• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪১ অপরাহ্ন |

রেলমন্ত্রীর বিয়ে, আমাদের বিকৃতি

97453_1জব্বার হোসেন॥

আমি তখন বেশ ছোট, স্কুলে পড়ি। মনে আছে, ইস্কাটন কালোনিতে থাকি। সরকারি কলোনি। বিল্ডিংগুলোর নামও খুব চমৎকার। সোনালি, রূপালি, কাজলি। ভেতরে খেলার মাঠ, স্লিপার, দোলনা। কলোনির পাশে, লেডিস ক্লাবের বিপরীতে স্কুল।

কয়েক ঘণ্টার স্কুল। দুপুরের আগেই ছুটি। বাড়ি এসে ব্যাগ, ফ্লাস্ক রাখবার আগেই ছুটে যাই মাঠে। কখনও স্লিপার, কখনও দোলনা, কখনও ক্রিকেট, কখনও টিলো এক্সপ্রেস, কখনও চোর পুলিশ। আমার চেয়ে এক ক্লাস ছোট, দু’ক্লাস বড়, সমবয়সী সবাই মিলেই। একদিন চোর পুলিশ খেলতে গিয়ে সনেট ভাইয়াকে খুঁজি, কোথাও পাই না। খোঁজ, খোঁজ, খোঁজ। নেই, নেই, নেই।

অবশেষে আবিষ্কার করি, সনেট ভাইয়া কলোনির পেছনে যে পাম্প হাউস, তার পেছনে। সনেট ভাইয়া এখানে এসে লুকিয়েছে! না লুকোয়নি, বরং লুকিয়ে লুকিয়ে কী যেন দেখছে জানালার ফাক গলে। কী দেখছে? হাত দিয়ে ডাকে ইশারায়, আমিও চোখ রাখি জানালায়। পাম্প মিস্ত্রী, সঙ্গে তার স্ত্রী। কাপড় নেই, উদোম শরীর।

শুধু সনেট ভাইয়া নয়, যখন আরেকটু বড় হয়েছি নটরডেম কলেজে পড়ি তখনও দেখেছি, রেজা নামে আমার এক সহপাঠী বন্ধুর দুরবীন নিয়ে দুর্নিবার আগ্রহ। দুরবীন আমারও ভীষণ প্রিয়। বরাবরই আমি দুর থেকে দেখতে ভালোবাসি ভীষণ। দূর পাহাড়, দূর সমুদ্র, দূর প্রকৃতি। কিন্তু এই ম্যাচ বাক্সের শহরে, ফ্ল্যাটের গায়ের সঙ্গে গা, এখানে আবার দূরবীন দিয়ে কী? একরাতে তার বাসায় আড্ডা দিতে গিয়ে কেন তার দূরবীন প্রীতি আবিষ্কার করি। মনে আছে, গল্পে, আড্ডায় ডিনার সারতে দেরি হয়েছিল। ডিনার সেরে একটা সিগারেট ধরাতেই বলে ছাদে চলো। তোমাকে একটা ‘জিনিস’ দেখাবো। ছাদে যাই। কী জিনিস? বলে, একটু পর, ওই যে দেখছো ফ্ল্যাটটা, প্রায়ই দেখি বাতি নেভায় না। বুঝি না ইচ্ছা করেই করে কিনা। অনেকেই আলো জ্বেলে পছন্দ করে। একটু পর দূরবীনে বন্ধুর চোখ। বলে, দেখো, মেয়েটা কম বয়সী, লোকটা বয়স্ক।

আমার খুব অস্বস্থি লাগে। আগ্রহ তো দূরের কথা। কেমন অসুস্থ ও বিকৃত মনে হয় বন্ধুটিকে। বন্ধুটিকে বন্ধু ভাবতে আর ভালোলাগে না, ইচ্ছে করে না।

যখন আরো বড় হয়েছি। বিজ্ঞান নিয়ে, আচরণ নিয়ে, যৌনমনস্তত্ব নিয়ে, যৌনতার বিষয়ে লেখাপড়া করেছি, সেমিনারে গিয়েছি, রিসার্চওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি তখন জেনেছি এ ধরনের ‘দেখার’ দুর্নিবার আগ্রহ এবং আকর্ষণ, এক ধরনের মনোযৌন বিকৃতিই বটে। এই বিকৃতি কোনও স্বাভাবিক অবস্থা ইঙ্গিত করে না, করে অসুস্থতা। এই বিকৃতির আবার তারতম্য রয়েছে, কারো কম, আবার বেশি কারো।

সম্প্রতি রেলমন্ত্রীর বিয়ে নিয়ে ফেসবুক, টুইটারে মন্তব্যের ঝড়। এই আচরণ খুব স্বাভাবিক মনে হয়নি। মনে হবার সঙ্গত কারণও নেই। বিশেষ করে ফেসবুকে এমন সব মন্তব্য এসেছে যে, তা উল্লেখ না করাই ভালো, কেননা তা শালীনতাবর্জিত। যারপরনাই কুরুচিপূর্ণ।

আমাদের মধ্যে আধুনিকতা নেই। চিন্তায় নেই, চর্চায় নেই, জীবন যাপনে নেই। উদারতা? সুদূর পরাহত। আমরা মুখে ‘মুক্ত চিন্তা’ বলি। কিন্তু ভেতরে ধারণ করি না। ধার করা শব্দগুলো বলতে ভালোবাসি আমরা। সংকীর্ণতা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, শিরা উপশিরায়, মস্তিষ্কে, মজ্জায়। চিন্তার দৈন্যতা পিছু ছাড়ে না, যতই শহরে বাস করি। যে শহরেই যাই। আমরা তথাকথিত আধুনিক। পোশাকে স্যুট, টাই, কোট, ব্লেজার, সু। কেউ ফুলস্লিভ, স্লিভলেস কেউ। দামি সেলফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ। লেটেস্ট মডেলের গাড়ি, ক্যাপসুল লিফট, কন্ডোমিনিয়াম, সিমপ্লেক্স, ডুপ্লেক্স। আউটিং, ট্রাভেলিং। কিন্তু ভেতরের চিন্তা গান্ধা, রদ্দি। ভেতরে এক গুহা অন্ধকার নিয়ে বসবাস আমাদের। পোশাকে সভ্য হলেও আদতে অসভ্য। বিকৃত। আধুনিকতা তো কোনও এক্সটার্নাল বিষয় নয়, ইনটার্নাল। আধুনিকতা থাকে মস্তিষ্কে, মগজে, চিন্তায়। আমরা প্রগতিশীল বলে মনে করি নিজেদের, অথচ অমূলকভাবে অন্যকে হেয় করা, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা, হয়রানি করা, অপদস্থ করা, বিব্রত করা, তামাশা করা, কী করে প্রগতিশীলতা হয়, বরং কখনোই তা প্রগতিশীলতা নয়। প্রগতি মানুষকে সম্মান করতে বলে, মানবিক হতে বলে, বলে না তুমি হেনস্থা কর অন্যকে।

রেলমন্ত্রীর বিয়ে নিয়ে আমরা যে মন্তব্য ও আচরন করেছি ও করে চলেছি তা নিতান্ত অসভ্য আচরণ। অন্যের অন্তর্বাসের মাপ জানতে আমরা উৎসুক, রীতিমত অস্থির। অন্যের বেডরুমে উকি দেয়া আমাদের অভ্যাস। অন্যের দাম্পত্যে অনুপ্রবেশের দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা আমাদের ভেতরে ভেতরে। অন্যের শয্যাকক্ষে প্রবেশ করে আমরা পুলক পেতে চাই। চাই আনন্দিত হতে। এই পুলক ও আনন্দ বিকৃত। অবদমিত কাম ও যৌনতা আমাদের ভেতর লকলক করে, তির তির করে। তা না হয়ে অন্যের বিয়ে ও দাম্পত্য নিয়ে ফেসবুকে, টুইটারে প্রকাশ করতে পারি যে কোনও মন্তব্য? কেউ কেউ তো ফেসবুকে ছবিও কোলাজ করেছি! বিকৃতির একটা সীমা থাকে, তাও নেই আমাদের। আমাদের মন পড়ে থাকে অন্যের বেডরুমে। তা না হলে শাওন- হুমায়ুন আহমেদ, শিলা-আসিফ নজরুল, ড. মাহফুজুর রহমান- ইভা নিয়ে আমাদের এত আলোচনা কেন? আমরা যাদের নিয়ে চায়ের দোকান, অফিস লাউঞ্জ, বারের টেবিল অশ্লীল আলোচনায় উষ্ণ করে তুলছি, লক্ষ্য করলে দেখবো তাদের সাবেক স্বামী- বা স্ত্রীদের কিন্তু তাদের সম্পর্কে কোনও অভিযোগ নেই, সমস্যা নেই। সমস্যা আমাদের। মাথা ব্যাথা আমাদের। আমরাই আসলে সমস্যাগ্রস্ত।

একটি কথা আমি বার বার বলি, অনেকবার লিখেছি একটি কথা, অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বাইরে থেকে অযাচিত মন্তব্য অন্যায়। জীবন যার, জীবনের সিদ্ধান্তও তার ব্যক্তিগত। সেটি নিয়ে মন্তব্য করবার অধিকার আমাদের কারো নেই, যদি না অন্যের জীবনের কারণে, জীবন যাপনের কারণে আমরা কোনভাবে সমস্যাগ্রস্ত হই।

রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বিয়ে করেছেন। ৬৭তে করুক, কি ৭৭ এ করুন সেটি তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। তিনি কাউকে জোর করছেন না, যৌন হয়রানি করছেন না, ধর্ষণ করছেন না। বিয়ে করেছেন। তিনি কোন কচি খুকিকেও বিয়ে করেননি। হনুফা আক্তার রিক্তা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। তারা সেচ্ছায়, সানন্দে, আবদ্ধ হয়েছেন বিবাহ বন্ধনে। হনুফা বা মুজিবুল তাদের চেয়ে বেশি বয়সী, কমবয়সী কাকে বেছে নেবেন, নেবেন না কাকে, সেটি তাদের নিজস্ব ব্যাপার। তারা চাইলে ডিভোর্সও নিতে পারেন, আবার একত্রবাসও করতে পারেন। এই বিয়ে ভেঙে দিয়ে দুজনই আরো, আরো, আরো বিয়ে করতে পারেন। তাতে তো আমাদের সমস্যা হবার কথা নয়।

বিয়ে মানেই শুধু সেক্স নয়, সেক্স বিয়ে না করেও হয়। বিয়ে করে একজন কী করবেন, কী করবেন না, সন্তান নেবেন, কী নেবেন না- বিষয়টি একান্ত তাদের, যে দুজন বিয়ে করেছেন। ‘এ বছর ভায়াগ্রা আমদানি বেশি হবে’ ফেসবুকে এমন মন্তব্যও দেখেছি। শুধু ভায়গ্রা কেন, যে কোনও যৌন উত্তেজক যে কেউ সেবন করতে পারেন। সঙ্গীর অনুমতিক্রমে যদি তিনি প্রয়োজন মনে করেন। ভায়াগ্রা তো কোনও নিষিদ্ধ বস্তু নয়। মাদকও নয়।

বেশি বয়সে বিয়ের অসংখ্য নজির রয়েছে আবার বিয়ে না করারও রয়েছে। নারীতে রয়েছে, রয়েছে পুরুষেও। পাবলো পিকাসো, দুনিয়া জুড়ে যার খ্যাতি, শেষ বয়সে বিয়ে করেছিলেন ৪৫ বছর ব্যবধানের এক নারীকে। মিডিয়া মোগল রুপার্ট মারডক ৬৮ বছর বয়সে বিয়ে করেন উইন্ডি ডেনকে, ডেন তখন ৩০। সাংবাদিক ল্যারি কিং ৬৪তে বিয়ে করেন, নারীটি তখন ৩৮। হাগ হফনার ৮৬ বছর বয়সে জীবন সঙ্গী হিসেবে বেছে নেন, ২৬ এর তরুণী ক্রিস্টাল হ্যারেসকে। হফনার সাংবাদিক, উদ্যোক্তা ছিলেন। মার্কিন অভিনেতা, প্রযোজক জন ক্লিজি যখন ৭৩, তখন তার নব বিবাহিত স্ত্রী জেনিফার ওয়েডি ৪২। কানাডিয়ান উপন্যাসিক উইলিয়াম স্যাটনার বিয়ে করেন ৭০ এ এসে। আর নেলসন ম্যান্ডেলা ৮০ বৎসরে এসে বিয়ে করেছিলেন ২৭ বছরের ব্যবধানের এক নারীকে। যিনি মোজাম্বিক প্রেসিডেন্টের সাবেক স্ত্রী ছিলেন। এমন উদাহরণ আরো অনেক আছে। তাদের অনেকে একাধিক বিয়েও করেছিলেন। আবার ডিভোর্সও হয়েছিল কারো কারো।

শুধু যৌনতা দিয়ে মানুষকে চিন্তা করলে, বিচার করলে হবে না। মানুষ, মানুষে মানুষে সম্পর্ক, মানবিকভাবেও দেখবার সুযোগ রয়েছে। জীবন শুধু যৌন নয়, একই সঙ্গে অযৌনও। সম্পর্কও তাই। সেক্সচুয়াল এবং এ্যাসেক্সচুয়াল সবমিলিয়েই জীবন। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে কেবল শিশ্ন আর যোনি, এ বড় ভয়ঙ্কর! অন্যের প্রতি সম্মানবোধ, মানুষের প্রতি ভালবাসা জগতের সবচেয়ে বড় আধুনিকতা। প্রগতিশীলতার প্রথম পাঠ এখান থেকেই। সভ্যতার উৎপত্তির বিন্দুও এখানেই। কেবল রেলমন্ত্রী কেন, কারো বিয়ে, দাম্পত্য, যৌনতা নিয়ে রসিকতা, ইতর আচরণ করবার অধিকার আমাদের নেই। সভ্য মানুষ কখনো করে না এসব।

পুনশ্চ: শুরুতে ছদ্মনামে দুই বন্ধুর কথা বললেও তা জীবন থেকে নেওয়া। তারা এই সমাজেরই চরিত্র, তবে বিকৃত। এমন বিকৃত মানুষের সংখ্যা কম নয় সমাজে, অসংখ্য। এই বিকৃতি অন্যের জীবনকে করে তোলে দুর্বিসহ, সমাজকে অসুস্থ!

লেখক : সদস্য, ফেমিনিস্ট ডটকম, যুক্তরাষ্ট্র


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ