খেলাধুলা ডেস্ক: বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের অলরাউন্ড নৈপুণ্যে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বসুন্ধরা সিমেন্ট ওয়ানডে সিরিজের প্রথমটিতে ৮৭ রানের সহজ জয় পেয়েছে টাইগাররা। সেইসাথে বছরের শেষদিকে এসে এ বছর ওয়ানডেতে প্রথম জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ।
স্বাগতিকদের দেয়া ২৮২ রানে জয়ের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ৪২.১ ওভারে ১৯৪ রানেই গুটিয়ে যায় জিম্বাবুয়ের ইনিংস। ফলে ৮৭ রানের সহজ জয়ে সিরিজে ১-০তে এগিয়ে গেল টাইগাররা।
সাকিব আল হাসান ১০১ রান করার পাশাপাশি ৪১ রান খরচায় একাই শিকার করেন চার উইকেট। সিকান্দার রাজা, ভুসি সিবান্দা, সলোমন মায়ার এবং নাইম্বু সাকিব আল হাসানের শিকারে পরিণত হন। অলরাউন্ডার পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে ম্যাচসেরা হন সাকিব আল হাসান। জিতে নেন এক হাজার ডলার প্রাইজমানি। এছাড়া মাহামুদুল্লাহ রিয়াদ, মাশরাফি মর্তুজা ও আরাফাত সানী দু’টি করে উইকেট শিকার করেন।
উদ্বোধনী জুটিতে রান আসে ৪৭। জিম্বাবুয়ে ইনিংসে প্রথম আঘাত হানেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। একই ওভারে সিকান্দার রাজা এবং সিবান্দাকে ফিরিয়ে দেন সাকিব। সিকান্দার রাজা ১৫ রান করলেও সিবান্দা রানের খাতা খুলতে পারেননি।
এরপর মাসাকাদজা ব্রেন্ডন টেইলরকে সাথে নিয়ে ৪৫ রানের পার্টনারশিপ গড়ে বিচ্ছিন্ন হন। মাসাকাদজা আউট হন ৪২ রান করে। মাসাকাদজাকে নিজের করা প্রথম ওভারের তৃতীয় বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন মাহামুদুল্লাহ রিয়াদ। পরের উইকেটটিও নেন মাহামুদুল্লাহ। দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে চাকাব্বার স্ট্যাম্প ওপড়ে ফেলেন মাহামুদুল্লাহ। ৯ রানের বেশি এগুতে পারেননি চাকাব্বা।
এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানে টাইগার অধিনায়ক মাশরাফি ব্রেন্ডন টেইলর ও অধিনায়ক চিগুম্বুরাকে ফিরিয়ে দিলে ১৫৩ রানে ৬ উইকেট হারায় জিম্বাবুয়ে। টেইলর ক্যারিয়ারের ৮ম অর্ধ শতক পূর্ণ করেন এদিন। ৭২ বলে ৫৪ রান করেন তিনি। অধিনায়ক চিগুম্বুরা ১৫ রানেই বিদায় নেন।
চিগুম্বুরার বিদায়ের পর স্কোরবোর্ডে ১৫ রান যোগ করতেই অভিষিক্ত সলোমন মায়ারকে সরাসরি বোল্ড করে দেন সাকিব। ১১ রানের বেশি এগুতে পারেননি মায়ার। পরের ওভারেই আঘাত হানেন আরেক স্পিনার আরাফাত সানী। ৭ রান করা পানিয়াঙ্গারা আরাফাত সানীর বলে বোল্ড হলে অষ্টম উইকেটের পতন ঘটে সফরকারিদের। ১৮০ রানে নবম উইকেট হারায় জিম্বাবুয়ে। আবারো উইকেট দখলে নেন সাকিব। স্লিপে মাহামুল্লাহর অসাধারণ ক্যাচ নেন ৪ রান করা নাইম্বুর। এরপর আরাফাত সানীর ১০ম ওভারের প্রথম বলে তেন্দাই চাতারার স্ট্যাম্প ভেঙে গেলে ১৯৪ রানে গুটিয়ে যায় জিম্বাবুয়ের ইনিংস।
এর আগে চট্টগ্রামের জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে সাকিব আল হাসানের ‘অসাধারণ’ সেঞ্চুরি ও মুশফিকুর রহিমের অর্ধ-শতকের ওপর ভর করে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ২৮১ রান সংগ্রহ করে টাইগাররা।
বাংলাদেশের হয়ে সাকিব সর্বোচ্চ ১০১ রান করেন। এটি তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ সেঞ্চুরি। তার ৯৯ বলের ইনিংসটি ১০টি চারে সাজানো। এছাড়া মুশফিক ৭২ বলে ৬৫, অভিষিক্ত সাব্বির ২৫ বলে ৪৪ ও মুমিনুল ৪৬ বলে ৩১ রান করেন।
জিম্বাবুয়ের হয়ে পানিয়াঙ্গারা তিনটি এবং চাতারা দুটি উইকেট লাভ করেন। এছাড়া নিয়ম্বু ও কামুংগজি একটি করে উইকেট লাভ করেন।
টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে ৭০ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ। একে একে ফিরে গেছেন তামিম ইকবাল, এনামুল হক, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ও মুমিনুল হক।
দলীয় ৮ রানের মাথায় পানিয়াঙ্গারার বলে ব্যক্তিগত ৫ রান করে বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরেন তামিম। এরপর ২৬ রানের সময় চিগুম্বুরাকে তুলে মারতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরের পথ ধরেন এনামুল হক বিজয় (১২)। একটু পরই চাতারার বলে ক্যাচ আউট হয়ে তামিম ও বিজয়কে অনুসরণ করেন মাহমুদুল্লাহ।
দলীয় ৩১ রানে তৃতীয় উইকেট হারানো পর মুমিনুল ও সাকিব মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। দলীয় ৭০ রানের সময় মুমিনুলকে (৩১) বোল্ড করে বাংলাদেশের বিপদকে আরো ঘনিভূত করেন নাইম্বু।
এরপরের গল্পটুকু সাকিব আর মুশফিকের। চতুর্থ উইকেট জুটিতে মুশফিককে নিয়ে ১৪৮ রানের জুটি গড়লে দলকে বিপদমুক্ত করে মজবুত অবস্থানে নিয়ে সাকিব আল হাসান। দলীয় ২১৮ রানের মাথায় সাকিব ফিরে গেলে রানের চাকা কিছুটা ‘স্লো’ হয়ে যায় টাইগারদের। সাকিবের পর ফিরে যান মুশফিকও। তবে এরপর ‘অভিষিক্ত’ সাব্বির রহমানের ২৫ বলে ৪৪ রানের ঝড়ো ইনিংসের কল্যাণে শেষ ১৬ বলে ৩৫ রান তুলেলে টাইগারদের স্কোর গিয়ে দাঁড়ায় ২৮১ তে।
বাংলাদেশের হয়ে আজকের ম্যাচে অভিষেক হয়েছে লেগ-স্পিনার সাব্বির রহমানের। দলে ফিরেছেন পেসার আল আমিন হোসেনও। শফিউল ইসলাম ১৪ সদস্যের দলে ডাক পেলেও প্রথম ওয়ানডে একাদশে জায়গা পাননি।
প্রসঙ্গত, পরিসংখ্যানের বিচারে ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশ এগিয়ে। ৫৯ ম্যাচে বাংলাদেশের জয় ৩১টিতে। জিম্বাবুয়ে জিতেছে ২৮ ম্যাচ। বর্তমান পারফরম্যান্সেও এগিয়ে বাংলাদেশ। আগামী ২৩ নভেম্বর রোববার একই মাঠে দুপুর ১২:৩০ টায় দ্বিতীয় ওয়ানডেতে মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে।
রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে চলেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রাণভোমরা সাকিব আল হাসান। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের প্রথমটিতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে এক ম্যাচে শতরান এবং চার উইকেট শিকারের অনন্য রেকর্ড গড়েছেন বিশ্বসেরা টেস্ট অলরাউন্ডার সাকিব।
আর ওয়ানডে ক্রিকেটের ৪৩ বছরের ইতিহাসে বিশ্বের ১২তম ক্রিকেটার হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন সাকিব আল হাসান। ১৯৭১ সালের ৫ জানুয়ারি মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটের যাত্রা শুরু হয়। ১৬ বছর পর এক ম্যাচে শতরান এবং চার বা তার চেয়ে বেশি উইকেট নেয়ার নজির গড়েন ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ক্রিকেটার ভিভ রিচার্ডস। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ডুনেডিনে ১৮ মার্চ ১৯৮৭ সালে ৪৩৫ নম্বর ওয়ানডে ম্যাচে ক্যারিবীয় ক্রিকেটার ভিভ রিচার্ডস ১১৯ রান করার পাশাপাশি ৪১ রান খরচায় শিকার করেন ৫ উইকেট।
১০ বছর পর দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে নিউজিল্যান্ডের নাথান অ্যাস্টেল মোহালিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১১৭ রান ও ৪৩ রান খরচায় নেন ৪ উইকেট।
এরপর একে একে ভারতের শচিন টেন্ডুলকার (১৪১ রান ও ৪/৩৮), সৌরভ গাঙ্গুলি (অপ: ১৩০ রান ও ৪/২১), শ্রীলঙ্কার সনৎ জয়সুরিয়া (১২২ রান ও ৪/৩৯), নেদারল্যান্ডসের ফিকু ক্লুপেনবার্গ (১২১ রান ও ৪/৪২), ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিস গেইল (অপ: ১১২ রান ও ৪/২৪), পাকিস্তানের শোয়েব মালিক (১১৮ রান ও ৪/১৯), ইংল্যান্ডের পল কলিংউড (অপ: ১২ রান ও ৬/৩১), ভারতের যুবরাজ সিং (১১৮ রান ও ৪/২৮) এবং শ্রীলঙ্কার তিলকরতেœ দিলশান (১৪৪ রান ও ৪/৪) এক ম্যাচে শতরান করার পাশাপাশি ও চার বা তার চেয়ে বেশি উইকেট শিকারের নজির গড়েন।
শুক্রবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে বিশ্বের ১২তম ক্রিকেটার হিসেবে এক ম্যাচে শতরান করার পাশাপাশি ৪ উইকেট শিকারের অনন্য নজির গড়েন সাকিব আল হাসান (১০১ রান ও ৪/৪১)। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩১ রানে ৩ উইকেট পতনের পর দলের বিপর্যয়ে হাল ধরেন সাকিব আল হাসান। পঞ্চম উইকেট জুটিতে উইকেটরক্ষক মুশফিকুর রহিমকে সাথে নিয়ে ১৪৮ রানের পার্টনারশিপ গড়েন সাকিব। ৯৯ বলে ১০টি চারের সাহায্যে ১০১ রান করে আউট হন সাকিব।
এরপর জিম্বাবুয়ের ইনিংসে প্রথম আঘাতটিও হানেন সাকিব। একে একে সিকান্দার রাজা, ভুসি সিবান্দা, সলোমন মায়ার এবং নাইম্বুর উইকেট শিকারের মধ্য দিয়ে বিশ্বের ১২তম ক্রিকেটার হিসেবে এক ম্যাচে শতরান ও চার বা তার চেয়ে বেশি উইকেট নেয়ার রেকর্ডে নিজের নাম লেখান সাকিব।