিমিত মাত্রায় খাওয়ানো হয়। এরপর ৭ দিন বিশ্রাম। বিরতির পর এসোল্ট, বিটাফস, ফক্সবেট, মেটাফক্স, ক্যাটাসল্ট ও বিউটাফস জাতীয় ওষুধের যে কোনো একটি ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। এতে গরুটি মোটাতাজার জন্য প্রাথমিকভাবে তৈরি হয়ে উঠে।
এর ৭ দিন পর পর মাংসপেশীতে এসব ইনজেকশনের (এসোল্ট/ক্যাটাসল্ট) যে কোনো একটি ২৮ দিন প্রয়োগ করা হয়। এর সঙ্গে ভিটামিন এডিই ইনজেকশনও প্রয়োগ করা হয়। ফলে পশুটি ধীরে ধীরে মোটাতাজা হয়ে ওঠে।
২৮ দিন পর এমোভিট-জি, ক্যালফসটনিক এ জাতীয় পাউডার এবং ভিটামিন ট্যাবলেট এনোরা, এনোরেক্সন ও হজমবেটের যে কোনো একটি দৈনিক ২টি করে খাওয়ানো হয়। তিন মাসে সব মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার টাকার মতো প্রতিটি গরুর পেছনে খরচ হয়ে থাকে। এতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মাংস বৃদ্ধি পায়। এভাবে সময় নিয়ে গরু মোটাতাজা করা হলে কোনো সমস্যা হয় না।
সরকারি কৃষি তথ্য সেবার ওয়েবসাইটেও গরু মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক বর্ণনা রয়েছে।
১. পশু নির্বাচন ২. কৃমিমুক্তকরণ ও টিকা প্রদান ৩. পুষ্টি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং ৪. বাজারজাতকরণ।
পশু নির্বাচন
মোটাতাজাকরণ কর্মসূচির জন্য গরু ক্রয়ের সময় প্রধান দুটি বিবেচ্য বিষয় হলো বয়স ও শারীরিক গঠন। বয়স নির্ধারণ: মোটাতাজা করার জন্য সাধারণত ২ থেকে ৫ বছরের গরু কেনা করা যেতে পারে, তবে ৩ বছরের গরু হলে ভালো। শারীরিক গঠন: মোটাতাজাকরণে ব্যবহৃত গরুর দৈহিক গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এজন্য যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে:
• দেহ হবে বর্গাকার
• গায়ের চামড়া হবে ঢিলা (দুই আঙ্গুল দিয়ে ধরে টান দিয়ে দেখতে হবে)
• শরীরের হাড়গুলো আনুপাতিকহারে মোটা, মাথাটা চওড়া, ঘাড় চওড়া এবং খাটো
• পাগুলো খাটো এবং সোজাসুজিভাবে শরীরের সাথে যুক্ত
• পিছনের অংশ ও পিঠ চওড়া এবং লোম খাটে ও মিলানো
• গরু অপুষ্ট ও দূর্বল কিন্তু রোগা ন
কৃমিমুক্তকরণ
পশু চিকিৎসকের নির্দেশনা মতো কৃমির ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। গরু সংগ্রহের পর পরই পালের সব গরুকে একসঙ্গে কৃমিমুক্ত করা উচিৎ। তবে প্রতি ৭৫ কেজি দৈহিক ওজনের জন্য একটি করে এনডেক্স বা এন্টিওয়ার্ম টাবলেট ব্যবহার করা যেতে পারে।
টিকা প্রদান
পূর্ব থেকে টিকা না দেয়া থাকলে খামারে আনার পরপরই সবগুলো গরুকে তড়কা, বাদলা এবং ক্ষুরা রোগের টিকা দিতে হবে। এ ব্যাপারে নিকটস্থ পশু হাসপাতলে যোগাযোগ করতে হবে।
ঘর
আমদের দেশের অধিকাংশ খামারী ২/৩ টি পশু মোটাতাজা করে থাকে, যার জন্য সাধারনত আধুনিক সেড করার প্রয়োজন পড়ে না। তবে যে ধরনের ঘরেই গরু রাখা হোক ঘরের মধ্যে পর্যন্ত আলো ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ঘরের মল-মূত্র ও অন্যান্য আবর্জনা যাতে সহজেই পরিষ্কার করা যায় সে দিকে খেয়াল রেখে ঘরে তৈরি করতে হবে।
পুষ্টি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা
গরু মোটতাজাকরণে দুই ধরনের খাদ্যের সমন্বয়ে রশদ (রেশন) তৈরি করা হয়।
• আঁশ জাতীয়: শুধু খড়, ইউ এম, সবুজ ঘাস ইত্যাদি। তবে এই প্রক্রিয়ায় খামারিদেরকে শুধু খড়ের পরিবর্তে ইউএমএস খাওয়াতে হবে।
• দানারার: খৈল, ভূষি, চাষের কুড়া, খুদ, শুটকি মাছ, ঝিনুকের গুড়া, লবণ ইত্যাদি।
খাবারের পরিমাণ: গরুকে তার ইচ্ছা অনুযায়ী, অর্থাৎ গরু যে পরিমাণ খেতে পারে সে পরিমাণ ইউএমএস সরবারাহ করতে হবে।
কোনো খামারি সবুজ ঘাস খাওয়াতে চাইলে প্রতি ১০০ কেজি কাঁচা ঘাসের সঙ্গে ৩ কেজি চিটাগুড়ে মিশিয়ে তা গরুকে খাওয়াতে পারেন।
এভাবে ৯০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যেই গরু মোটাতাজাকরণ করে বাজারজাত করা সম্ভব। যার মাংস নিঃসন্দেহে নিরাপদ। অর্থাৎ ঈদের হাটে গিয়ে মোটাতাজা গরু দেখেই ভড়কে যাওয়ার কারণ নেই। সঠিক প্রক্রিয়ায় মোটাতাজা করা হলে কোরবানির জন্য সে গরু নিশ্চিন্তে কিনতে পারেন। বাংলামেইল