• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৬ অপরাহ্ন |

কল্প লোকের গল্প যোগে বঙ্গদেশের রাজনীতি

Roniগোলাম মাওলা রনি : বাংলাদেশের হাল আমলের রাজনীতি যে কোন দিকে যাচ্ছে তা কেউ বলতে পারছে না। না বিএনপি, না আওয়ামীলীগ আর না জাতীয় পার্টি কিংবা জামাত- কেউ জানেনা কি হতে যাচ্ছে আগামী দিনগুলোতে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্য জনসভায় হুঙ্কার দিয়ে বলেন এককথা আর একাকী নিরজনে ভাবেন অন্যকথা। নিজেদের চির প্রতিদ্বন্দ্বি কারো সঙ্গে যদি কালে ভদ্রে ফোনে কথা বার্তা হয় তখন উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে একে অপরকে জিজ্ঞাসা করেন- ভাই হচ্ছেটা কি? অপরজন হয়তো বলেন – ফোনে কথা বলাটা নিরাপদ নয়। জানেনতো সবকিছু রেকর্ডিং হয় । কি কথা বলে কখন কিভাবে ফেঁসে যাই- বলা তো যায় না! তাই সাক্ষাতে বলবো। অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়- ভাই! সাক্ষাতেও ঝামেলা আছে। শুনলাম পকেটে ফোন অন রেখে কথাবার্তা বললেও নাকি যায়গা মতো রেকর্ডিং হয়ে যায়। এ্যা বলেন কি ? থাক ভাই- তাহলে আজ আর না – বলেই ফোন রেখে দেয়া হয়।

টেলিফোনে আলাপকারী নেতৃবৃন্দ একদিন হয়তো কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে বা বিয়ে শাদীতে পরস্পর মুখোমুখী হন। একজন হয়তো একদলের এমপি কিংবা মন্ত্রী। অন্যজন হয়তো আরেক দলের সাবেক এমপি বা মন্ত্রী। তারা একে অপরের সঙ্গে করমর্দন করেন এবং ক্ষেত্র বিশেষে কোলাকুলি করেন। এরপর একটু নিরিবিলি স্থানে গিয়ে দাঁড়ান বা বসেন। তারপর অতিরিক্ত সতর্কতাবশত নিজেদের মোবাইল ফোনের সুইচ অফ করে ভয়ার্ত চোখে আশে পাশের দিকে তাকান। নাহ ! কেউ ফটো তুলছে না কিংবা অনুসরন করছে না। এরপর একজন অন্যজনকে বলেন- খবর কি? ভালো না ! মুছিবতে আছি। বাইরে কোন প্রতিদ্বন্দ্বি নেই । কিন্তু নিজেদের লোকজন সর্বনাশ করছে। তারপরও নিশ্চিত ভাবে বলতে পারছি না কতদিন আছি বা কতদিন থাকবো। আমাশয়ের রুগী যেমন ঘন ঘন বাথরুমের পানে তাকায় কিংবা প্রশ্রাবে ইনফেকশন হলে যেমন মনে হয় এই বুঝি এক ঘড়া প্রশ্রাব জমা হয়ে গেলো। তারপর যায়গা মতো গিয়ে বহুক্ষন কুতাকুতি করেও যখন ২/১ ফোঁটা বের করা যায় না তখন যেরূপ অস্বস্তি এবং মেজাজটা গরম হয় তেমনি হয়েছে আমার অবস্থা। অন্যজনের জবাব শুনে প্রশ্নকারী হা হা করে হেসে ওঠেন। তারপর এগিয়েদেন সিগারেটের প্যাকেট।

অন্যদিকের খবর কি? মানে আপনাদের খবর কি? ভালো না। দলের বেশিরভাগ শীর্ষ নেতা নাকি আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ইচ্ছে মতো মালপানি কামিয়ে নিচ্ছে। সত্য মিথ্যা জানি না। তবে আমাদের দলের মধ্যে সন্দেহ আর অবিশ্বাস মারাত্মক আকার ধারন করেছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। ২/৪ জন হাতে গোনা ত্যাগী নেতা অবশ্য এখনো অবিচল আছেন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তারা বেশি দিন টিকে থাকতে পারবেন না। দলের ভেতর এবং বাইরের চাপে তারা ক্রমান্বয়ে দূর্বল থেকে দূর্বলতর হয়ে পড়ছেন। সব কিছু দেখে শুনে মনে হচ্ছে রাজনীতি আর করা হবে না। একেকবার মনে হয় ব্রাজিল চলে যাই! এতো দেশ রেখে ব্রাজিল কেনো! সাম্বা নৃত্য দেখার শখ আছে নাকি? আরে না- ওসব নৃত্য ফিত্ত দেখার কি বয়স আছে! ওখানে যাবো আমাজান জঙ্গল দেখার জন্য। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং ঘন জঙ্গলে গিয়ে মনের জ্বালা মেটাবো এবং ভুত-প্রেত আর শয়তানের সাথে দোস্তি করবো। আরে মশাই আপনার কথা যতো শুনছি ততোই ধুমপানের নেশা মাথা চাড়া দিচ্ছে। দিন দিন- আরেক শলা সিগারেট দিন এবং তারপর বলুন বাংলাদেশের জঙ্গল ছেড়ে কেনো আমাজানের জঙ্গলে যেতে চান। আর আমাদের দেশে কি ভুত-পেতœী অথবা লুইচ্যা শয়তান বা মিছক্যা শয়তানের অভাব পড়েছে নাকি?

গল্পের স্বার্থে এখন বোধ হয় আলাপকারী দুইজন নেতার নাম দেয়া দরকার। আচ্ছা ঠিক আছে – ব্রাজিল যেতে ইচ্ছুকের নাম দিলাম পোকেমন আর তার সঙ্গে আলাপকারী ব্যক্তির নাম দিলাম ডোরেমন। আপনারা হয়তো অভিযোগ করতে পারেন যে হাজার হাজার নাম রেখে কেনো আমি তাদের নাম তাবৎ দুনিয়ার নাবালক শিশুদের অতি প্রিয় দু’টি কার্টুৃনের নামে নামকরন করলাম ? জবাব খুবই সোজা। বর্তমানের রাজনীতিবিদগন যে ভাষায় কথা বলেন, যেভাবে অঙ্গভঙ্গি করেন এবং যেসব অদ্ভুত অদ্ভুত পরিকল্পনার কথা শোনান তা বাস্তবে তো সম্ভব নয়ই বরং হিন্দী সিনেমাতেও বেমানান। কোন চলচিত্র অভিনেতা বা অভিনেত্রী ওমন করে আর অভিনয় করতে পারবেন না – কোন কাহিনীকার কিংবা সংলাপ রচয়িাতা ওমন করে নায়ক নায়িকার মুখে সংলাপ তুলে দিতে পারবেন না।

ফলে রাজনীতিকে এখন মানুষ্য অভিনীত সিনেমার ফ্রেমে বন্দি করা সম্ভব নয়। তবে কার্টুন এবং এ্যানিমেশন চলচিত্রকে এখন অতিক্রম করতে পারেনি রাজনীতির নায়ক নায়িকাগণ। কারন কার্টুনে যা ইচ্ছা তাই বলা যায়, যা ইচ্ছা তাই করা যায় এবং একই ভাবে সবকিছু কল্পনা করা যায়। কার্টুনের আরেকটি মস্ত সুবিধা হলো এর দর্শককুল সবাই নাবালক কিংবা নাবালিকা । ফলে অবিশ্বাস, অনাস্থা কিংবা বিদ্রোহ-বিপ্লব অথবা সমালোচনার কোন ভয় থাকে না।

এবার মূল প্রসঙ্গে চলে আসি । পোকেমন থাকেন ঢাকার মোহাম্মদপুরে আর ডোরেমন থাকেন গুলশানে। দুইজন বিপরীত মেরুর রাজনীতি করলেও ব্যক্তিগত জীবনে ঘনিষ্ট বন্ধু। অনেক সুখ দুঃখের স্মৃতি রয়েছে সেই ছাত্র জীবন থেকে। ৮০ র দশক থেকে তাদের বন্ধুত্ব। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করেছেন। পরবর্তীতে উভয়েই ক্ষমতার আশ্বাদন পেয়েছেন- একবার ক্ষমতায় গিয়েছেন হয়তো বা আবার বিরোধী দলে। যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন জীবনেও ভাবেননি যে তারা চিরস্থায়ী ক্ষমতায় থাকবেন কিংবা আবার যখন বিরোধী দলে ছিলেন তখনো এমন নিরাশ হননি যে জীবনে আর হয়তো কোনদিন ক্ষমতা ফিরে পাবেন না। কিন্তু ইদানিংকার ঘটনাবলী, প্রেক্ষাপট সব কিছু কেমন যেন আলাদা। সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে ডোরেমন বললেন – আচ্ছা এবার বলুনতো কেনো আপনি মনে করছেন আমাজান জঙ্গলের শয়তান, ভূত ও প্রেত আমাদের দেশের চাইতে ভালো।

বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে পোকেমন বললেন-দক্ষিন আমেরিকা মহাদেশের প্রায় অর্ধেকটা অঞ্চল জুড়ে আমাজনের জঙ্গল। আয়তন ৭০ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। জঙ্গলের তীরে সাতটি দেশ- ব্রাজিল, পেরু, কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, ইকুয়েডর, বলিভিয়া এবং গায়ানা। ১৬ হাজার প্রজাতির প্রায় ৩৯০ বিলিয়ন বৃক্ষ রয়েছে এই জঙ্গলে। এই জঙ্গলের ম্যাকাও পাখি, সবুজ রংয়ের জায়ান্ট লীফ ফ্রগ বা ব্যাঙ, জঙ্গলের মধ্যে বয়ে চলা আঁকা বাঁকা নদী এবং ঝরনার অপরূপ দৃশ্য দেখলে মনের সকল হতাশা হয়তো কেটে যাবে। আর শয়তানের কথা বলছেন? একথা সবাই স্বীকার করে যে, পাহাড়, নদী-সমূদ্র কিংবা জঙ্গলে বসবাসরত শয়তান সব সময় জনপদের শয়তানের চেয়ে বোকা সোকা প্রকৃতির হয়। আর একারনেই আমি সেখানে যেতে চাচ্ছি বোকা সোকা শয়তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য।

কিন্তু আমার মাথায় একথা কিছুতেই ঢুকছেনা যে, বোকা শয়তানের বন্ধু হয়ে আপনার লাভ কি? শয়তান তো শয়তানই-তা সে বোকা হোক বা চালাক হোক তাতে কি আসে যায়? ডোরেমন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে কথাগুলো বলে পোকেমনের মুখের দিকে তাকালেন। পোকেমন বললেন- জঙ্গলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হলো নিঃসঙ্গতা বা একাকীত্ব। চারিদিকে সবকিছু নীরব, নিস্তব্দ এবং কোন জন মানব নেই এমন পরিবেশে মানুষের সবচেয়ে বড় শত্র“ হলো শয়তান।

একাকী জীবনের নিঃসঙ্গতাকে শয়তান বিভিন্ন উপায়ে জাহান্নামের চুলা বানিয়ে ফেলতে পারে। আর সেটা যদি দেশী শয়তান হয় তাহলে মনের মধ্যে জেল, জুলুম, হুলিয়া, গুম-হত্যা-অপহরনের ভয় ঢুকিয়ে দিবে। ইদানিংকালে এক শ্রেনীর ক্ষমতাবান মানুষের সান্নিধ্য পেয়ে শয়তান গুলো এতটাই বজ্জাত হয়ে পড়েছে যে তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আগে মন্দ মানুষগুলো শয়তানী মদদ পাবার জন্য ফন্দি ফিকির করতো। বড় বড় বট গাছের তলায় বসে শয়তানের বন্দনা করতো। কেউ কেউ মাঝ রাতে তালগাছে উঠে শয়তানকে খুঁজতো। কিন্তু এখন হয়েছে উল্টো। শয়তানরা এখন বন জঙ্গল ছেড়ে রাজধানীতে চলে এসেছে। তারা রাজধানীর বড় বড় অট্রালিকা, রঙ্গমহল এবং রঙ্গমঞ্চের আশে পাশে ঘোরা ফেরা করে। তারপর তাদের শিক্ষাগুরুর খোঁজ করে এবং এক সময় পেয়েও যায়। গুরু-শিষ্য মিলে শয়তানীর অবিশ্বাস্য সব সূত্র আবিস্কার এবং সেগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে নগর মহানগরের আলো-বাতাস-শব্দ-সুর-তাল-লয় সব কিছুকে জাহান্নামের আগুন বানিয়ে ফেলে। আর এ কারনেই আমি আমাজনের জঙ্গলে যেতে চাই।

পোকেমনের কথা শুনে ডোরেমনের মুখ ভার হয়ে গেলো। বড় একটি নিঃশ্বাস ছেড়ে দীর্ঘদিনের বন্ধুর হাতটি চেপে ধরলেন। গলায় আশা জাগানিয়া সুর তুলে বললেন- প্রিয় বন্ধু! দয়া করে হতাশ হবেন না। দলগত ভাবে আপাত দৃষ্টিতে আমরা হয়তো সুবিধাজনক অবস্থানে আছি। কিন্তু বাংলার রাজনীতির সৌভাগ্যের আকাশ কাল বৈশাখীর ঝড়ে আক্রান্ত হতে কয়েক মুহুর্তের বেশী সময় লাগেনি। ২৫ শে মার্চ ১৯৭১ সালের সন্ধা রাত্রি পর্যন্ত সমগ্র দেশ একরকম জল্পনা কল্পনা করেছে কিন্তু মধ্যরাতের পর সবকিছু উল্টিয়ে গিয়েছিলো। ১৯৭৫ সালের ১৪ই আগস্ট মধ্য রাত্রি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু হয়তো নিজেকে তাঁর সারাজীবনের মধ্যে সবচেয়ে সুখী এবং সফল মানুষ ভেবেছিলেন। তাঁর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু খোন্দকার মোস্তাকের বাড়ী থেকে রান্না করে পাঠানো হাঁসের মাংশ দিয়ে নৈশভোজ সেরেছিলেন। কিন্তু শেষ রাতে এসে সব স্বপ্ন ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। এরপর যদি জিয়াউর রহমানের কথা ধরেন তবে বলবো-সে রাতে তিনি ছিলেন প্রচন্ড হাসি খুশী এবং সুখী একজন মানুষ। তাঁর সংক্ষিপ্ত শাসনামলে প্রায় অর্ধ শতাধিক সামরিক অভ্যূত্থান সফলভাবে দমন করার পাশা পাশি সারা দেশে তিনি গড়ে তুলেছিলেন বিশাল এক রাজনৈতিক সংগঠন। সরকার, দল এবং বিরোধী দলের ওপর তার আধিপত্য ইতিহাসের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছিলো। তাঁর বাঁকা হাঁসির মধ্যে প্রতিপক্ষরা যমদূতকে দেখতে পেতো তেমনি তার সান্নিধ্য লাভে মনে করতো দেবদূতের স্পর্শ পেয়েছে। এভাবেই সৌভাগ্যের স্বর্নসুখ তাকে হিমালয়ের উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলো ১৯৮১ সালের ৩০ শে মে তারিখের মধ্যরাত পর্যন্ত। কিন্তু ভোর রাতে সবকিছু চুরমার হয়ে যায় হঠাৎ এক কাল বৈশাখীর আঘাতে।

১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক ছিলো এরশাদের জন্য। তারপর ঐদিন সূর্য ডুবার পর ঘটতে থাকলো একটার পর একটা অঘটন। শেষ মেষ তিনি বিদেয় নিলেন। ১/১১ র ঘটনা আরো নির্মম। হাওয়া ভবন তখন মনে করছিলো বঙ্গ ভবন তাদেরই কথায় চলছে। হাওয়া ভবনের অধিকর্তা ফোন দিলেন বঙ্গভবনের অধিকর্তাকে। তিনি ফোন উঠালেন। হ্যালো বলার সঙ্গে সঙ্গে তার হাত থেকে কে যেনো ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে গেলো । তার পরের ইতিহাস তো সবারই জানা। কাজেই অপেক্ষা করুন এবং আবৃত্তি করুন- এই দিন দিন নয়-আরো দিন আছে, এই দিনেরে নিয়ে যাবে সেই দিনেরো কাছে। ডরেমনের কথা শুনে পোকেমনের মনটা হঠাৎ ভালো হয়ে গেলো। তারা হাত ধরাধরি করে চলে গেলো বিয়ে বাড়ির ভোজন পর্বের অনুষ্ঠানের আয়োজনস্থলে।

ফেইস বুক থেকে নেয়া


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ